বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর নৈতিক বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন- বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ। শৈশবের নৈতিকতাবোধ তৈরি হয় মা-বাবা ও বড়দের দ্বারা। তারা প্রতিনিয়ত বলে বলে, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, নির্দেশে উপদেশে, ভয়ে-শাসনে-শাস্তিতে করণীয়-অকরণীয় বোধ তৈরি করে দেয়। কৌমার-তারুণ্যে গোটা ব্যবস্থাটাই পালটিয়ে যায়। এখন সমগোত্রীয়রা, দলের সকলে, যা আশা করে, ভাবে, উচিতানুচিতের নির্ণয় করে তাইই পথ দেখায়। দলবদ্ধতা ও দলের নীতিবোধ গ্রহণের সময় এখন। বিষয় কেন্দ্রিক ‘এটা নয়, ওটা নয়’ বাতিল হয়ে নীতি- নিয়ম কেন্দ্রিক নৈতিক প্রথা-প্রকরণকেই গ্রহণ করে ।
বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর নৈতিক বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন
দ্বিতীয় প্রধান পরিবর্তন পিতৃ-মাতৃ কেন্দ্রিকতা থেকে সরে এসে এখন নিজ নিজ মনের, স্ব-কেন্দ্রিক নীতি-নির্দেশে উত্তরণ। অর্থাৎ শৈশবে ওঁরাই বলে টলে দিতেন। সেটাই ছিল নৈতিকতা— অনুসরণে। এখন নিজেরাই নীতি স্থির করে নিজেদের চেতনাতেই অনুসরণ করে। এই পরিবর্তনে ওরা অনেক কিছুকেই বিচার বিবেচনায় আনে, বিশ্লেষণ করে, প্রকল্প গঠন ও উপাত্ত সৃজন থেকে শুরু করে সিদ্ধান্ত-অনুসিদ্ধান্ত গঠন সবই করে। ভালমন্দ বোধ এখন আর আরোপিত নয়, অনুসন্ধানের এবং অনুসরণের বিষয়।
তৃতীয় পরিবর্তন প্রথাসিদ্ধ বা সমাজস্বীকৃত নীতি রীতি থেকে ব্যক্তি বা স্বদলের দ্বারা বিচারিত-সমর্থিত রীতি-নীতি অনুসরণ। একে স্ব-সিদ্ধ বা স্ব-স্বীকৃত নীতিবোধের পর্যায় বলা যায়। এই উত্তরণের মধ্যে দুইটি স্তর থাকে। এক, নীতিবোধ বা প্রিনসিপ্ নমনীয় হবে— এই বোধ। নমনীয় হবে কারণ প্রতিটি ব্যক্তি, অবস্থা, সমস্যা আলাদা। দুই, সামাজিকতা বোধের পাশাপাশি ব্যক্তির ভালমন্দ বোধ, আদর্শ বোধ ইত্যাদির স্থান থাকা চাই।
সার্বিক মঙ্গলের বোধটি এভাবে নীতিবোধকে প্রভাবিত করে। এই তিনটি স্তরে যে পরিবর্তন নৈতিকবোধকে তৈরি করে তা সময় মতো না হলে অনেক অসামঞ্জস্য ও যন্ত্রণার হেতু হয়ে দেখা দেয়। এই উত্তরণের পথে দুটি বাধা আছে। এক, বিচারশীল ধীরস্থির পরিচালনের অভাব। শৈশবের বিষয়কেন্দ্রিক অনুসরণ মাত্রিক নীতি-নির্দেশ থেকে তারুণ্যের নিয়ম-আদর্শ-নীতি কেন্দ্রিক অবস্থানে পৌঁছতে মা- বাবা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহানুভূতিপূর্ণ সহযোগিতা ও পথনির্দেশ চাই। বড়রা অকারণেই ধরে নেন যে ওদের যখন বয়স হয়েছে তখন আর কি! ওরা বুঝে গেছে, জেনে গেছে।
ব্যাকরণ না শিখলে বা শিখিয়ে দিলে কি ওরা বুঝতে পারে যে বাক্যস্থিত বিভিন্ন শব্দের মধ্যে কোন্ সম্পর্ক কী ভাবে ও কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? বাক্য গঠন করতে ও বলতে পারলেই কি ধরে নেওয়া যায় যে ওরা সেই নীতিগুলো, সেই সব ব্যাকরণের সম্পর্কগুলো জানে? নৈতিকতাবোধের স্টিয়ারিংটি মা-বাবার হাত থেকে তারুণ্যের হাতে চলে যাবে, স্বনির্দেশিত হবে। ঠিক আছে। সাহায্য চাই না? বোঝা যায় যখন বিপরীত যৌন-সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যবহারের অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। তখন মা-বাবার টনক নড়ে; বোঝেন যে শিখিয়ে বুঝিয়ে দেবার দরকার ছিল।
দুই বাড়িতে এবং স্কুলে। ধরেই নেওয়া হয় ওরা বোঝে। তাই শাস্তির ব্যবস্থা থাকে। ওঁরা মনে করেন যে এরা ইচ্ছে করেই অন্যায়গুলো করছে। এরা যে না-বুঝে করছে তা এঁরা বোঝেন না । কেন যে কোনো কাজ অন্যায়, অন্যকাজটি নীতিসম্মত তা বলে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলে এবং অন্যায়কে শাস্তিযোগ্য ও ন্যায়কে প্রশংসা যোগ্য বলে দেখিয়ে-শিখিয়ে দিলে এই উত্তরণ সহজ হয়।
