বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর স্বীকৃতি ও মান্যতা – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ।
Table of Contents
বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর স্বীকৃতি ও মান্যতা
আজ শিশুর স্বীকৃতি ও মান্যতা নিয়ে আলাপ করবো। যে সব অবস্থা সন্তানদের স্বীকৃতি এবং মান্যতা এনে দেয় :
১. প্রথম দর্শনে প্রীতিভাজন হলে, আকর্ষণীয় সাজপোশাকে দৃষ্টিনন্দন হলে, শান্ত চলনবলন এবং হাসমুখ ব্যক্তিত্ব হলে।
২. সঙ্গপ্রিয়, সপ্রতিভ এবং আমোদপ্রিয় হলে।
৩. সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আকার প্রকার ব্যবহার আচরণ হলে।
8. সামাজিক ব্যবহারে প্রতিক্রিয়ায় সহযোগিতাপূর্ণ, দায়িত্বদ্যোতক, সম্পন্নসক্ষম ; অন্যদের প্রতি আগ্রহী এবং সদাচারী হলে।
৫. আবেগের সুনিয়ন্ত্রণে সক্ষম এবং যথা-যোগ্য রীতি-নীতি, নিয়ম-নির্দেশ মান্য করে চলার প্রবণতা ও যোগ্যতা থাকলে।
৬. সহজ স্বাভাবিক সামাজিক মেলামেশার যোগ্যতা-পরিশীলন, সহজ সমঝোতার ক্ষমতা বা মানিয়ে চলার যোগ্যতা, সততা, একাগ্রতা, পরার্থপরতা এবং নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাকে ছাড়িয়ে যাবার ক্ষমতা থাকলে।
৭. পরিবারের আপনজনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, আর্থসামাজিক অবস্থায় তুষ্ট সম্পন্নতা থাকলে।
৮.যাদের সঙ্গে বেশি বেশি মেলামেশা ঘটে, সঙ্গীসাথী, তাদের স্থানিক নৈকট্যে অবস্থান থাকলে (যার ফলে বার বার মেলামেশা এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্ভব হয়)।
বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর স্বীকৃতি ও মান্যতা
যে সব অবস্থা বিপরীত, অর্থাৎ দূরত্বের নির্দেশক :
১. বিরূপ প্রথম দর্শন। অনাকর্ষণীয় চেহারা, অবিন্যস্ত পোশাক-আশাক, একা-একা মনের, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, অমিশুকে।
২ . আমোদ-কৌতুকে অনীহা, উপস্থিতিতেই ছন্দপতনের অনুভব।
৩. দলের সঙ্গে অমিল, একান্ততা প্রিয়।
8. ‘আমায় দেখো আমায় দেখো’-মতো চালচলন, আত্মম্ভর, অন্যের পিছনে লাগা মনের, কত্তালি-কত্তালি গোছের ব্যবহার, অসহযোগী, কায়দা-কেতা বা রীতি-নীতির পরোয়াহীন।
৫. বোধবুদ্ধির অপূর্ণতা, সংযমের অভাব, অসংবৃত আবেগ প্রকাশ, আত্মপ্রত্যয়হীনতা অস্থিরমতি, অশান্তচিত্ততা।
৬. ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যে অন্যের বিরক্তির কারণ, বিব্রতকারী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ঘাড়-শক্ত একগুঁয়ে, অপ্রতিভ।
৭. মা-বাবার সঙ্গে অপ্রিয় সম্পর্ক, আর্থসামাজিক স্তরভিন্নতা।
৮. বন্ধুবান্ধবের থেকে স্থানিক দূরত্ব মেলামেশার অন্তরায়, সংসারের কাজে নিযুক্ত,
অন্যকোনো আংশিক কাজে যুক্ত। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে কৌমারের সমস্যাগুলোর নেতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত তারুণ্য এই অস্বীকারের মার খায়, মান্যতা পায় না। যাদের প্রতিযোজন-অভিযোজন সহজ পথে স্বাভাবিক এগিয়ে গেছে তারা প্রথম দলের আওতায় আসে। ছয়-আট বছর বয়স
থেকে মা-বাবা যত্ন নিলে, বয়ঃসন্ধিতে মনোযোগ দিলে এবং তারুণ্যে সঙ্গ দিলে অনেক সুফলের সম্ভাবনা আছে।
ঝোঁক ও আগ্রহের রূপরেখা :
কৌমার কালের বিভিন্ন ঝোঁক বা আগ্রহ : এবং পরিবর্তন ॥ রিক্রিয়েশনে ৷
১. খেলাধুলো ও সৃষ্টিশীল কাজে। শরীর মনের অবস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এদের দলবদ্ধ খেলা ও হৈহট্টগোল থেকে ক্রমশ স্বপ্নদল বা একা একা খেলায় মন যায়। শরীর কেন্দ্রিক খেলার চাইতে বুদ্ধি কেন্দ্রিক খেলার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
২. আরামপ্রিয়, অলস অবস্থান, রিল্যাসিং। খেতে খেতে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা, হাস্যকৌতুক করা, চুটকি, ধাঁধাঁ। এই রকমের একান্ত দলে-মেলে ছেলেরা ধূমপানে গ্রস্ত হতে পারে।
৩. ভ্রমণ এবং ভ্রমণ বিষয়ে আগ্রহ। বাইরের জগৎ এদের টানে। মুক্তির স্বাদ পায়।
৪. হবি। একামন, একাচোরা কৌমার দিবাস্বপ্নে সময় নষ্ট করতে পারে। আবার কোনো না কোনো হাতের কাজে, হবিতে, নিবিষ্ট চিত্ত হতে পারে। মেয়েরা এবং ছেলেরা। বহু-বন্ধু কৈশোর, এক্সট্রাভার্ট বলেই, হবিতে আগ্রহ দেখায় না।
৫. নাচ-গান-নাটক-কবিতা। রোমান্টিক মনের অবদান।
৬. বাইরের বই পত্র পড়ার অবকাশ এক্সট্রাভার্টদের কম, ইনট্রোভার্টদের বেশি হয়। তবে হালকা বই, কমিক্স্, ক্যুইজ, ছবিতে গল্প প্রথমদিকে মন টানলেও ক্রমশ টানটা হারিয়ে ফেলে। গভীর বিষয় মন টানে।
৭. সিনেমা ওদের টানে। রোমান্টিক হলে মেয়েদের, অ্যাডভেনচার হলে ছেলেদের। রেডিও, রেকর্ড প্লেয়ার ও টেলিভিশন, অত্যন্ত প্রিয়। বিশেষকরে রেকর্ড। পপুলার মিউজিক হলে তো কথাই নেই। রেকর্ড চালিয়ে পড়াশুনো করতে ভাল লাগে।
৮. দিবাস্বপ্ন। অঢেল, অফুরন্ত, অক্লান্ত। সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় মিশে কোথাও ওদের হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। ওরা বরং হারিয়েই যেতে চায়; দূরে, বহু দূরে, মনের পাখায় ঘুরে ঘুরে। রবীন্দ্রনাথ অনন্যসাধারণ সব অবস্থান-ছবি এঁকে রেখেছেন।
