বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর কৈশোর অপরাধ প্রবণতা , ডেলিংকুয়েন্সি

বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর কৈশোর অপরাধ প্রবণতা , ডেলিংকুয়েন্সি – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ। এখানে কৈশোর-তারুণ্যের, অর্থাৎ প্রাক্ ও উত্তর বয়ঃসন্ধি পর্যায়ে আবমানসিকতা, অস্বাভাবিকতা, উনমানসিকতা, অপরাধ প্রবণতা ইত্যাদি আলোচনা করবো। বিচ্ছিন্নতার চেতনা, একাকিত্বের বেদনা, হারিয়ে যাওয়ার অনুভব অসামাজিক আচরণের মূলে কাজ করে। কৈশোর অপরাধ প্রবণতাকে তাই প্রধানত মনোবৈজ্ঞানিক ও সামাজিক বলে ধরে নিতে হয়। একই রকমের কোনো একটি মাত্র ব্যাখ্যায় এই অপরাধ প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।

 

বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর কৈশোর অপরাধ প্রবণতা , ডেলিংকুয়েন্সি

প্রতিযোজনা-অভিযোজনার অভাব অবশ্যই। কিন্তু কেন এমন হয়?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে—

১. শারীরিক অস্বাস্থ্য:

স্বাস্থের অভাব অথবা কোনো ত্রুটি ধীরে ধীরে হতাশা ও- অসহায়তার কারণ হয়ে উঠে থাকে। আরও বিস্তারিত করে বলা যায় যে কিছু কিছু অবস্থা কৈশোর-অপরাধপ্রবণতার উৎসে বেশি বেশি কাজ করে থাকতে পারে। যেমন— অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত গর্ভধারণ, ক্ষীণস্বাস্থ্য গর্ভধারণ, জটিল ও যন্ত্রণদায়ক প্রসব, অত্যন্ত আগে আগেই বোতলে দুধ খাওয়ানো, অত্যন্ত বিলম্বে মাতৃস্তন্য ছাড়ানো, শিশুর ওজনের অস্থিরতা, বেশি ওঠানামা, দৃষ্টিশক্তির ঘাটতি বা অভাব, অত্যন্ত বৃহৎ বা রোগগ্রস্ত টসিল, যৌন বৃদ্ধি ও পরিণতির পথে বাধা বা রূদ্ধাবস্থা। ইত্যাদি।

২. ব্যবহারিক বৈকল্য:

ব্যবহারের দিক থেকে অত্যন্ত ছটফটে ভাব, মাত্রাহীন অসহিষ্ণুতা, অথবা প্রত্যাখ্যাত-বাতিল শৈশব, সুরক্ষিতবোধের অভাব, অযোগ্য বলে ঘোষণা হেতু নিরানন্দ-জীবন এবং অপরাধ-বোধে তাড়িত বাল্য-কৈশোর। সিনেমা দেখার প্রতি অভূগ্র আগ্রহ, বার বার একই ছবি দেখা, অপরাধের প্রথা- প্রকরণ আয়ত্ত করা। গোয়েন্দা গল্প, রহস্য-কাহিনী, আক্রমণাত্মক ও অপরাধ চিত্র, চুরি ডাকাতির ছবি ইত্যাদির প্রতি ঝোঁক। এই অপরাধ প্রবণতা পুরুষের মধ্যেই বেশি ছিল, পেশীবহুল পৌরুষের পক্ষে স্বাভাবিক বলেই হবে। ইদানিং মেয়েদের মধ্যে এই প্রবণতা যথেষ্ট রকমের বেড়ে গেছে।

যৌন সম্পর্কের বিষয়ে ধ্যানধারণার পরিবর্তন এর মূলে— গৃহের অসামঞ্জস্য, বিদ্যালয়ের অসাফল্য, ভাঙ্গা ও বিচ্ছিন্নতা আক্রান্ত পরিবার, যৌন সঙ্গম ও ব্যভিচার, হতাশা এবং শোষণ এই পরিবর্তনের মূলে। দারিদ্র্যের উল্লেখ করা হয় নি কারণ অর্থসম্পদে সম্পন্ন গৃহে পরিবারেও কৈশোর অপরাধ প্রবণতা কম নেই। খুবই জটিল এবং অপ্রতুল অনুসন্ধান সম্ভব হয়েছে। তবুও মনে করা হয় যে— বিলম্বিত তারুণ্যের যন্ত্রণা একটি কারণ।

