শিশুর বয়ঃসন্ধির উৎস সন্ধানে – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ। বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের মতে বয়ঃসন্ধির বিন্দু অবস্থান সময়ের কমবেশি বছর পাঁচেক আগে থেকে অত্যল্প যৌন-হরমোন একটু একটু করে শরীরের অভ্যন্তরে ক্ষরিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে এই ক্ষরণের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত আনুষঙ্গিক যৌনঅঙ্গাদির পুষ্টি ও বৃদ্ধি ঘটে, মূল যৌন অঙ্গাদি এবং তাদের কার্যকারী পূর্ণতা স্বাভাবিক গড়ে ওঠে। এই সব ক্রিয়া কাণ্ডে পিটুটারি গ্ল্যাণ্ডের (মস্তিষ্কের ভিতে যার অবস্থান) এবং সেক্স গ্ল্যাণ্ডের মধ্যেকার ঘনিষ্ট সম্পর্কটি যাবতীয় যৌন ক্রিয়াশীলতার মূলে। এই সেক্স প্ল্যাণ্ড পুরুষের বেলায় টেসটিস বা অণ্ডকোষ আর নারীদের বেলায় ওভারিস বা গর্ভকোষ।
Table of Contents
শিশুর বয়ঃসন্ধির উৎস সন্ধানে | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা
পরিবর্তন, বৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধি :
সাধারণভাবে কৌমার কালের শুরু, মেয়েদের বেলায়, ৮.৫ থেকে ১১.৫ এর মধ্যে। একে বলা যায় বলয় প্রবেশ, প্রথম স্তর। কেন্দ্রবিন্দু বিদ্ধকারী অবস্থান মোটামুটি ১২.৫ বছর বয়সে। এই সময়ে শারীরিক বৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত। ভিতরে ভিতরে এবং বাইরেও। এই বৃদ্ধির গতি ক্রমশ কমে আসে এবং ১৭/১৮-র মধ্যে প্রায় থেমে যায়।
মেয়েদের বেলায় এখানে শ্রীর বৃদ্ধি ঘটে, রমণীয়তা সুপ্রকাশ হয়। প্রকৃতি ঠাকুরানীর আপনবোধে এরা সম্পন্ন হয়ে ওঠে। ছেলেদের বেলায় ব্যাপারটার শুরু হয় একটু দেরিতে, ১০.৫/১৪.৫ বছর বয়সে। কেন্দ্রে পৌঁছোয় ১৫ তে এবং ক্রমশ হীনগতি পেয়ে থেমে যায় ২০/২১-এ। দৈর্ঘ্য, ওজন এবং শক্তি সময়ের অনুপাতে এবং পুষ্টির অনুসারে বাড়ে। উভয় ক্ষেত্রেই এই বাড়-বৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে বংশগতির কারণে (এণ্ডোক্রিন গ্ল্যাণ্ডস) এবং পরিবেশগত প্রভাবে, যার মধ্যে খাদ্য ও পুষ্টি প্রধান। পুষ্টির অভাব গ্রোথ হরমোনের অভাব ঘটায়, পরিপূর্ণ পুষ্টি পূর্ণতার আবাহন করে।
আবেগীয় বিপত্তি, বিক্ষোভ, বিরুদ্ধতা এবং বিঘ্ন বিপদ ঘটলে অধিক মাত্রায় এ্যাড্রেনাল স্টেরয়েড ক্ষরণ ঘ’টে গ্রোথ হরমোনে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলে থাকে। ফল সব সময়েই কম থেকে বেশি মারাত্মক। আবেগীয় সমতা ও সামঞ্জস্য তাই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় । প্রথম দেহজ পরিবর্তন ঘটে, দৃশ্যমানে, উচ্চতায় এবং ওজনে। ঋতুমতী হওয়ার আগের দুই বছরে প্রায় ৫ ইঞ্চি মতো বেড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। বেশিও বাড়তে পারে। তার পরের বৃদ্ধি কমে যায়। বছরে ১ ইঞ্চি মতো। ১৭/১৮ তে থেমে যায়। ছেলেদের বেলায় রেতঃবান হওয়ার পরপরই দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে।
