বয়ঃসন্ধিতে উদ্ভিন্নযৌবন কৈশোরের দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা

বয়ঃসন্ধিতে উদ্ভিন্নযৌবন কৈশোরের দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ।

বয়ঃসন্ধিতে উদ্ভিন্নযৌবন কৈশোরের দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

 

কিশোরদের :

১. নিশীথ ক্ষরণ বা স্বপ্নদোষ:

আমরা আগেই দেখেছি যে স্বপ্নদোষ কোনো দোষের বিষয়ই নয়, যৌনস্বপ্নই নিশীথ ক্ষরণের একমাত্র কারণ নয়। তা সত্ত্বেও কিশোর-তরুণদের মনে কেন যে এমন একটা জৈব স্বাভাবিক ঘটনাকে ‘দোষ’ বলে চালানো হলো তা বোঝা মুশকিল। তবে অজ্ঞতা যে এর একটি কারণ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই হঠাৎ অভিজ্ঞতায় কিশোর হকচকিয়ে যায়, আতঙ্কিত হয়, একটা শঙ্কা বা ত্রাসের সৃষ্টি হয়।

একটা সুখদ শিহরণের পাশাপাশি একটা স্নায়ুবিকারের সম্ভাবনা উঁকি দেয়।

২. মুখে দাড়ি-গোঁফ:

মুখে দাড়ি-গোঁফ না উঠলে বা দেরিতে উঠলে এরা উৎকণ্ঠিত বোধ করে। স্বরভঙ্গ জনিত অস্বস্তি থাকে। তার সঙ্গে দৈহিক উন্নতি বিলম্বিত হলে, পেশীর শক্তি অনুভবে ধরা না পড়লে বিব্রত বোধ করে। (ব্যক্তিগত প্রভেদের কথা, বংশগতির কথা, খাদ্য ও পুষ্টির বিষয় ইত্যাদি স্মরণ রেখে এই বিলম্ব বা অব্যবস্থা থেকে কিশোরকে মুক্ত রাখা যায়।) মেয়েদের প্রতি অনীহা বা বৈপরীত্য : এটি একটি পীড়াদায়ক মানসিক অবস্থা। সমবয়সী প্রাপ্তযৌবন বন্ধু বান্ধবরা নারীর রমণীয় অস্তিত্বের এবং উপস্থিতির প্রতি যথেষ্ট বয়ঃসন্ধির সমস্যা

 

মনোযোগী অথচ অপুষ্ট-অপ্রাপ্ত-যৌবন বা অসমৃদ্ধ অবস্থানের কিশোররা স্বভাবতই পিছিয়ে পড়া হবে। ভিতরথেকে সেই যৌন শক্তির যোগানটি তখনও কেবলমাত্র ঝরনার মতো ক্ষীণ, দুকূল প্রসারী পূর্ণতার প্রকাশে বহমান নয়। তাই বিলম্ব, তাই অমনোযোগী, তাই বৈপরীত্য। সময় এলেই ‘এরা’ স্বাভাবিক ভাবেই ‘ওরা’ হয়ে যাবে। তখন আর যন্ত্রণা থাকবে না। সময় যখন আসবে সময় তখনই হবে। আগে হবে কেন?

কিশোরীদের :

১. রজস্বলা বা মাসিক:

হঠাৎ রজস্বলা হবার, মাসিক হয়ে পড়ার ধাক্কায় এরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। আগে থেকে জানলেও, না-জানলে তো বটেই। জানা আর বাস্তবে সেই ঘটনা রক্তের প্রবাহে সত্য হয়ে, যাবতীয় অস্বস্তির কারণ হয়ে, নাকানি চোবানি খাওয়ানোর ব্যাপার হয়ে দাড়ালে সেই কেতাবি জানা দিয়ে ভয়কে এবং অস্বস্তিকে ঠেকানো যায় না। বিশেষ করে যদি তার সঙ্গে সঙ্গে বমিটমি হতে থাকে, পেশী সংকোচের বেদনা যোগ হয়। অনেকে তো আতঙ্কের ঠেলায় মনে করে যে এই রক্তপাতেই জীবনের শেষ হয়ে যাবে— মরেই যাবো!

 

অনেক কিশোরীই মাসিকের সময়কার ব্যথা-বেদনা-পেশীকামড়ানির অস্বস্তিকে স্বাভাবিক মনে না করে দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনায় ভোগে। অকারণ। অনেকে বুকের গঠন শঙ্কু-আকৃতির বলে, মুখের-হা, ঠোটের পুষ্টতা ইত্যাদি নিয়ে অকারণ আশংকায় ভোগে। দাড়ি-গোঁফের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে। এরা যদি জানতে পারে যে প্রতিমার পূর্ণাবয়ব গঠনে শিল্পীর অনেক সময় লাগে, অনেক প্রক্রিয়া-পর্যায় পার হতে হয়, তাহলে এমন অকারণ-অমূলক ভয় কেটে যাবে। মনের সুন্দর মুখের চেহারায় প্রতিফলিত হয়; ধৈর্য প্রকাশ পায় রমণীয়ত্বে।

 

“ছোটদের বড় দোষ— বড়দের কথা শোনে না যে! বড়দের বড় দোষ— ছোটদের কথা শোনে না সে! ছোটবড়র এই দ্বন্দ্ব চলছে চিরদিন, রাগে গরগর কথা, ফরফর রাতদিন।” — দোষের খতিয়ান। ‘একের মধ্যে তিন’। (১ম খণ্ড), ‘অর্ধেন্দুশেখর ভট্টাচার্য। ছেলে মেয়েদের ‘মানুষ’ করে তুলতে মা-বাবাদের ভাবনার শেষ নেই, চিন্তার অবধি নেই, দুশ্চিন্তার লেখাজোখা নেই।

এঁরা জানেন বোঝেন অনেক, নির্দেশ উপদেশ তথ্য সত্যাদি সংগ্রহ করেন প্রভূত। সন্তানের ভাল কে না চান? এই ভাল চাইতে, সন্তানের ভাল করতে এঁরা উর মাটি চুর করতেও পিছপা হন না। কষ্ট স্বীকার? ত্যাগ?— যা বলবেন তাই এঁরা করতে উন্মুখ। কিন্তু সব নদীর গতি যেমন সমুদ্রে বা হ্রদে তেমনি সকল মা-বাবার সব অভিযোগ-অনুযোগ- ফরিয়াদ গিয়ে ঠেকে সেই— ‘কথা শোনে না’-তে !

আবার শিশু-কিশোর-তরুণদের বলতে দিন দেখবেন ওদেরও সব কথার শেষ কথা সেই— বড়োরা ছোটদের কথা শোনেনা যে! মুশকিল এই যে ওদের আমরা বলতে দিই না, ওদের না-বলা কথায় কানও দিই না, ওদের অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুচ্চার অভিমানে আমরা মনও দিই না। সময় নেই বলেই নয়; মনটিই আসলে নেই বলে। বড়োর চশমাখানা আমরা এমন শক্তপোক্ত করে নাকে লাগিয়ে রাখি, প্রায় সর্বক্ষণই, যে ওদের চশমায় ওদের মন মানসিকতাকে দেখার দৃষ্টিটাই আর খুঁজে পাই না।

Leave a Comment