শিশুর প্রেম ভালবাসার বিষয় ( বিশেষকরে বয়ঃসন্ধির সময় )

শিশুর প্রেম ভালবাসা বয়ঃসন্ধির সময়ের একটা বড় ইস্যু। আজ এ নিয়েই আলোচনা হবে।  প্রেম ভালবাসা , এপর্যন্ত আলোচনায় আমরা শরীরের লাটাই আর মনের সুতো নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। খুব জোর লাটাইয়ের সৌন্দর্যে আর সুতোর মাঞ্জায় নড়াচড়া করেছি। এবারে ঘুড়িতে উড়িতে চাই। ওড়া-উড়ি ব্যাপারটা লাটাই-সুতোয় জড়িয়ে-ছড়িয়ে থাকে বটে কিন্তু তাকে ছাড়িয়ে যায়; মুক্ত-স্বাধীন একটা আকাশ, চকিত চপল বাতাস আর আলোঝলমল দিগন্তের ডাকটা এসে পড়ে। বিজ্ঞানের এলাকার ঊর্ধ্বে, বাস্তবতা-অবাস্তবতার সীমার বাঁধন নস্যাৎ করে দিয়ে মন উড়ে যায়, প্রাণ ধেয়ে যায় অনির্দেশ্য কোনো অনিশ্চয়ের টানে। এটা তাই অনুভবের এলাকা, অন্তরের আপন অঞ্চলের রামধনু রঙে আঁকা হৃদয়মহল। কাব্যের ভাষা, সুন্দরের আশা, প্রেম- ভালবাসা।

প্রেম ভালবাসা

আমাদের বক্ষ্যমাণ বিষয় বালক-বালিকার কৈশোর-প্রেমের তরুণ-ভালবাসার হাল হকিকৎ জরিপ করা। বলা যায় মশগুল থাকা। প্রথম কদম ফুল; প্রথম প্রেমের ঝলকানি লাগা রডোড্রেনডন মন। লজ্জানত আঁখি, বৈদ্যুতিক নৈকট্যের তরঙ্গভঙ্গ অনুভব, দুরুদুরু বক্ষ, লক্ষ লক্ষ জোনাকিরা দেয় আলো— মনে হয় সব ভালো, সব ভালো! এখন প্রায়ই হিন্দিতে শোনা যায় ‘কুছ-কুছ-হোগিয়া’! ইশক্। ভালবাসা। পূর্বরাগ-অনুরাগ-প্রেমাচন।

কিন্তু এতো যে চারদিকে শুনি দিবসরজনী ভালবাসা ভালবাসা, তা সব দেখে শুনে কবির মতোই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় : ভালবাসা কারে কয়? ভালবাসার মধ্যে শরীর আছে— আমরা দেখেছি। ভালবাসার মধ্যে মনের ব্যাপার আছে— আমরা জেনেছি। ভালবাসার মধ্যে একটা আকাশ-বাতাস-আলোর ব্যাপার আছে— আমরা দেখিনি এখনো, এখন দেখতে চাই।

 

প্রেম ভালবাসার আর একটা দিকও আছে— সময় ও স্তরের দিক। ভালবাসা আসে জীবনে তিনবার। ‘আসে’ না বলে বলা উচিত আসে, যায় এবং আসে যায়-না অবস্থান্তর। প্রথমবার আসে ভাললাগার ছদ্মবেশে, কদমফুলের ক্ষণস্থায়ী শোভার অকারণ পুলকে, দ্যুলোকে ভূলোকে কোনো কাজে না লাগার তকমা এঁটে। অথবা বলা যায় বালক কালের অনভিজ্ঞ বয়ঃসন্ধির সমস্যা

দোদুল্যমান জীবনের নৌকোখানাকে অরক্ষিত-ডুবন্ত করে দিতে। বাল্য-প্রেম তাই ভবিষ্যতে কবিতা লেখার জন্যে মনোমুগ্ধকর, স্মৃতিচারণের সাহিত্যিক প্রয়োজনে আকর্ষণীয়, নাতি- নাতনীদের কাছে মজা করে গল্প করার বিষয়। বাল্যপ্রেম প্রেম নয়, প্রেম-প্রেম অনুভবের উষ্ণ প্রত্যয় আনে মাত্র। জীবন কঠিন অতি; ভাললাগা বয়ে আনে নষ্ট এক গতি। প্রেম ভাতে পদ্মপত্রে নীর। টলমান, চঞ্চল, অস্থির। জীবন এক পরিবর্তনের নাম। এই প্রেম, ক্ষণস্থায়িত্বের নিরিখে এবং শরীরজ-মানসিক অবস্থানজনিত কারণে, জান্তব (অ্যানিম্যাল)। ইনফ্যাচুয়েশন ।