পরে ক্রমশ কমে আসে। ২০/২১-এ থেমে যায় ৷ ছেলেরা দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ে বলে অনেক দীর্ঘ হয়ে ওঠে। শরীরের ওজন শুধুমাত্র স্নেহপদার্থের বা চর্বির সন্নিবেশ বা সংযোজনেই ঘটে না, হাড় এবং পেশীর বৃদ্ধিজনিত কারণেও ঘটে। তাই যেমন চেহারা ছিল তেমনই আছে বলে ঘাবড়াবার কারণ নেই। ওজন নিলে দেখা যাবে ওজন বেড়ে গেছে। ওই হাড় আর পেশী বৃদ্ধির কারণে। মেয়েদের বেলায় ওজনবৃদ্ধিটা সব থেকে বেশি হয় ঋতুমতী হবার ঠিক আগে ও পরে। ছেলেদের বেলায় বছর দুয়েক পরে। স্নেহপদার্থ বা চর্বির সন্নিবেশ ঘটে প্রধানত তলপেটে, স্তনবৃত্তবলয়ে, উরুদেশে, জঙ্ঘা বা নিতম্ব এলাকায় এবং গালে, ঘাড়ে ও চিবুকে- চোয়ালে।
কিছুকালের এই ঢলঢল অবস্থানের পরেই আবার শীলিত-সামঞ্জস্য ফিরে আসে। দ্বিতীয় প্রধান পরিবর্তনটি ঘটে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আনুপাতিক সমতায়, বিন্যাসে। নাক, পদদ্বয়, হস্তদ্বয়, কোমরের ক্ষীণকটিত্ব, সুডৌল নিতম্ব, পেলব স্কন্ধ, মসৃণ আঙুল। সব মিলে মিশে এক রমণীয় সুন্দর মেয়েদের শিল্পময় মোহময় করে তোলে।
ছেলেদের বেলায়, ক্ষণিক বিলম্বে হলেও, দৃঢ়তাপূর্ণ গঠন, পৌরুষদ্যোতক আকার এবং সুসম একটি চেহারা দান করে। তৃতীয়, প্রাথমিক যৌন অঙ্গাদির সমৃদ্ধি ও পূর্ণতাপ্রাপ্তি। প্রথমে, বয়ঃসন্ধির কেন্দ্রবিন্দু অবস্থানে, পুরুষের বীর্যাধার অণ্ডকোষদ্বয় লিঙ্গনিম্ন হোলের বা মুষ্কমধ্য অবস্থানে মাত্র শতকরা দশ ভাগ পূর্ণতায় থাকে। সেই অণ্ডকোষদ্বয় দ্রুত বৃদ্ধির মাধ্যমে পূর্ণপ্রজননক্ষম হয়ে ওঠে। ২০/২১ বছরের মধ্যে এই পূর্ণতা সঠিক মাত্রায় পৌঁছে যায়। এবং অণ্ডকোষের সমৃদ্ধির সহগ বয়ঃসন্ধির সমস্যা হয়ে পুরুষের লিঙ্গটিও দৈর্ঘ্যে ও পরিবৃত্তে (ঘেরে) বেড়ে ওঠে।
এই পুরুষ জননেন্দ্রিয়টি যখন প্রজননক্ষম হয়ে পূর্ণতা পায় তখন নিশীথ শুক্রপাতটিও ঘটতে থাকে। রাতের এই বীর্যক্ষরণ বা শুক্রপাত স্বাভাবিক এবং সুতরাং ছেলেদের অকারণ আশঙ্কার কোনো কারণ নয়। এমনটি ঘটে যদি সে কোনো যৌন স্বপ্ন দেখে, যদি প্রস্রাবের থলিটি পূর্ণ হয়ে যায়, যদি কোষ্ঠবদ্ধতা থাকে, যদি আঁটো-সাঁটো পোশাকে ঘুমিয়ে থাকে, যদি খুবই গরম চাদর-কম্বলের নিচে ঘুমিয়ে থাকে। ছেলেদের এটা জানা দরকার। সেই জানাটি বই পড়েই হোক অথবা অন্যকোনো ভাবেই হোক।
