বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর অবপ্রতিযোজন বা ম্যালঅ্যাডজাষ্টমেন্ট – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ। বয়ঃসন্ধির সময় বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এই সিরিজে আমরা আলাপ করছি | অবপ্রতিযোজন বা ম্যালঅ্যাডজাষ্টমেন্ট : কৈশোর তারুণ্যের কয়েকটি অব-প্রতিযোজনার বিপদ সংকেত।
অবপ্রতিযোজন বা ম্যালঅ্যাডজাষ্টমেন্ট | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা
১. দায়িত্বের প্রতি অবহেলা। স্কুলের পড়ায়, কাজে, হোমটাস্কে অমনোযোগ। পরিবর্তে ঝোঁক দেখা দেয় অপরের কাজে, সাহায্যে, সামাজিক পরকেন্দ্রিক মনোভাবে। প্রশংসার আকর্ষণ। ‘পড়াশুনোয় মতিহীন, পাড়াবেড়ানি’ (মেয়েদের বেলায়); সভা-সমিতি আড্ডাবাজ (ছেলেদের বেলায়)।
২. আগ্রাসী আচরণ, ধৃষ্ট প্রতিক্রিয়া। দপদপানি চলন-বলন। পড়াশুনোর কথা বললেই একটা স্থির-নিশ্চয় (কক্শিওর) মনোভাবে বলে উঠবে – সব ঠিক আছে, সময় কালে দেখতে পাবে।
৩. পরিবারে অস্বস্তি, অনিশ্চয় স্থানের অনুভবে দলের সেবক হয়ে ওঠা, ক্রিতদাস হয়ে দলের কাজ করা। সেখানেই সুরক্ষিত বোধ করা।
৪. পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে গেলেই গৃহ-ব্যথা, বাড়ির টান, হোমসিকনেস্, চেপে ধরে।
৫. পরিবারের দুর্ব্যবহারে শহীদ-শহীদ মনোভাব ।
৬. বয়স ও সময়ের যোগ্য দায়দায়িত্ব, কাজকর্মের হাত থেকে পিছলে শৈশবের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতা। সেই ভাবেই সুখ-তৃপ্তি-সুরক্ষা আদায় করে নেবার চেষ্টা।
৭. মনোবিজ্ঞানে যাকে প্রতিরক্ষার প্রবর্তনা বা ডিফেন্স মেকানিজম্ বলে আর ফ্রয়েড যাকে মেন্টাল মেকানিজম্ বলেছেন সেই সব পথে নিজের অব-প্রতিযোজিত বর্তমানকে, ম্যাল-অ্যাডজাস্টেড অবস্থাকে, সামাল দিতে চায়। র্যাশনালাইজেশন, প্রোজেকশন, ফ্যান্টাসাইজিং, ডিসপ্লেসমেন্ট ইত্যাদির মাধ্যম গ্রহণ করে।

অবস্থা যখন এমন হয়ে ওঠে তখন ‘আর দেরি নয়’; ‘বেশি দেরি হয়ে যাবে’ বলে কাউনসেলিং, মনোবিশ্লেষণ ইত্যাদির ব্যবস্থা অনিবার্য। সন্তানের এবং মা-বাবার। কারণ ওদের বর্তমানের জন্যে অতীত দায়ী, আর সেই অতীতের জন্যে মা-বাবার দায়টাই বেশি। গোলমালের উৎস সন্ধানে রক্তচক্ষু তাড়না কোনো কাজের কথাই নয়। ‘ছেলেটা মানুষ হলো না’ বা ‘মেয়েটা নষ্ট হয়ে গেল’ বলতে মা-বাবা সে অনুসিদ্ধান্তটি প্রকাশ করতে চান তা মনোবিজ্ঞানের বিশ্লেষণে সত্যও নয় সঠিকও নয় – ওরাই দায়ি নয় এই অমানুষ হওয়ার হেতুতে অথবা নষ্ট হওয়ার প্রকরণে। না, কিছু থেকে অনেকটা বোঝা মা-বাবাকে বইতেই হবে, যদি সবটাই না হয়। বিচার বিশ্লেষণটি নিজেদের আবেগীয় অক্ষম হাতে না রেখে বিজ্ঞানীদের সজ্ঞান সক্ষম বিশ্লেষণে ছেড়ে দিন। পৌঁছে দিন, পৌঁছে যান।
কৈশোর-তারুণ্যের কষ্ট-যন্ত্রণা-বেদনা-বিষণ্ণতা আছে। দুর্বিসহ ক্ষণ আছে, অবস্থান আছে। তার পাশাপাশি আছে আনন্দ-উচ্ছলতা-মধুরতা-উদ্ভাস। রোমান্টিক ক্ষণ আছে, মনোরম অবস্থান আছে। সুস্থ প্রতিযোজিত কৈশোর আর বিকৃত-বিধ্বস্ত তারুণ্যের যেমন অভাব নেই তেমনি আছেন মধুর স্বভাব সহানুভূতিশীল মা-বাবা, আবার হিটলারী-তুঘলকী পিতা-মাতা। এটা কি লটারি ?
