বয়ঃসন্ধির প্রত্যাখ্যান, কঠিন-কঠোর, রিজেক্টিং পেরেন্টস

প্রত্যাখ্যানী, কঠিন-কঠোর, রিজেক্টিং পেরেন্টস – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” নিয়ে আজকের আলোচনা। অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান, দয়াহীন ভালবাসাহীন, অনাদর-অবজ্ঞায় ঘেরা শৈশব-কৈশোর, অমনোযোগের অস্বীকারে পর্যুদস্ত, যেন- তেন যত্র-তত্র জীবনের অবমাননায় অরক্ষিত, প্রত্যাখ্যাত কৈশোর দুর্বিসহ হয়, সন্তানের পক্ষে। মা-বাবার জীবনের দুর্ভাগ্য বা কোনো ট্র্যাজিডি এর মূলে থাকতে পারে। আর্থসামাজিক এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপেও এমনটি হতে পারে। একটি বিষয় স্মরণ রাখা দরকার। আপাতদৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যানী মা-বাবা মনের গভীরে গভীর মমত্ববোধে সম্পৃক্ত হতে পারেন। অন্তরের অন্তস্তলে আছে অন্যথা অপ্রকাশযোগ্য স্নেহভালবাসার উৎস ফল্গুধারাটির।

প্রত্যাখ্যানী, কঠিন-কঠোর, রিজেক্টিং পেরেন্টস | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

বাস্তবের মরুসাহারায় সে রিক্ততা দ্বারা আক্রান্ত। এমন হতে পারে। শিশুকে জলে ফেলে দিয়ে মায়ের কান্না— শোনো নি কি জননীর অন্তরের কথা— এই সত্যকেই নির্দেশ করে। মনোবিজ্ঞানীরা প্রত্যাখ্যানী জননীর যে যে বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করেছেন –

১. এঁরা সন্তানের ঝামেলা এড়াতে, বিরক্তি থেকে মুক্ত হতে অথবা সুশৃঙ্খল করার মানসে সন্তানকে বোর্ডিং, ইনস্টিট্যুট, শোধনাত্মক স্কুলে জমা করে দেন।

২. এঁরা সন্তানের দোষগুলিই বেশি বেশি করে দেখেন, নঞর্থক নিরিখ ব্যবহার করেন, কঠিন-কঠোর শাস্তির বিধান করে থাকেন।

৩. এঁরা সন্তানদের তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন, ধমকানোর পথ বেছে নেন, ঘরে বন্ধ করে রাখার ঘোষণা করেন, খাওয়া বন্ধের হুমকি দেন, “আসুক বাবা’-র ছড়ি উঁচিয়ে রাখেন।

৪. অনেকে একটু কম তীব্র পথ গ্রহণ করেন- ঘ্যান ঘ্যান করেন, একটু আধটু হাত বয়ঃসন্ধির সমস্যা চালান, সন্তানের মনের বা বক্তব্যের তোয়াক্কা করেন না, মনোযোগ দেন না, সন্তানদের দৈনন্দিন চাহিদা-খরচাদির প্রতি নেতিবাচক থাকেন, কারণে-অকারণে অন্যান্যদের সঙ্গে তুলনা করে হেয় প্রতিপন্ন করেন। এঁরা সহানুভূতিহীন বলে সন্তানদের জন্যে ডাক্তার, শিক্ষক বা কাউনসেলিং ইত্যাদির ব্যবস্থার সুযোগ নেন না।

৫. এঁদের এই ধরনের ব্যবহার সন্তানকে ক্রমশই এঁদের মিত্র নয় শত্রু ভাবাপন্ন করে তোলে, বিরুদ্ধতা ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে। সন্তানরাও তেমনি প্রতিক্রিয়ায় ঝুঁকে পড়ে।

৬. অনেকে শর্ত আরোপ করে ভালবাসার কথা বলেন : ভালো ব্যবহার করলে এটা পাবে ওটা পাবে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে কথা শুনবো, ভালো ফল করলে ‘সেটা’ পাবে, প্রথম বিভাগে পাশ করলে……….ইত্যাদি।

৭. অনেকে সন্তানের মনের ও দেহের চাহিদা পূরণ করেন না। স্কুলে বা অন্য কোনো বিষয়-ব্যাপারে ভয় পেলে কান দেন না, দুর্ব্যবহার পেলেও সহানুভূতি দেখান না। ৮. অনেকে ঝামেলা এড়িয়ে যাবার জন্যে সন্তানের যাবতীয় চাহিদা পূরণ করেন, অন্যায় আবদার মেনে নেন।

এই বিচার-বিবেচনা-হীনতাও, এই ‘ঘুষ’ দিয়ে ঠাণ্ডা রাখার প্রক্রিয়াটিও প্রত্যাখ্যানের সমান । প্রত্যাখ্যাত এবং অমনোযোগে আক্রান্ত সন্তানরা স্বাভাবিক বেড়ে ওঠে না। ছোটবেলায় যা কান্নার প্রতিবাদে সোচ্চার হয় কৈশোর কালে তাই অসহায়তার পীড়নে, অরক্ষিতবোধের তাড়নায়, পর্যুদস্ত মানসিকতায় অগ্নিগর্ভ হয়ে বেড়ে ওঠে। বিধ্বংসী হয়। ণত্ব-ষত্ব হীন বিপথ চলনের শুরু এখানেই। হুঁশিয়ার হবার কেন্দ্রটিও তাই এখানে। বিদ্রোহ, অপরাধপ্রবণতা, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ধৃষ্টতা, আত্মহনন, ধ্বংসের ঝোঁক, নেতিবাচক মানসিকতার উৎস খুঁজতে হলে তা এখানে, এখানেই।