লেখাপড়া শেষ করতে এদের ধৈর্য থাকে না! ২০/২১ পর্যন্ত প্রস্তুতি চলবে? সম্পন্ন সন্তানরা এই বিলম্ব সহ্য করতে চায় না। বিদ্রোহ ও অপরাধ প্রবণতা ওদের সম্পন্নতায় পুষ্ট ব্যক্তিত্বের বাহন হয়ে দাঁড়ায়! ভোগের তৃষ্ণা একদিকে আর প্রস্তুতি ও প্রাপ্তির বিলম্ব অন্য দিকে। আত্মশাসন বিপর্যস্ত হয়, বিশৃঙ্খলা পেয়ে বসে— ডেলেংকুয়েন্সি দূরে থাকতে পারে? মনোবিজ্ঞানীরা আর একটি কারণের কথাও বলেছেন।

ইদানিং হঠাৎ এবং অত্যন্ত দ্রুত আর্থসামাজিক উঁচুতলায় পৌঁছোনোর ঘটনা কম নয়। মানসিক প্রস্তুতিহীন, সাংস্কৃতিক ভিত্তিহীন এই সব জীবনের কৈশোর-তারুণ্য তাল সামলাতে অক্ষম হয়ে পড়ে, অরক্ষিত- অনাকাঙ্ক্ষিত বোধে পীড়িত হয়, স্থান-কাল-পাত্রে হারিয়ে যাওয়া নযযৌনতস্তৌ এই সন্তানেরা বিদ্রোহী, অথবা অপরাধপ্রবণ ‘অসামাজিক’ আচরণে ঝুঁকে পড়ে। নানা প্রকারের ড্রাগস্, সাইকোট্রপিক নেশার উপাদান এদের আকর্ষণ করে। তারপর পিছল আর পিছল পথে ‘অগ্রগতি’ রোধিবে কে? কিন্তু কি ভাবে এবং কেন পিছলায় ?

১. দুঃখ-কষ্ট, হতাশা-যন্ত্রণা, অসাফল্য-শূন্যতা থেকে বাঁচতে, বয়ঃসন্ধির

২.সমস্যা সমাজে পরিবারে স্বস্থান (আইডেনটিটি) অন্বেষণে বিফলতা থেকে মুক্ত হতে,

৩. মনের ‘প্রসার’ বা ‘হাওয়ায় উড়ে বেড়ানোর’ অনুভবের আকর্ষণে,

৪.অপার স্বাধীনতার আস্বাদন মানসে।

অনেকে আবার ডেলিংকুয়েন্সিকে সামাজিক এবং একা-নির্জন(স্যোশাল এবং সলিটারি বলে ভাগ করেছেন। সাধারণত অপরাধ প্রবণতার উৎসে থাকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত অভাব বা বঞ্চনা। এই অবস্থায় দলবদ্ধ বা গোষ্ঠীবদ্ধ অপরাধ-প্রবণতা প্রকাশ পায়। আবার যে সব পরিবারে এই সব বঞ্চনা বা অভাব নেই সেখানেও অপরাধী মন তৈরি হয় — এরা নির্জন-একক ডেলিংকুয়েন্ট। দুটি কথা বলা দরকার। এক, বঞ্চনা আছে কি নেই তা কৈশোর-তারুণ্যের ব্যক্তিগত-বিষয়ীগত মূল্যায়নে স্থির হচ্ছে। ভাল ব্যবস্থাকে ওরা খারাপ এবং বঞ্চনাকারী বলে মনে করতে পারে; খারাপকে ভালো। মনে করাটাই এখানে আসল। দুই, সম্পন্ন গৃহে বঞ্চনার বদলে প্রাচুর্যই নষ্টের কারণ এবং সেখানেও দলবদ্ধ অপরাধের উদাহরণ কম নেই।

