উৎকণ্ঠা বিষয়ে ব্যবস্থা, প্রতিকার, প্রতিবিধান – নিয়ে আজ আলাপ করবো। প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে অবচেতন জড়িয়ে আছে বলে যথেষ্ট হুঁশিয়ার না হলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে যাঁরা এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা করেন তারাই হিতের ব্যবস্থা করতে পারবেন।
শিশুর উৎকণ্ঠা বিষয়ে ব্যবস্থা, প্রতিকার, প্রতিবিধান
১. ফ্রয়েড ইগো-ডিফেন্স বা মনের নিজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থার কথা বলেছেন। এই পথে, এই ইগো-ডিফেন্স মেকানিজম-এর পথে ব্যক্তি নিজেই তার উৎকণ্ঠাকে কমিয়ে ফেলে, মুছে দেয়, সহনশীল করে নেয়, এড়িয়ে যেতে চায়। এই করতে সে র্যাশনালাইজ করে— যুক্তি-বিচারের জালবুনে বুনে উৎকণ্ঠার ধার কমিয়ে ফেলতে চায়, মানসিক চাপ থেকে মুক্ত হতে চায়। প্রায় কুড়িটি ইগো-ডিফেন্স-মেকানিজম্ আছে। যেমন, প্রোজেকশন বা এক্সটারনালাইজেশন, কমপেনসেশন, সাবলিমেশন-রিডাইরেকশন, ডিনায়াল, ফ্যান্টাসি ইত্যাদি ইত্যাদি। [ আগ্রহী [ পাঠক এই লেখকের ‘দর্শন ধর্ম বিজ্ঞান ও আমরা’ গ্রন্থের মধ্যে বিস্তারিত পাবেন, মনোবিজ্ঞান অধ্যায়ে। অথবা ‘ব্যক্তিক ও পারিবারিক মনোবিদ্যা’ গ্রন্থে। ]
২./
ক) দুর্বল, অবনত, অনুসারী হয়ে বিরোধের এবং সুতরাং উৎকণ্ঠার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা। ব্যক্তিত্ব দৃঢ় হলে এটা সম্ভব হবে না বরং যন্ত্রণা বেড়েই যাবে।
(খ) বিপরীত ক্রমে সে আক্রমণাত্মক, আগ্রাসী শক্তিপ্রকাশক হিসেবে উৎকণ্ঠাবস্থার মোকাবিলা করতে পারে। সংঘাত অনিবার্য হতে পারে, এবং ফলাফলসমূহ যাই হোক না কেন ভবিষ্যতে অনুশোচনার কারণ হতে পারে। অথবা
(গ) পলায়ন বেছ নিতে পারে। এই প্রক্রিয়াগুলো আলোচনায় স্বতন্ত্র বলে দেখানো যায় এবং অনুসরণ যোগ্য বলে বলাও যায়। বাস্তবে প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ নিজ প্রকৃতি ও স্বভাবে অবস্থার মোকাবিলা করে। কিন্তু উৎকণ্ঠার কারণ না জানা পর্যন্ত মুক্তির পথ থাকবে কি?