দ্বিতীয়বার প্রেম আসে এবং যায়। অথবা হয়। এই মনে আসে, ঐ মনে আসে; এই মন থেকে ঐ মনে যায়, ঐ মন থেকে এই মনে আসে। এটা ঘটে যৌবনে। তারুণ্যের প্রস্তুতিপর্বের শেষে যখন জান্তব শরীরের টানে বা ঠেলায় নয়, মননশীল মনের অনুভবে-বিচারে আকাশ কথা বলে, বাতাস চঞ্চল করে আর সমাজের আলো কাছে ডাকে তখন মনে মনে প্রেম হয় । সেই প্রেম ভালবাসার ভাষা পেয়ে আকাশের নীল খুঁজে নেয়, বাতাসের শীতলতার সন্ধান করে আর ঘর বাঁধার আলোর হদিস পেতে অপেক্ষা করে। অপেক্ষা আর অভিজ্ঞতা, প্রস্তুতি আর অভীপ্সা। জৈব জান্তব কে ছাড়িয়ে সামাজিক-মানসিক বাতাবরণ প্রেম ভালবাসাকে সুস্থিতি দেয়।

 

‘আসে-যায়-না কোনো’-র পর্যায় ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয় কারণ কয়জনে নিত্যনূতন করে নিজেদের সৃষ্টিকরে নিতে পারে? তা সেই প্রৌঢ়-বয়স্কদের কথায় আমাদের কাজ নেই । দীর্ঘদিন কাছে কাছে থাকতে থাকতে ওরা কখন এক সময় সাথে সাথে থাকে মাত্র ! স্তরের কথা বলা গেল। এবারে কৈশোর প্রেমের তরুণ ভালবাসার আকাশ-বাতাস-
আলোর কথাগুলো বলা যাক্।

১. শরীর তৈরি নয়, মন প্রস্তুত নয় তাই যেটা মনে হচ্ছে ভালবাসা তা আসলে ভাল লাগা, ইনফ্যাচুয়েশন। প্রাণী জগতে খেলা-খেলা বা কাল্পনিক যৌন ক্রিয়ার রকম সকম দেখা যায় ওদের ছোটদের মধ্যে। আসলে ওটা জৈব প্রবৃত্তির অ-সময়ের অ-যোগ্য প্রকাশ ইংরেজিতে বললে— মিয়ার মোশনস্!

২. প্রেম করাটা জীবনের লক্ষ্য বা আদর্শ নয়। পাথেয়। সামাজিক মানসিক ও দৈহিক প্রয়োজন। জীবন অনেক বড়, অনেক ব্যাপক। প্রস্তুতির পর্বে মনের বিক্ষেপ ক্ষতিকর। জমি চাষ করার কালে কেউ ফসল তুলতে পারে? ভবিষ্যতের জন্যে প্রস্তুত থাকাটাই সভ্যতা, বর্বরতা প্রতি পদক্ষেপেই অপ্রস্তুত।

 

৩. পথটা— প্রেমের পথটা, পিছল। আগেই বলেছি। বিশেষ করে কৈশোর তারুণ্যে।

৪ . বৃত্ত-কুঁড়ি-পাপড়িমেলা- প্রস্ফুটন এবং ফলপ্রসূ হওয়াটা একটা সময়ের পরিসরে বাস্তব। সময়ের আগে সময়কে টানা হেঁচড়া করলে সময় দুঃসময়ে পরিণত হতে পারে। ৫. নারীরা দুর্বল পক্ষ— জৈব সমাজিক প্রেক্ষিতে। পালানোর পথ নাই ‘যম’ আছে পিছে। পুরুষের শতপথ খোলা আছে। পলায়নের। নারী স্বভাবত মনোগেমাস, পুরুষ স্বভাবে এবং প্রকৃতির বদান্যে বহুগামী। মনে রাখা ভালো।

Leave a Comment