অপরাধপ্রবণ কাজ বা সমাজবিরোধী কাজ দুই রকমের বলা যায়। এক, আইনের পরিভাষায় : সাত থেকে সতেরো বছর বয়সের মধ্যে আইন লঙ্ঘনকারী কাজ। দুই, সমাজের বিচারে : সমাজ অস্বীকৃত, সমাজ বিরোধী কাজ। এই এলাকায় অনৈতিক কাজ, দুশ্চরিত্রতা, ব্যভিচার, লাম্পট্য, ভ্রষ্টাচার, কদভ্যাস-বদভ্যাস-উচ্ছৃঙ্খলতা ইত্যাদি সামিল হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তব মুশকিলটি অন্যত্র — আইন-সমাজ-প্রতিষ্ঠানগত বিচার এবং তার বৈচিত্র্যের ফলে সেই বিচারের ও সিদ্ধান্তের বিভিন্নতা। কোনো সামান্য সার্বিক বিধান বা বিধি নেই যা সব দেশে, সব কালে সর্বত্র একই ভাবে মান্য। তাই ডেলিংকুয়েন্ট কাজের সংজ্ঞার্থ একরকম হয় না।

 

ভিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ে। এবং দ্বিতীয় মুশকিলটি এই রকম : যুবক-প্রৌঢ়দের কাছে, বিজ্ঞানসম্মত পথে, ‘ফিরে-দেখা’ অতীতের আচরণ-ইতিহাসের খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে (রেট্রপেকশনে যে তাঁরা প্রায় সকলেই কোনো না কোনো বে-আইনি কাজ করেছেন তাদের কৈশোর তারুণ্যে, অপরাধ-প্রবণতার শিকার হয়েছেন, দুষ্ক্রিয়ায় জড়িয়েছেন, মিথ্যাচার এবং যৌন ব্যভিচারে অংশ নিয়েছেন। এঁদের বেশির ভাগই ধরা পড়েন নি এবং পরে প্রত্যেকেই স্বীকৃত সামাজিক জীবন যাপন করেছেন।

 

৩. পারিবারিক কারণ:

আমরা আগেই দেখেছি কী কী কারণে বিদ্রোহ-বিরোধিতা দানা বাঁধে। অপরাধ প্রবণতার বীজতলা হলো : নিম্নমানের পরিবেশ, বঞ্চনা, গৃহে অভ্যন্তর বিচ্ছেদ-বিচ্ছিন্নতা, ভুল শিশু লালন-পালন প্রক্রিয়া, নিম্নমানের এবং দূষিত অভিভাবক-শিশু সম্পর্ক। পরে, প্রতিপদে প্রতিযোগিতার অস্বস্তি, চলচ্চিত্র ও দূরদর্শনের প্রভাব এবং আরও। আমরা আগেই আলোচনা করেছি।

 

দেখা গেছে যে ভ্রষ্টাচারী সন্তানদের মা-বাবারা বেশি বেশি স্বৈরাচারী, বিধিনিষেধ আরোপকারী, স্নেহভালবাসার প্রকাশে কৃপণ, কঠোর কঠিন মনের, সন্তানদের কাছে অনেক বেশি বেশি আনুগত্য দাবি করেন। এই বিষয়গুলি নিয়েও আগে আলোচনা করা হয়েছে—স্বৈরাচারী-গণতান্ত্রিক-সর্বানুমোদনতান্ত্রিক মা-বাবা এবং পরে, মনোবৈজ্ঞানিক-অ্যাকসেপ্টিং- রিজেক্টিং পেরেন্টসদের কথা আমরা আগেই বলেছি। দুইটি কথা বলা দরকার। এক, ভ্রষ্টাচারীদের দেখে মা-বাবাদের বিষয়ে অনুসিদ্ধান্ত করা হয়েছে তাই বিপরীত ক্রমে এটা সত্য নাও হতে পারে।

অর্থাৎ অমন মা-বাবা হলেই সন্তান ভ্রষ্টাচারী হবে এমন যৌক্তিক অনিবার্যতা নেই।, দুই, চাকরি করা, এবং সুতরাং অনুপস্থিত মায়েদের দীর্ঘ সংযোগহীনতার সঙ্গে ভ্রষ্টাচারের তেমন কোনো যোগাযোগ বিজ্ঞানীরা খুঁজে পান নি। ওঁরা বরং বেশি সন্তান-মন নিয়ে স্বল্পসময়ে সেই অনুপস্থিতিকে ভরিয়ে দিয়ে থাকেন। অনুপস্থিত মায়ের চাইতে যা বেশি প্রভাব ফেলে সন্তানের মনে তার বিবরণ আগেই দেওয়া হয়েছে— ভগ্ন গৃহ, অশান্ত মা-বাবার সম্পর্ক, নিম্নমানের জীবন, বিবাহ-বিচ্ছিন্ন সংসার ইত্যাদি।

Leave a Comment