অজ্ঞতা কুসংস্কারের জনক, অকারণ অনেক দুঃখের হেতু। মেয়েদের গর্ভাশয় (ইউটেরাস) ঐ একই অবস্থান বিন্দুতে অর্থাৎ বয়ঃসন্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে প্রায় ৫ গ্রাম মতো। ষোল বছরে ঐটিই হয় ৪৩ গ্রাম মতো। ফেলোপিয়ান টিউব, ওভারিস এবং ভ্যাজাইনা এই সময়ে দ্রুত সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। বাড়বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি শুরু হয় আগেই কিন্তু প্রথম নিদর্শনটি প্রকাশ পায় মাসিক ক্ষরণের মাধ্যমে। এই মাসিক প্রতি ২৮ দিন অন্তর চলতে থাকবে (আনুমানিক) এবং মেনোপজে গিয়ে ক্ষান্ত হবে অর্থাৎ অনার্তবা, অরজাঃ অথবা অজাতরজস্কা হলেই শেষ হবে।
প্রথমের বছর খানেক মেয়েদের এই মাসিক আবর্তনে সময়ের হেরফের হয়, হয়ে থাকে। দুর্ভাবনার কোনো কারণ নেই। এটা প্রাকৃতিক কারণেই ঘটে থাকে। ডিম্বাণু তৈরি হলে তবেই তো প্রক্রিয়াটা চালু হবে, তাই ‘অফলপ্রসূ’ সময় বলে অমনটি হয়। সব গাছে কি একই সময়ে, একই ভাবে এবং একই নিশ্চয়তায় ফুল-ফল ফলে? তৈরি হয় ? ১৬-১৮ পর্যন্ত সময় ধরে এমন অনিয়ম চলতে পারে।
তাই জননী হবার মতো পরিপূর্ণ-পরিণত অবস্থান অনিবার্যভাবে এই পর্যায়ের আগে নিশ্চিত নয়। চতুর্থ, আনুষঙ্গিক যৌন পরিবর্তনসমূহ নারী ও পুরুষের প্রভেদকে দৃশ্য করে তোলে। রমণীয় ও আকর্ষণীয় করে তোলে। পরস্পরের প্রতি পরস্পরকে মনোযোগী হতে বাধ্য করে। এই পরিবর্তনগুলি সোজাসুজি প্রজনন প্রক্রিয়ায় কাজে লাগে না বলে এদের সেকেণ্ডারি বা আনুষঙ্গিক বলা হয়। এই উভয়বিধ পরিবর্তনের ফলে ছেলে-মেয়েদের শরীর ও মনের উপর বহুবিধ প্রভাব পড়ে থাকে।
১. ক্লান্তি, অবসন্নতা, অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত প্ৰলক্ষণ। এই প্রাকৃতিক অবস্থা বিষয়ে অজ্ঞতা অথবা অনবহিতি অভিভাবকদের সহানুভূতিহীন করে তোলে। ছেলেমেয়েদের উপর কাজের চাপ বাড়তে থাকে। এই সময়ের অবস্থানে ওরা মা-বাবার চাহিদা বা নির্দেশ অনুযায়ী দায়দায়িত্ব পালন করতে পারে না। তাই অনেক ‘ব্যাড ব্লাড’ তৈরি হয়। বিষয়টি মা-বাবা অভিভাবকদের প্রণিধানযোগ্য।
একটু বেশি সহানুভূতি, একটু বিবেচনা, একটু ধৈর্য। এমন কী বেশি! ভিতরে ভিতরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের, যন্ত্র-অংশের বিন্যাস-ব্যবস্থায় ওলটপালট চলছে এবং গ্ল্যাণ্ডগুলোর রস ক্ষরণের অভ্যুদয় চলছে বলে নানারকমের অসুবিধা ভোগ করছে ওরা, বয়ঃসন্ধির কেন্দ্র-প্রসার বলয় অবস্থান কিশোর-কিশোরীরা। হজম শক্তির ও ব্যবস্থার গোলমাল প্রায়ই দেখা দিচ্ছে, রক্তাল্পতা আক্রমণ করছে, খাওয়া দাওয়ার ‘অযৌক্তিক-অবুঝ’ পছন্দ-অপছন্দ পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে, ‘অকারণ’ ক্লান্তি বোধের এবং ‘যা হচ্ছে তা হোপ্পে, যাপ্পে!’ গোছের মানসিকতায় পর্যুদস্ত থাকছে। মেয়েদের ঝামেলা বেশি।