প্রতিটি উৎকণ্ঠাই সেই সেই ব্যক্তিজীবনের অতীতে-গভীরে উৎসারিত-প্রোথিত। সেই সব উৎকণ্ঠার যতোটুকু জানা যায় তা তাদের প্রলক্ষণ-চিহ্ন-প্রকাশ-উপস্থাপনার মাধ্যমেই জানা যায়। আবেগীয় কেন্দ্রটি বা কেন্দ্রগুলি অনুমানের ব্যাপার, অনুসন্ধানের অপেক্ষা রাখে। কারণ সেগুলি মনের গভীরে অবচেতনে, আবেগের জটজটিলতায় জড়িয়ে থাকে। শারীরিক প্রলক্ষণগুলোই প্রত্যক্ষে ধরা পড়ে।
অনেক পদ্ধতি-প্রকরণ আছে মনোবিজ্ঞানীর ঝুলিতে। প্রয়োজন মনে হলে ওঁদের সাহায্য নেওয়াটা আবশ্যিক। উৎকণ্ঠার স্বরূপ নির্ধারণ ও নিবারণ-নিরাকরণ ওঁদের দ্বারাই সম্ভব। ঝুট-মুট সময় নষ্ট করা কোনো কাজের কথাই নয়। সন্তানের ভবিষ্যৎ বলে কথা। তবে এটা মনে রাখা দরকার যে সন্তানের উৎকণ্ঠার জন্যে ওরাই দায়ী এটা ভাবার কারণ নেই। মনোবিজ্ঞানীর কাছে গেলে আপনাদের যাওয়াটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের জন্মেই শুধু নয়, মনের গঠনে-প্রকাশে-প্রকরণেও আপনারা ঘিরে আছেন, ছেয়ে আছেন, প্রভাবিত করেছেন জানবেন। বিজ্ঞানীদের সেই অংশটা জানা দরকার ।
সবশেষে বলতেই হয় যে ভয় ও উৎকণ্ঠার সবটাই ভয়ের বিষয় নয়। সন্তানদের মনে একটু আধটু ভয় থাকা ভালো— আমরা সকলেই বলি এবং জানি সেই ভালটা কেন। প্রথম, আত্মরক্ষার জন্যে, বিপদ আপদ থেকে বাঁচতে। আসলে ‘ভয়’-টাকে একটা বিপদ-ঘন্টি বলে মনে করা যায়। হুঁশিয়ার করে দেবার যন্ত্র।
হরমোন ক্ষরণের মাধ্যমে শরীর-মনকে আপৎকালীন অবস্থার জানান দেওয়া ও প্রতিক্রিয়ায় প্রস্তুত করা। দ্বিতীয়, ডিফেন্স মেকানিজম বা মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্যে মনের নিজস্ব যত্তর-মন্তর-গুলোকে সজীব ও ক্রিয়াশীল রাখে। ভয়ের উদ্দীপক আছে বলেই ঐ ডিফেন্স মেকানিজম কাজে লেগে পড়ে।
কিন্তু বাদবাকি ভয়ের পরিণামগুলো ভয়ের কারণ হতে পারে। পরীক্ষার ভয়। প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার সময় ভয়ে হাতের তালু ভিজে যায় আর মাথার তালু শুকিয়ে যায়। কারো অংকের ভয়, কারো ইতিহাসের সাল-তারিখ আর নামাবলির ভয়, কারো বই পত্র দেখলে গায়ে জ্বর আসে, মাস্টার দেখলে মুখ শুকিয়ে যায়। অপরিচিত লোকের ভয় থেকে ইন্টারভিউয়ের ভয়, এবং ইত্যাদি।
মা-বাবর ভয়ের কারণ আছে সন্তানদের এই সব ভয় উৎকণ্ঠা নিয়ে। ভয়-উৎকণ্ঠার সঙ্গে ওদের বৌদ্ধিক অর্জনের নেতিবাচক সম্পর্ক আছে যে! শুধু বৌদ্ধিক অর্জনের ক্ষেত্রেই নয় ভয়-উৎকণ্ঠার যে কোনো কাজই অ-কুশল অ-নিপুণ হতে বাধ্য। কারণ ভয়-উৎকণ্ঠার বয়ঃসন্ধির সমস্যা মনোভাব একটা পলায়নী মনোভাব গঠন করে, এড়িয়ে যাবার প্রবণতা তৈরি করে দেয়। তা সে হাতের লেখায় হোক অথবা উচ্চারণে কথা বলায় হোক, সংসারের কাজে অথবা বাইরের কাজে, যৌন প্রতিযোজনে অথবা পরিবার গঠনে; এবং পরে, সন্তান ধারণ অথবা লালনে পালনে। সময় থাকতে থাকতে অনুসন্ধান ও প্রতিবিধানের ব্যবস্থা গ্রহণ অ-সময়ের অনেক ভয়-উৎকণ্ঠা থেকে বাঁচাতে পারে। পরে আরোগ্য সন্ধানের চাইতে তা অনেক অনেক কাঙ্ক্ষিত।
ভয় অপনোদনের কয়েকটি পন্থা :
সন্তানের মনের ভয় তাড়াতে মা-বাবার যা করা উচিত নয় :