সন্তান অমার আত্মজ-আত্মজা। ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে’-র দল। না-কি “সন্তান আমার, ভাবতে হবে – একটি খামার; / ফসল ফলাতে হবে, গভীর সেচন হবে / অথবা ড্রিপিং! অন্যথা কপালে জুটবে ট্রিপিং!!”
(একের মধ্যে ভিন : ১৬. ওরা সব শৈশবের মাথাই চিবায়। পৃ. ৭২, অর্ধেন্দু শেখর ভট্টাচার্য।) কৈশোর তারুণ্যের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে—
১. নতুন নতুন সম্পর্ক-সংযোগ স্থাপন। পরিশীলন পরিমার্জন। সমগোষ্ঠীয় সঙ্গে, বন্ধুবান্ধবীদের মধ্যে, সম এবং বিষম যোনি সম্পর্কের ক্ষেত্রে। রুচিশীলতা ও শিষ্টতার প্রতি আকর্ষণ।
২. নারী ও পুরুষ-সুলভ দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যবহার ও দায়দায়িত্ব গ্রহণ। পারিবারিক ও সামাজিক আচরণে শ্রেণীবৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ও প্রস্তুতি।
৩. নিজ নিজ শরীর বিষয়ে সম্যক অবহিতি এবং যথাযোগ্য ব্যবহার। আচার-আচরণে, চলনে-বলনে।
8. নিজ নিজ শ্রেণীর জন্যে স্বীকৃত মান্য বিধিবিধান জানা ও অনুসরণ বিষয়ে আগ্রহ, মনোযোগ এবং দায়িত্ব গ্রহণ।
৫. ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অবস্থান ছাড়িয়ে আবেগীয় স্বাধীনতা ভোগের আকাঙ্ক্ষা। মা বাবা ও গুরুজনদের মধ্যে থেকেও নিজ নিজ অনুভবের স্বাতন্ত্র্যে স্থির থাকার বাসনা, স্বাধীনতা প্রিয়তা।
৬. অর্জনে প্রাপ্তিতে সম্পন্নতা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতাভোগের বাসনা। চাকরিবাকরি কেন্দ্রিক ক্যারিয়ার সচেতনতা ও আগ্রহ।
৭. প্রেম ভালবাসা, বিবাহ-পরিবার বিষয়ে চিন্তাভাবনা কল্পনা, পরিবার গঠনের অভিপ্রায়-প্রস্তুতি। মনে মনে। কল্পনার জগতে।
৮. আদর্শ ও মূল্যবোধ বিষয়ে নিজ নিজ ধ্যানধারণা। নৈতিকতা ও নৈতিক বিধিবিধান বিষয়ে ভাবনাচিন্তা। অনুসরণ। তত্ত্বগত জীবন দর্শন গঠন।
এই স্বল্পবিন্যস্ত সময়টি প্রাথমিক পূর্ণবয়স্কতার জীবনে প্রবেশের একটি লাফ-তক্তা বলা যায়। স্টেপিং স্টোন। মানসিক সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষিতটি তৈরি হয়ে চলেছে। অদূরেই আরলি অ্যাডাল্টহুডের দিন আগত প্রায়। হাতছানি আছে। সেই পর্যায়ের প্রস্তুতির সূতিকাগৃহ এই তারুণ্যাস্ত সময়টি।
কী কী অপেক্ষা করে আছে? অথবা কিসের হাতছানি টের পাচ্ছে এরা? সেগুলো, সংক্ষেপে, এইরকম—
(১) অর্থকরী কোনো কাজে লেগে পড়া।
(২) জীবনসঙ্গী সংগ্রহ-প্রাপ্তি।
(৩) জীবন, সঙ্গীর সঙ্গে জীবন যাপনের শিক্ষা-দীক্ষা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা,
(৪) পরিবারের সূত্রপাত ও শুরু।
(৫) সন্তান ধারণ-লালন-পালন।
(৬) গৃহের প্রশাসন পরিচালন।
(৭) পারিবারিক সামাজিক দায়দায়িত্ব পালন।
(৮) সঙ্গীসাথী নির্ধারণ এবং একান্ত করে নৈকট্য গঠন। (বিস্তারিত আছে ‘ব্যক্তিক ও পারিবারিক মনোবিদ্যা’ গ্রন্থে।