মাসিকের সময়ে মাথা ধরা! সেই নন্দীর সঙ্গে ভৃঙ্গীর মতো পিঠে ব্যথা, তলপেটে ব্যথা, পেশী-খিঁচুনি, বমি করা বা বমি বমি ভাব, অজ্ঞান-অচেতন হয়ে পড়া, চুলকানি এমনকি পায়ে বা অ্যাঙ্কেলে ফুলো ফুলো ভাব জুটে যেতে পারে। ফলে ওরা ক্লান্ত, অবসন্ন, খিটখিটে এবং ডিপ্রেসড্ বা মনমরা ভাবে বিব্রত হয়ে থাকে।
মাসিক যত সুশৃঙ্খল ও সময়-অনুসারী হয়ে ওঠে এই সব উটকো ঝামেলাগুলো ততই কমে আসতে থাকে। মায়েরা যেমন উলের পোশাক বুনতে ‘ঘর’ তুলে রাখেন, তেমনি মেয়েদের বিষয়ে এই ‘সত্যগুলো’ স্মরণে ধরে রাখতে পারেন। বাবাদের বলে বুঝিয়ে দিতে পারেন। অনেক অহেতুক মানসিক দূষিত-রক্তের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে।
এই সব মাথা ধরা ইত্যাদি উটকো উৎপাত এই বয়সের ছেলে এবং মেয়েদের বেলায় ঘটতে পারে অন্য সময়েও, মাঝে মধ্যেই, যখন তখন। এগুলির গুরুত্ব, তীব্রতা এবং ফ্রিকোয়েন্সি নির্ভর করে বয়ঃসন্ধির শুরুর সময়ে কার স্বাস্থ্য কেমন ছিল, কতো দ্রুত এবং সম্পূর্ণতার সঙ্গে পরিবর্তনগুলো বাস্তবে রূপ গ্রহণ করছে এবং মা-বাবা ও পরিবেশের সঙ্গে কেমন প্রতিযোজনা ঘটছে সেই সবের উপর।
২. দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের পরিবর্তন : শরীর অভ্যন্তরের জৈবরাসায়নিক পরিবর্তনের কারণ ছাড়াও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে কৈশোরের সামাজিক-বাতাবরণে। বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েরা তাদের মা-বাবা, ভাই-বোন, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বন্ধু-বান্ধবী এবং আত্মীয়- পরিজনদের কাছে সহানুভূতি ও আণ্ডারস্ট্যাণ্ডিং বা সুস্থ সহমর্মিতা আশা করে। কম কম পেলে বা না পেলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়।
ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি সংবেদনশীল, আগে আগে বয়ঃসন্ধি এসে যায় এবং অনেক বেশি বাধা নিষেধের আরোপে বেড়ে ওঠে। আর এই বাধা নিষেধের ঝামেলাগুলো ঠিক তখনই দেখা দেয় যখন মানসিকভাবে ওরা ক্রমশই সেই বাধা নিষেধের বাঁধন কেটে ‘বড়’ হবার বোধে উজ্জীবিত হয়ে উঠতে থাকে। বিপরীত চাপে সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এই পরের অংশ ছেলেদের বেলায় সমান সত্য। ফলে—
ক) একা থাকার প্রবণতা :
সকলের থেকে এই সময়ে এরা একটু দূরে দূরে, একা একা, থাকতে চায়। ফলে বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে মন কষাকষি, মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়াঝাটি, ভাই- বোনেদের সঙ্গে আড়াআড়ি ঘটে যেতে পারে। দিবাস্বপ্ন ভর করে, কল্পনার আকাশকে আপন করে নেয়। ভাবে ‘কেউ বোঝে না’, ‘কেউ বিশ্বাস করে না’, ‘কেউ আপন নয়’।
