বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর যৌন বিষয়ে আগ্রহ – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ। বয়ঃসন্ধির শতবিস্ময় পার হয়ে, প্রাথমিক ও আনুষঙ্গিক যৌন অভিব্যক্তির ক্রমপ্রসারের স্তরে স্তরে, নবোদ্ভিন্ন সত্যের তথ্যের আকর্ষণে কৌমার-তারুণ্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। সীমাহীন আগ্রহ, অসীম ঔৎসুক্য। স্বাভাবিক।
বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর যৌন বিষয়ে আগ্রহ | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা
এরা জানে আর জানতে চায়। আরও আরও। নিজেদের বিষয়ে, ভিন্নযোনি বিষয়েও। অতৃপ্ত জ্ঞান নিয়ে ওরা আঁকু পাকু করে, উচাটন বোধে ক্লিষ্ট হয়। ওরা জানে-বোঝে যে মা- বাবার কাছ থেকে ওদের সব জানাগুলো, সকল প্রশ্নগুলো বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই ওরা হাতড়িয়ে মরে – স্বাস্থ্যবই ঘাঁটে, জীবন বিজ্ঞানের পাতা নাড়ে, বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে প্রশ্নউত্তরের ফিসফিসানি বাড়ায়। আর যারা দুঃসাহসী তারা যৌন বইপত্রের সন্ধান করে, আড়াল আবডাল খুঁজে দেখে পড়ে; তারপর? হস্তমৈথুন এবং যৌন মোহনায় অবগাহন পর্যন্ত পৌঁছে যায় ।
কী কী ওরা প্রধানত জানতে চায়? জন্ম-প্রজনন জন্ম-নিরোধ, জন্ম নিরোধ পিল বা বড়ি, গর্ভ-গর্ভসঞ্চার-গর্ভপাত, যৌনযন্ত্র ও তার যান্ত্রিকতা জটিলতা। ছেলেরা প্রধানত জানতে চায় যৌন রোগ, যৌন সুখ, যৌন সঙ্গম, জন্ম নিরোধ, যৌন সঙ্গমের বৈচিত্র্য ও ফলাফল।
বয়ঃসন্ধির সমস্যাটি অন্যান্য সমস্যার মতো নয়; সংস্কার, লজ্জা, এক ধরনের অনিশ্চয় গোপনীয়তা, কিছুটা ভয়, অনেকটা সংশয় এবং একরাশ বিস্ময় এই বয়ঃসন্ধির কাল ও অবস্থানকে ঘিরে শরীর-মনে কুণ্ডলী পাকিয়ে তোলে। কিছুটা তার প্রকাশিত বাস্তব; অনেকটাই তার ফল্গু-প্রবাহের অনুভব-অনুরণনে সত্য। চতুরঙ্গ দেহের আর সাতরঙ্গ মনের সব কিছুর মধ্যে এবং সব কিছুকে ছাড়িয়ে একটা যৌনঝরনার জলতরঙ্গ যেমন অবিরাম সংগীতের মূর্ছনা তোলে তেমনি সে তার তাপে ও চাপে অনেক অনেক সত্য-শিব-সুন্দরকে ওলটপালট করে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়।
