বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর ন্যায় বিধি গঠন

ন্যায় বিধি গঠন – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ। কৈশোরের কিশলয়-নীতিবোধ ক্রমশই তারুণ্যের পর্ণ-নীতিবোধের দিকে উত্তরিত হয়। তখন, সেই দ্বিতীয় তারুণ্যে বোধগুলো বিধি গঠনের দৃঢ়তা পেতে থাকে। তারা ঠিক- বেঠিকের ধারণা, ভালমন্দের বোধ, উচিত-অনুচিতের বিচার করে করে স্ব স্ব আচরণ বিধিগুলি নিশ্চয় করে নিতে থাকে। এই গঠনে মা-বাবার কাছে পাওয়া, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকে অর্জন আর সামাজিক ও ধর্মীয় বিধি-বিধান থেকে সংগৃহিত তথ্য-সত্য-নীতি ও নির্দেশ সামিল করতে থাকে।

 

ন্যায় বিধি গঠন | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

 

বয়ঃসন্ধির সময় শিশুর ন্যায় বিধি গঠন | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

করতে থাকে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি কঠিন ও ক্রমাগত বাধা-বিঘ্নময়। অন্তর্নিহিত অসামঞ্জস্যের কারণে। পরিবারে, সমাজে, স্কুলে এবং ধর্মের ব্যাখ্যানে উচিত-অনুচিতের সর্বত্র সামঞ্জস্য নেই, থাকে না। এইসবই বিধিগঠনের পরিপন্থী, যন্ত্রণার কারণ। সর্বজনগ্রাহ্যতা মার খায়, সামঞ্জস্য হারিয়ে যায়। অচিরেই ওরা দেখতে পায় যে আর্থসামাজিক ভিন্নতার কারণে বিধি বিধান অন্যরকম হচ্ছে। দেখতে পায় যে ধর্মীয় কারণে, জাতিগত গোষ্ঠীগত কারণে উচিত-অনুচিত বোধ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ছে। সমসাময়িকদের নীতিবোধ পুরোনোদের নীতিবোধ থেকে আলাদা, দেখতে পায় যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে রীতি-নীতি নিয়ম-কানুন কেমন আলাদা আলাদা, ছেলেদের এবং মেয়েদের বেলায় কেমন যেন সবকিছুই অন্যরকম হয়ে যায় ।

একটা দ্বিচারী নীতি – একটা ডব্লু স্ট্যাণ্ডার্ড, যেন সর্বত্রই কেমন দৃশ্যমান হয়ে ধরা পড়ে। এমনি করে ওরা দেখতে পায় সত্য বলা সবসময়ে সর্বোত্তম নীতি নয়, অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যাটাই যেন সত্যের চাইতেও সত্যতর হয়ে ওঠে। পরীক্ষায় চুরি করা, চিট্ করা এবং অনেক অসমর্থিত পথপ্রকরণ কেমন যেন বহু যুক্তি-অপযুক্তির বেড়াজালে পরিবেশিত, যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নীতিবোধের চাইতে যেন বাস্তবতা বোধ, ঘরে-বাইরে, বেশি আদর পাচ্ছে। একই কাজ ছেলেদের বেলায় সমর্থিত, মেয়েদের বেলায় ধিক্‌কৃত।

কৌমার-তারুণ্য ক্রমশ এই সব বিপরীতের আঘাতে-প্রত্যক্ষে বিড়ম্বিত হয়ে আর হতে হতেই নিজ নিজ নীতি-বিধি গঠনে এগিয়ে চলে। এই অসামঞ্জস্যের দায় ওদের নয়, দায়িত্বভার থাকছে অন্যত্র। এদের সঙ্গে যোগ হচ্ছে অত্যাধুনিক সমাজনীতি, রাজনীতির ডামাডোল। নীতিবোধ নয় নীতিবধ চলছে চারদিকে। প্রজন্মপরম্পরায় চলছে, চলবে। যাদের দায় তারা চার্বাক দর্শনের ঘৃতং পিবেৎ মন্ত্রে মশগুল। যাদের দায়িত্ব তারা হাজারো স্বার্থসচেতনায় অন্ধ। কৈশোর-কৌমার-তারুণ্য হাবুডুবু খেয়ে যৌবনের তীরে ডুবন্ত নৈতিক তরীর যাত্রী। এরা নিজের ভিতরের জৈবযৌন তাণ্ডবের শিকার এবং শিকারি, আবার বয়ঃসন্ধির সমস্যা বাইরের একই তাণ্ডবের সহজ শিকার। বিপদ তাই ইনটারনাল এবং এক্সটারনাল। সখা হয়ে ওদের হাত ধরে নিয়ে চলুন, এগিয়ে দিন ।