এই বিচ্ছিন্ন অবস্থানে এরা (১) হস্তমৈথুনে ঝুঁকে পড়ে, যৌনকেলি-ক্রীড়ায় একান্ত বোধ করে এবং (২) অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের জন্যে একটা একা-একা জগত গড়ে তোলে। বয়ঃসন্ধির সমস্যা এখানে দাওয়াই বলতে সেই সহানুভূতির সঙ্গে ওদের নৈকট্য দেওয়া, ওদের সমস্যাগুলোকে সহজ-সরল স্বাভাবিকতায় বুঝে নেওয়া, বুঝতে দেওয়া; নৈকট্য দিয়ে চিন্তা- ভাবনা-সমস্যার প্রকাশে সহজ করে তোলা। কথাবার্তা ও ভাবের আদান প্রদানের সেতুটি নিবিড় নৈকট্যে সচল রাখা।
খ) একঘেয়েমি :
বয়ঃসন্ধির আগের খেলাধুলো, লেখাপড়া, গল্পগাছা সামাজিক কাজকর্ম এমনকি দৈনন্দিন জীবন যাপন রুটিনগুলো হঠাৎই কেমন যেন নীরস-নিরর্থক বলে মনে হতে থাকে। ফলে যোগ্যতার মাত্রা নেমে যেতে পারে, অর্জনের মান নিম্নমুখী হতে পারে। শারীরিক কারণ এবং মানসিক অবস্থা এর মূলে।
এখানেও পথ সেই সহানুভূতিপূর্ণ ভাবের আদান প্রদান। এটা যে স্বাভাবিক, প্রকৃতির অঘটন ঘটন কাজকর্মেরই একটা সাময়িক অবস্থান তা ওদের অবহিতির মধ্যে, প্রত্যয়ের অনুভবে পৌঁছে দেওয়া দরকার। গল্প উপন্যাস কবিতায় অথবা যা ভালো লাগে সেই শিল্পসৃষ্টিতে মনোযোগী করে দিলে এই অবসন্ন অ-কাল বেলা সহজেই কেটে যেতে পারে।
গ) অব্যবস্থিত ব্যবহার, চলন-বলন, মানসিকতা :
হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করে চিত্ত— এখানে আলো নয় বয়ঃসন্ধির যৌন চেতনা, আর চিত্ত নয় দেহের অভ্যন্তরে দামাল বেগে ধেয়ে আসা কামাল করা অবস্থান। তাই একটু নড়বড়ে অবস্থান তো স্বাভাবিকই ঘটে যাবে। এলোমেলো অবস্থা কদিনেই ঠিক হয়ে যাবে যদি বড়োরা বোঝেন এবং ওদের একটু সহানুভূতির সময় দেন। ওদের জানিয়ে দিতে পারলে আরও ভালো হয়।
ঘ) বিরোধ আর অসহযোগিতা :
শুধু বিরুদ্ধতা আর অসহযোগিতাই নয়, এরা প্রায়ই অমিত্রসুলভ বৈপরীত্যে পৌঁছে যায়, শত্রুতার সামিল। কিশোর-কিশোরীর নাসিকা কুঞ্চনে, তীব্র সমালোচনায়, অবমানকর মতামতে। এই অবস্থাটাও সাময়িক, ক্ষণস্থায়ী। সময় যখন আসে, অচিরেই আসে, তখন সুসময়ের শান্ত শীতল দখিনে বাতাস ঝিরি ঝিরি বইতেও শুরু করে। মাঝখানের ঝড়ো সময়টায় যেমন ধৈর্যের দরকার, দখিনে বাতাসের বহমান শিরশিরানির সময়েও তেমনি পথনির্দেশ প্রয়োজন। সেই ভাবের সেতুটি অবসিত না হলে, কম্যুনিকেশনের পথটি খোলা থাকলে জীবন যে অনেক বড়, অনেক সুদূর প্রসারিত একটি যাপনের নাম তা বোঝালে সহজ হয়।