মা-বাবা অভিভাবকরা সবই দেখতে পান, টের পান কিন্তু কাছে যেতে পারেন না; প্রবাহে ভাসমান মন এবং উদ্বর্তিত ভঙ্গিল দেহ নিয়ে সন্তানরা বড়দের থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে চায়; বন্ধুবান্ধবীরা ‘অন্ধের হস্তীদর্শনের’ ‘প্রজ্ঞায়’ জ্ঞানান্ধকারকে বাড়িয়ে তোলে; জীবন বিজ্ঞানের পাঠ্যবইতে যে খাদ্য পরিবেশিত তাতে মন ভরে না, প্রাণ আকুলিবিকুলি করে। যা ওরা চায় কোথা পাবে তারে ? বিপদ চলন আর বিপথ গমন থেকে বাঁচার পথ একটা তো চাই— দুপক্ষের জন্যেই চাই। মা-বাবাদের জন্যে সত্য ও তথ্য, সন্তানদের জন্যে ভবিষ্যতের জন্যে প্রস্তুত থাকার পথ, প্রকরণ ও নির্দেশ।
ব্যক্তি উৎসে সবটা সম্ভব নয়, কারণ তখনই সংস্কার-লজ্জাদি আবেগীয় উথালপাথাল কণ্ঠকে রুদ্ধ করে দিতে পারে, শব্দ-বাক্য-ধারণা-স্বচ্ছতাকে পথভ্রষ্ট করে দিতে পারে। “ সম্ভবপরের জন্যে সব সময়েই প্রস্তুত থাকাই সভ্যতা; বর্বরতা পৃথিবীতে সকল বিষয়েই অপ্রস্তুত”— রবীন্দ্রনাথের এই কথাটা দিশরী। দুপক্ষই বয়ঃসন্ধির বিপ্লবের সামনে- মধ্যে পড়ে অপ্রস্তুত না হয়ে যথাসম্ভব প্রস্তুত থাকুক এটাই এই গ্রন্থের লক্ষ্য। ‘শিশুর তত্ত্বাবধান’ অথবা ‘শিশুর মন ও শিক্ষা’ বইটি যাঁরা নিয়েছেন তাঁরা এমন আরও বই লিখতে আমাকে প্রণোদিত করেছেন। তাঁদের আশা পূরণ হলে নিজেকে সার্থক মনে করবো। সন্তানের I.Q., বা বুদ্ধাংক মাপার জন্যে “বুদ্ধাংক পরিমাপ” বইটিও এই সঙ্গে প্রকাশ করা হলো।
“ছোটদের বড় দোষ— বড়দের কথা শোনে না যে! বড়দের বড় দোষ— ছোটদের কথা শোনে না সে! ছোটবড়র এই দ্বন্দ্ব চলছে চিরদিন, রাগে গরগর কথা, ফরফর রাতদিন।” — দোষের খতিয়ান। ‘একের মধ্যে তিন’। (১ম খণ্ড), ‘অর্ধেন্দুশেখর ভট্টাচার্য। ছেলে মেয়েদের ‘মানুষ’ করে তুলতে মা-বাবাদের ভাবনার শেষ নেই, চিন্তার অবধি নেই, দুশ্চিন্তার লেখাজোখা নেই। এঁরা জানেন বোঝেন অনেক, নির্দেশ উপদেশ তথ্য সত্যাদি সংগ্রহ করেন প্রভূত। সন্তানের ভাল কে না চান? এই ভাল চাইতে, সন্তানের ভাল করতে এঁরা উর মাটি চুর করতেও পিছপা হন না।
কষ্ট স্বীকার? ত্যাগ?— যা বলবেন তাই এঁরা করতে উন্মুখ। কিন্তু সব নদীর গতি যেমন সমুদ্রে বা হ্রদে তেমনি সকল মা-বাবার সব অভিযোগ-অনুযোগ- ফরিয়াদ গিয়ে ঠেকে সেই— ‘কথা শোনে না’-তে ! আবার শিশু-কিশোর-তরুণদের বলতে দিন দেখবেন ওদেরও সব কথার শেষ কথা সেই— বড়োরা ছোটদের কথা শোনেনা যে! মুশকিল এই যে ওদের আমরা বলতে দিই না, ওদের না-বলা কথায় কানও দিই না, ওদের অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুচ্চার অভিমানে আমরা মনও দিই না। সময় নেই বলেই নয়; মনটিই আসলে নেই বলে। বড়োর চশমাখানা আমরা এমন শক্তপোক্ত করে নাকে লাগিয়ে রাখি, প্রায় সর্বক্ষণই, যে ওদের চশমায় ওদের মন মানসিকতাকে দেখার দৃষ্টিটাই আর খুঁজে পাই না।
