বয়ঃসন্ধির সময় শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা

বয়ঃসন্ধির সময় শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা- বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ।

 

বয়ঃসন্ধির সময় শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

স্কুল বিষয়ে এদের শত অভিযোগ। বাধানিষেধ, হোমওয়ার্ক, পাঠ্য বিষয়ের ব্যাপকতা ও গভীরতা, স্কুল প্রশাসনের ব্যবস্থা-অব্যবস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি। শিক্ষকশিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে, পঠনপাঠন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে, পরিবেশের বিরুদ্ধে ওদের বহু অভিযোগ থাকে। এতো সব সত্ত্বেও ওরা স্কুলের কাজে পড়ায়, মেলা-মেশায় এবং শিক্ষকদের –

সঙ্গে সম্পর্কে একটা স্বাভাবিকতা মেনে চলে। স্কুলকে পছন্দ করার প্রবণতাটা অনেক জোরালো কারণে ঘটে বলে ছোটখাটো অন্য ব্যাপারগুলো তলিয়ে যায় । তিন ধরনের তারুণ্য আছে যাদের বিদ্যালয়ে আগ্রহ কম অথবা অপছন্দের :

এক. যাদের মা-বাবা অত্যন্ত উচ্চমার্গে অর্জনের লক্ষ্যটি ধরে রেখেছেন। সে লেখাপড়ায় হোক, খেলাধুলোয় হোক অথবা স্যোশাল ওয়ার্কেই হোক। ওদের যোগ্যতা ও প্রবণতার বিষয়টিষয় না ভেবেই। এবং প্রতিনিয়ত তাড়া করছেন সেই লক্ষ্যে পৌঁছোতে।

দুই, যারা যে কোনো কারণেই হোক সমবয়সীদের কাছে নৈকট্য এবং স্বীকৃতি পায় না; যারা নিজেদের পিছনে-পড়া, বাতিল বলে মনে করে। তিন, আগে আগে বেড়ে ওঠা, দেহে মাথায় ছাড়িয়ে যাওয়া তারা যারা বয়ঃসন্ধির আগাম আগমনে হাবভাব চেহারা চরিত্রে যোগ্যতম সক্ষমতম বলে মান্যতা পায় কিন্তু আসলে এবং .ভিতরে ভিতরে তারা তা নয়।

এই সব মিলে এমন হয় যে যোগ্যতার মাত্রা যাই হোক না কেন এদের প্রাপ্তি-অর্জন- স্বীকৃতি অত্যন্ন হয়ে যায়, আর সেই কারণেই পরপর আরও কম অর্জন, আরও কম ইচ্ছা- আগ্রহের বিষচক্রে জড়িয়ে পড়ে। অনেকে ইচ্ছা-আগ্রহের তলানিতে এসে পড়াশুনোটাই ছেড়ে দেয়। অনেকে নেতিবাচক মনোভাবের শিকার হয়ে মস্তান হয়ে ওঠে।

 

যে সব অবস্থা বা বিষয় ওদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহকে উজ্জীবিত করে :

১. সহপাঠীদের মনোভাব। মূল্যায়ন। আশা-আকাঙ্ক্ষা। এরা অনুপ্রেরণার হেতু। বিদ্যালয়ের ফলাফলে, বাইরের কাজে অথবা যে কোনো অর্জনের বেলায়। সাফল্য এবং প্রাপ্তি আরও সাফল্য, অধিকতর প্রাপ্তির পথ খুলে দেয়।

২ . মা-বাবার মনোভাব। শিক্ষা বিষয়ে। শিক্ষার উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও যাথার্থ্য বিষয়ে। শিক্ষা কি মানসিক-বৌদ্ধিক পরিশীলনের জন্যে? সামাজিক মান্যতা ও সিঁড়ি বেয়ে স্বীকৃতির উন্নতির স্তরে পৌঁছোনোর জন্যে? চাকরি পাওয়ার এবং অর্থ উপার্জনের জন্যে? পড়াশুনো করতে হয় বলেই করতে হয় বলে? আইন আছে বলে? উন্নতস্তরের মানুষ হবার জন্যে ?

৩. শ্রেণীতে স্থান বা র‍্যাঙ্ক অর্জনের মানসিকতা। পাওয়াগুলো আকর্ষণ করে, না-পাওয়া অবস্থান নিচুর দিকে ঠেলে দেয়।

৪. পঠন পাঠনের বিষয় যদি বাস্তব জীবনে ব্যবহার উপযোগী হয়। কাজে লাগে। বাস্তবে মূল্যবান হয়। ভবিষ্যতের বাস্তব সম্ভাবনা বর্তমানের আগ্রহকে ধরে রাখে।

৫. শিক্ষক, প্রশাসক, বিদ্যালয় পরিবেশ এবং পঠনপাঠন ও শৃঙ্খলার সুবিন্যস্ততা।

৬. বাইরের কাজকর্ম-এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাকটিভিটিস-এ আগ্রহ ও আনন্দ, অনুশীলন ও প্রাপ্তি, স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন। ৭. বিদ্যালয়ের মেলামেশায়, সামাজিক বাতাবরণে, স্থান-মান-স্বীকৃতিতে, আনন্দ-আগ্রহ- প্রাপ্তিতে।

“ছোটদের বড় দোষ— বড়দের কথা শোনে না যে! বড়দের বড় দোষ— ছোটদের কথা শোনে না সে! ছোটবড়র এই দ্বন্দ্ব চলছে চিরদিন, রাগে গরগর কথা, ফরফর রাতদিন।” — দোষের খতিয়ান। ‘একের মধ্যে তিন’। (১ম খণ্ড), ‘অর্ধেন্দুশেখর ভট্টাচার্য। ছেলে মেয়েদের ‘মানুষ’ করে তুলতে মা-বাবাদের ভাবনার শেষ নেই, চিন্তার অবধি নেই, দুশ্চিন্তার লেখাজোখা নেই। এঁরা জানেন বোঝেন অনেক, নির্দেশ উপদেশ তথ্য সত্যাদি সংগ্রহ করেন প্রভূত।

সন্তানের ভাল কে না চান? এই ভাল চাইতে, সন্তানের ভাল করতে এঁরা উর মাটি চুর করতেও পিছপা হন না। কষ্ট স্বীকার? ত্যাগ?— যা বলবেন তাই এঁরা করতে উন্মুখ। কিন্তু সব নদীর গতি যেমন সমুদ্রে বা হ্রদে তেমনি সকল মা-বাবার সব অভিযোগ-অনুযোগ- ফরিয়াদ গিয়ে ঠেকে সেই— ‘কথা শোনে না’-তে !

আবার শিশু-কিশোর-তরুণদের বলতে দিন দেখবেন ওদেরও সব কথার শেষ কথা সেই— বড়োরা ছোটদের কথা শোনেনা যে! মুশকিল এই যে ওদের আমরা বলতে দিই না, ওদের না-বলা কথায় কানও দিই না, ওদের অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুচ্চার অভিমানে আমরা মনও দিই না। সময় নেই বলেই নয়; মনটিই আসলে নেই বলে। বড়োর চশমাখানা আমরা এমন শক্তপোক্ত করে নাকে লাগিয়ে রাখি, প্রায় সর্বক্ষণই, যে ওদের চশমায় ওদের মন মানসিকতাকে দেখার দৃষ্টিটাই আর খুঁজে পাই না।

Leave a Comment