১. ভয়কে আমল না দেওয়া, পাত্তা না দেওয়া।
২.ভয় পেয়েছে বলে ব্যঙ্গ করা, হাসির পাত্র করা অথবা শাস্তি দেওয়া।
৩.ভয় ভাঙ্গানোর জন্যে জোর করে সেই ভয়-অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেওয়া ।
8.শুধুমাত্র প্রকাশিত ভয়কে দেখা কিন্তু মনোভাবের প্রতি, কারণের প্রতি অবজ্ঞা করা।
যা করা উচিত :
১. সহানুভূতির সঙ্গে ভয়ের বিষয় নিয়ে এবং মানসিক কারণ নিয়ে সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করা বিচার-বিশ্লেষণ করা, ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেওয়া। এই আলোচনায় কখনই সন্তান ‘বোকার মতো’ কাজ করছে না বলে বরং বলা উচিত ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক কিন্তু অকারণ।
২. প্রাসঙ্গিক উদাহরণ (বাস্তব অথবা কাল্পনিক) উল্লেখ করে আসলে যে ভয়ের কিছু ছিল না তা বুঝিয়ে দেওয়া। অন্য শিশু-কিশোর-তরুণদের অনুরূপ অবস্থায় অনুসন্ধান-প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা-ঘটনা ভীতমনকে অনেক আত্মস্থতা দেবে।
৩. সদর্থক স্বাপেক্ষ প্রতিবর্ত প্রতিক্রিয়া গঠনের মাধ্যমে— প্রতিক্রিয়ার পুনর্গঠনের সাহায্যে ভয়ের উদ্দীপককে বাতিল করা। এই কাজটি একটি নির্ভয় এবং প্রিয় বস্তুকে ভয়ের বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করে করা যায়। মনে করা যাক একজন ব্যক্তি। দেখলেই ভয় বা উৎকণ্ঠা জাগে সন্তানের মনে। তিনি যদি দুচারদিন বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হার্দিক নৈকট্যের বাতাবরণে আসা যাওয়া করেন— সন্তানের প্রত্যক্ষের এলাকায় থেকে— তাহলে বিরূপতা কেটে যাবে।
8. সন্তানের মনে আত্মপ্রত্যয় বাড়িয়ে তুলে বিষয় বা বস্তুকে ক্রমশ ‘ভয়ের উৎস নয়’ নির্ভয় বিষয় বা বস্তু করে তোলা। মনোভাবের পরিবর্তন সাধন করে। শৈশবের অন্ধকার ঘরে ভয় কাটানোর বর্ণনা আছে ‘শিশুর মন ও শিক্ষা’ বইতে। কৈশোর-তারুণ্যের অনেক ভয়ও ঐ একই ভাবে কাটানো যায়— অংকের ভয়, ভূগোলের ভয় ইত্যাদিও।
৫. সঙ্গ দিয়ে, সাহায্য দিয়ে সহজ কে সহজ বলে বুঝিয়ে দিয়ে। ধৈর্য ও লগন চাই। ব্যাস্। ভয় পাওয়ার মধ্যে যে লজ্জার কিছু নেই, ধিক্কারজনক কিছু নেই তা প্রথমেই বুঝিয়ে দেওয়া। তার পরে বাস্তব বা কাল্পনিক ভয়ের অসারতা বুঝে নিতে সন্তানকে সাহায্য করা। নিজের ভয় যেন সে নিজেই নির্মূল করার জোর পায়, অপনোদনে যে তারই অবদান বেশি তা বুঝিয়ে দেওয়া।
৬. ভয়ের বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে যতো বেশি সম্ভব তথ্য ও সত্যের যোগান দেওয়া।
৭. অসাফল্যের ভয়কে মা-বাবা আগে থেকে প্রস্তুতির পথ নিয়ে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর করে দিতে পারেন। অসাফল্যের ভয় আরও বেশি অসাফল্যকে টেনে আনে। সফল কাজের প্রতি প্রশংসা-পারিতোষিক প্রদান কিন্তু অসফলতার প্রতি বাস্তব সম্মত নিরপেক্ষতা দেখালে সাফল্য অর্জনের ঝোঁক বেড়ে যায়। সাফল্যের প্রতি আকর্ষণ থাকবে কিন্তু অসাফল্যের বাস্তব সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা হবে না— এমন হলে সন্তানের মনে ভয়টা দানা বাঁধতে পারবে না ।
