বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর সাধারণ সামাজিক আগ্রহের এলাকায় – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ।
বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর সাধারণ সামাজিক আগ্রহের এলাকায়
উৎসব-অনুষ্ঠানের ঝোঁক। বিপরীত যোনির প্রতি আগ্রহ। মেয়েরা বেশি পছন্দ করে। অগ্রগামিনী বলেই নয়, প্রকৃতির গিন্নিপনায়ও বটে। দুরত্তপনা, দুষ্টুমি এবং ‘নিষিদ্ধ’ বিষয়ে ঝোঁক এসে যায়। অনেকের। দলবদ্ধাবস্থার প্রভাবে। অভিযান-অভিসার মনের মধ্যে শিরশির অনুভব উদৃক্ত করতে পারে। সুযোগ পেলে একটু আধটু সেবন-টেবনও মনকে মাতেয়ারা করতে পারে।
ভাবের আদান-প্রদান, অন্যথা অপ্রকাশযোগ্য বিষয়-টিষয় নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ, কষ্ট-যন্ত্রণার উদ্ঘাটন-উত্থাপন, অবদমিত আশা-আকাঙ্ক্ষা, মনমানসিকতা নিয়ে সমবয়সীদের মধ্যে কথাবার্তা চলে। চাপা আবেগের মুক্তি ঘটে, শাস্তি আসে। দৃষ্টিতে নবদিগন্তের প্রসার ঘটে (অথবা অপ্রসার)। সমস্যা সহজ হয়ে যায়- ওদের মনে। এই সবের জন্যে সামাজিক – মেলামেশায় ওদের আগ্রহ বেড়ে যায় ।
অপরের দুঃখকষ্টের প্রতি, যন্ত্রণা সমস্যার বিষয়ে একটা সহানুভূতিশীল মন ওদের মধ্যে কাজ করে। সাহায্য সহযোগিতা করতে এগিয়ে যায়। পরে এই প্রচেষ্টা বাস্তবের আঘাতে থেমে যেতে চায়। কারণ, এক, ওরা বুঝে যায় যে সব সমস্যার সমাধান ওদের সাধ্যের মধ্যে নেই (তোর হাতে নাই জীবনের ভার!) এবং দুই, প্রায়শই টের পায় যে ওদের চেষ্টা কার্যকর তো নয়ই বরং ভুলবোঝাবুঝির উৎস হয়ে বিড়ম্বনার কারণ হয়ে ওঠে।
মা-বাবার বিবেক থলিকা – বিশেষ করে মেয়েরা। মা-বাবার সমালোচনা করে, শুধরে দিতে চায়। সকলকেই। যথাযথ তথ্য ও জ্ঞানের যোগানের অভাবে আবেগীয় তাড়নায় এরা তাই নেতিবাচক, ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। গঠনমূলক হয় না। ইচ্ছেটা জেগেছে, যোগ্যতা অর্জিত নয়। সেই সেতুপথটি ব্যবহার করলে সার্থক হতে পারে।
অর্জন বা প্রাপ্তি :
অ্যাচিভমেন্ট। যে কোনো অর্জনই ব্যক্তিকে সমৃদ্ধ করে, তুষ্ট করে। স্বীকৃতি ও সামাজিক মান্যতা স্বাভাবিক অনুসরণ করে। সেই অর্জন স্কুলের প্রগতির বিষয়ে হোক, খেলাধুলোর মাঠে. হোক অথবা সামাজিক দায়দায়িত্ব পূরণের এলাকাতেই হোক। এদের মধ্যে আবার তারুণ্য সেই এলাকায় তার অর্জনকে সম্ভব করে তোলে যেখানে সে প্রশংসা ও সম্মান পায়, স্বীকৃতি পায়। এই সম্মান ইত্যাদির উৎস বন্ধুবান্ধব হতে পারে, স্কুলের শিক্ষকশিক্ষিকা হতে পারেন। কার অর্জনের লক্ষ্য ও এলাকা কোন দিকে হবে তা এই সবের উপর নির্ভর করে।
তারুণ্যের এই লক্ষ্য বা আদর্শ ‘অর্জন’ অবাস্তব-অসম্ভব ঊর্ধ্বে ধার্য-চিহ্নিত হতে পারে। তখন অপ্রাপ্তির বেদনা তাড়া করে। মা-বাবা সাধারণত পাঠ্যবিষয়ের প্রগতি এবং অর্জনকেই প্রাপ্য বলে মনে করেন। অন্যগুলিকে তেমন মূল্য দেন না। গোলমালের শুরু এখানে। অনেক আগে থেকে প্রস্তুতি ও পরিচালনা করা দরকার। অন্যথা প্রথম থেকেই পথ যে যাবে বেঁকে! কৈশোর-তারুণ্য স্বাধীনতা চায়। স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়? এবং অচিরেই জেনে বুঝে যায় যে অর্থের স্বাধীনতা মনের স্বাধীনতার মূলে, সামাজিক স্বাধীনতার উৎসে। তাই ওরা ক্রমশই স্বাধীনতার অর্জনে, অর্থের যোগানে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
“ছোটদের বড় দোষ— বড়দের কথা শোনে না যে! বড়দের বড় দোষ— ছোটদের কথা শোনে না সে! ছোটবড়র এই দ্বন্দ্ব চলছে চিরদিন, রাগে গরগর কথা, ফরফর রাতদিন।” — দোষের খতিয়ান। ‘একের মধ্যে তিন’। (১ম খণ্ড), ‘অর্ধেন্দুশেখর ভট্টাচার্য। ছেলে মেয়েদের ‘মানুষ’ করে তুলতে মা-বাবাদের ভাবনার শেষ নেই, চিন্তার অবধি নেই, দুশ্চিন্তার লেখাজোখা নেই। এঁরা জানেন বোঝেন অনেক, নির্দেশ উপদেশ তথ্য সত্যাদি সংগ্রহ করেন প্রভূত। সন্তানের ভাল কে না চান? এই ভাল চাইতে, সন্তানের ভাল করতে এঁরা উর মাটি চুর করতেও পিছপা হন না। কষ্ট স্বীকার? ত্যাগ?— যা বলবেন তাই এঁরা করতে উন্মুখ। কিন্তু সব নদীর গতি যেমন সমুদ্রে বা হ্রদে তেমনি সকল মা-বাবার সব অভিযোগ-অনুযোগ- ফরিয়াদ গিয়ে
ঠেকে সেই— ‘কথা শোনে না’-তে ! আবার শিশু-কিশোর-তরুণদের বলতে দিন দেখবেন ওদেরও সব কথার শেষ কথা সেই— বড়োরা ছোটদের কথা শোনেনা যে! মুশকিল এই যে ওদের আমরা বলতে দিই না, ওদের না-বলা কথায় কানও দিই না, ওদের অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুচ্চার অভিমানে আমরা মনও দিই না। সময় নেই বলেই নয়; মনটিই আসলে নেই বলে। বড়োর চশমাখানা আমরা এমন শক্তপোক্ত করে নাকে লাগিয়ে রাখি, প্রায় সর্বক্ষণই, যে ওদের চশমায় ওদের মন মানসিকতাকে দেখার দৃষ্টিটাই আর খুঁজে পাই না।