সহজকে সহজ করাটাই যে সব থেকে কঠিন! ঙ) আবেগীয় উথাল পাথাল, প্রান্তিকতা : বয়ঃসন্ধির প্রথম প্রথম সন্তানদের মেজাজ- মর্জি, অতিরাগ-বীতরাগ, আয়ান-ধাত (মুড টেমপারামেন্ট) এবং অন্যান্য আবেগীয় প্রবণতাগুলো যেন ছিলে টান টান অবস্থানে থাকে।
কখনও ‘ওম মেরে’ বসে আছে, কখনও হঠাৎ হঠাৎ ফেটে পড়ছে, কিছুর মধ্যে কিছু নেই ‘তিনি’ কেঁদে কেটে একসা করলেন! দুশ্চিন্তা- দুর্ভাবনা, সদা সর্বদা একটা যেন কি-হয়-কি-হয় টেনশন, উৎকণ্ঠা, খিটখিটে ভাব, নেতিবাচক মানসিকতা; মেয়েদের চেপে ধরে প্রাক-ঋতুবতী এবং উত্তর-মাসিক অবস্থানে। ছেলেরা এমনটি করে পারিবারিক বাধা-বন্ধনকে নাকচ করে দিতে আর বাইরের ‘স্বর্গের’ টানে। সেই স্বৰ্গ বন্ধু বান্ধব হতে পারে, মাঠ-ঘাট জল-জঙ্গল হতে পারে। আসলে ওদের উভয়কেই এই উদ্ভিন্নযৌবন কৈশোরের দুশ্চিত্ত। দুর্ভাবনা সময়টি ভিতর থেকে তাড়িত করে।
ওদের নিজেদের হাতে তার কতটুকুই বা আছে, থাকে ? সেই সেতুটি সচল রাখাই একমাত্র পথ। কদিনেরই বা এই অবস্থান! পূর্ণ যৌন অবস্থানে পৌঁছে গেলেই ‘সব ঠিক হ্যায়’ হয়ে যাবে। সেই কটা দিন ধৈর্য আর সহানুভূতি, সেতু আর যোগাযোগ— কম্যুনিকেশন।
চ) আত্মপ্রত্যয়ের অভাব :
ওরা এই সময়ে বড়ো নরম, বড্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। ভিতরের প্রভাবে আর বাইরের অনুচিত ব্যবহারে। বয়ঃসন্ধির আগে বেশ বুক টান টান আত্মপ্রত্যয়ী ছিল, প্রাপ্তিতে-অর্জনে মনোযোগী ছিল, হঠাৎ এরা শরীরজ কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে আর অকারণ সমালোচনার শিকার হয়ে সেই প্রত্যয়কে হারিয়ে ফেলে। ‘তুমি দিন দিন যেন কেমন হয়ে যাচ্ছ!’ ‘আগের মতো আর তেমন অধ্যবসায়, মনোযোগ নেই!’ ‘এক কথা সাতবার না বললে তোমার আর এখন কানেই যায় না!’— ইত্যাদির মার বড় মার। বন্ধু-বান্ধব-সতীর্থরা বলে, তার থেকে বেশি বেশি বলে মা-বাবা ও অন্যরা।
অনেক ছেলে মেয়েরাই তাই এই সময়ের পরে আত্মঅবিশ্বাসী হীনমন্যতার শিকার হয়ে বেড়ে ওঠে। স্বাভাবিক একটা মেঘাচ্ছন্ন সময়কে একেবারেই অকারণে দুঃসময়’ করে দাঁড় কারানো হয়। অদূরেই তো রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনমণির আগমন অপেক্ষারত।
তবে কেন হবো ধৈর্যহীন? প্রকৃতি ঠাকরুণ নিজের হাতেই তো ওদের ভাঙছে-গড়ছে; ভাঙ্গার সময়টা স্বল্প, গড়াটা দীর্ঘস্থায়ী। ওরা তো নয় তার জন্যে দায়ী! এই ভাঙ্গাগড়ার গতি দ্রুত সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধিতে উন্নীত। বয়ঃসন্ধির কাল বা বয়স নানান কারণে ব্যক্তিবিশেষের বেলায় বিভিন্ন হতে পারে। এবং এই সময়টি নেতিবাচক মানসিকতার জননী। যে মুহূর্তে পূর্ণযৌবনোদয় ঘটে যাবে সেই তখনই কৈশোর পর্ণে পরিণত হয়ে নিজের নিজেকে খুঁজে পাবে। এই খোঁজে আমাদের দায় পথ দেখানো, সাহায্য করা ।