বিষয়টি অন্য একটা দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানরা তাদের মা-বাবার যে মানসিক ছবি-ধারণা-প্রতিরূপ নিজ নিজ মনের গভীরে সচেতনে-অবচেতনে ধরে রাখে সেই সব ছবি-ধারণা-প্রতিরূপগুলো প্রতিনিয়ত তাদের জীবন-দর্শন বা দৈনন্দিন প্রত্যক্ষকে প্রভাবিত করে থাকে। অন্যান্য পিতৃস্থানীয় মাতৃস্থানীয়াদের, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতিও। এমনটি ঘটে একটি চলমান প্রতিনিয়তের পারস্পরিক মূল্যায়ন-অবমূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় । একথাটা আমরা আমাদের ‘শিশুর মন ও শিক্ষা’ গ্রন্থে বলেছি : শিশু হইতে সাবধান; সচেতন পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া এই সাৱধানতা সম্ভব নয়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের বেলায়।

কিশোর-কিশোরীরা যা জানে বলে আমরা, অভিভাবকরা, জানি বা মনে করি তার চাইতে ওরা অনেক বেশি জানে, অনেক বেশি বোঝে, ওদের মানসিক-শারীরিক-সামাজিক মনোভাবে-দৃষ্টিভঙ্গিতে ওরা সেই বড়দের বড়ত্ব বা ছোটত্বের ছবি আঁকে, ধরে রাখে। প্রতিবাদ ‘এ্যানটিনা’ অনেক বেশি সংবেদনশীল, সেনসিটিভ। বড়দের কথাবার্তায়, বিচারবিশ্লেষণে, করলে অথবা না করলেও। মা-বাবার পারস্পরিক ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে, আত্মীয়স্বজনদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে, প্রতিবেশী অতিথিদের প্রতি আচরণে। রাজনীতি- সমাজনীতি-অর্থনীতির বিচার বিশ্লেষণে।

প্রত্যাখ্যানী, কঠিন-কঠোর, রিজেক্টিং পেরেন্টস | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

সন্তানদের শিক্ষা দীক্ষা বিষয়ে, পুত্র ও কন্যাদের স্বাধিকার-স্বাধীনতা বিষয়ে, এবং এরকম প্রতিনিয়তর শত সহস্র বিষয় ব্যাপারকে কেন্দ্র করে বড়দের ধ্যান ধারণা ওদের প্রভাবিত করে। এর ফলে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বাধকতা বা প্রতিরোধ প্রবণতা (রেসিস্টেন্স) গড়ে উঠতে পারে। একটি নেতিবাচক মানসিকতার প্রভাব অকারণেই অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

কারণ হিসেবে, অভিভাবকদের পক্ষথেকে, (১) অনাকাক্ষিত এবং অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ (সন্তানদের মনে হলেই হলো; ) (২) এখন-এক-রকম তখন-অন্য-রকম নির্দেশ, দান। অর্থাৎ স্ববিরোধী বা বিপরীত নির্দেশ-উপদেশদান, (৩) সন্তানদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের কোনো কাজে বাধা করা, (৪) াস্তানদের ক্ষমতা-যোগ্যতা ইত্যাদি স্বপ্রকৃতির বিবেচনা না করেই তাদের কাছে ‘আরও ভাল’-র আশা করা বা তেমন করতে বাধ্য করা, (৫) শত শত না-না আর ক’রো না ক’রো না-র দড়িদড়া চাবুক-নির্দেশ ব্যবহার করা।

কৈশোর কালের ব্যবহারে যদি বিরুদ্ধতা বা বিদ্রোহ কম প্রকট হয় তা হলেও মা- বাবাদের নিশ্চিত চিত্তাহীন হবার কারণ নেই; এমন হতে পারে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াগুলি তখন ফল্গু প্রবহমান মাত্র, পরিদৃশ্যমান হয়ে প্রকট নয়। সন্তানরা অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ‘লাইন অব লিস্ট রেসিটেন্স’ খুঁজে নিয়েছে, এড়িয়ে যাবার, ধোঁকা দেবার পথপ্রকরণ আবিষ্কার করে ফেলেছে। সোজাসুজি বিদ্রোহ করলে মা-বাবা অবিলম্বেই তা টের পেয়ে যাবেন এবং তার জন্যে যথাকর্তব্য নির্ধারণে মন দিতে পারবেন যদি তাঁরা তা চান, তাই ফল্গু প্রবাহ অজান্তে অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে।

‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিয়োর’— ‘যেমনটি হোক’ তেমনটি যদি চান তবে ‘যেমনটি না হোক’ তেমনটির পথ বন্ধ করুন; হয়ে ওঠার পরে আরোপ করা, ‘সিধে করে দেওয়া’-র দরকার কি? গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অ্যাকসেপ্টিং পেরেন্টহুড দিলে ‘ফোঁড়া’ বিষাক্ত হবে না, পরে অপারেশনের দরকার পড়বে না। খোলামেলা মন থাকলে উভয় পক্ষের মনই খুলে মেলে সামনে এসে যাবে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ও উপযোগী সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। নেগোশিয়েটেড সেটলমেন্ট। রণ-নীতি নয় বরণ নীতিই বয়ঃসন্ধির সন্ধিপত্র জানবেন।

Leave a Comment