কিশোর অপরাধীদের পর্যবেক্ষণ-অনুসন্ধান করে দেখা গেছে যে –

ক)শাস্তিদানের মাধ্যমে ওদের প্রণোদিত অপরাধ প্রবণতা কমে না,

খ) শাস্তিদান বরং অপরাধ প্রবণতাকে বাড়িয়েই দেয়, আরও জটিল করে তোলে, গ) লজ্জা ঘৃণা ভয় ক্রমশই কমে যায়। দাগি অপরাধী করে তোলে।

ঘ) ধূর্তবুদ্ধির আকর হয়ে ওঠে। অপরের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দেয় ইত্যাদি।

 

এবং প্রস্তাব করা হয়েছে যে—

১. বাইরে থেকে আরোপের বা শাস্তির মাধ্যমে নয়, ভিতর থেকে ওদের বিবেক বুদ্ধি জাগরিত করে তুললে ফল পাওয়া যায়।

২. ওদের ভিতরের শক্তিকে পরিচালনের ক্ষমতায় ক্ষমতাবান করে তোলা,

৩. দলের সঙ্গে আচরণের সংহতি এনে দেওয়া। স্বীকৃতি, মান্যতা ও প্রশংসা পেলে সমঞ্জস কাজ করবে।

৪. বিপথচলনের কারণে ওদের মনের মধ্যেই একটা অন্যায়-অপরাধবোধের জাগরণ ঘটা দরকার— একই দলের, সমশ্রেণীর মূল্যায়নে এটা সম্ভব।

৫. লজ্জা এবং অপরাধবোধ। দুটোই জাগরুক হলে ভাল। তবে ওদের অন্তরে অপরাধ বোধটাই ওদের দ্রুত সুস্থিতিতে টেনে আনতে পারে।

 

মনোবিজ্ঞানীরা তারুণ্যের নৈতিক পরিবর্তন-অবস্থানের কয়েকটি অবস্থার কথা বলেছেন :

১. নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটি বস্তুকেন্দ্রিকতা ছাড়িয়ে ক্রমশই বিমূর্ত নীতি-নিয়মে ঝুঁকে পড়ে।

২. নৈতিক বোধগুলি ক্রমশই বেশি বেশি করে যা উচিত, ঠিক, সমর্থিত, যথার্থ তার দিকে মনোযোগী হয়, আর যা অনুচিত, বেঠিক ইত্যাদি তার দিক থেকে সরে যায়। বলা যায় এই পরিবর্তন নেতিবাচক অবস্থান ছেড়ে ইতিবাচক দিকে মোড় নেয়। বিচার, যাথার্থ্য এবং ঔচিত্যবোধ প্রধান ভূমিকা নেয়।

৩. নৈতিক বিচারে বুদ্ধি-বিচারের প্রাধান্য বেড়ে যায়। সামাজিক ও ব্যক্তিগত আচার আচরণের বৈধতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ে। বিষয় ভিত্তিকতা ছেড়ে সমস্যা কেন্দ্রিক বা ইস্যু-ভিত্তিক হতে থাকে।

৪. নৈতিক বিচারের মান ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিকতা ছাড়িয়ে পরকেন্দ্রিক হয়। ৫. নৈতিক বোধ মানসিক পীড়ার কারণ হয়— ব্যক্তিগত ভাবে। ব্যক্তিগত আবেগ অনুভব ভাললাগা মন্দলাগাগুলো বাতিল হতে থাকে। তাই একটা টেনশন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। কিন্তু নীতি-বিধি-বিচারের পাল্লা ভারি হতেই থাকে।

এই অনুসন্ধান ব্যাখ্যাটি সত্যের বা বাস্তবতার একদিক। অন্যদিকটির কিছুটা আমরা সদ্য সদ্য আলোচনা করেছি— পরিবেশ-পরিস্থিতির অসামঞ্জস্য। দায় দায়িত্বের কথা বলেছি। প্রজন্ম প্রজন্ম অধঃপতনের, অবক্ষয়ের কারণগুলো বলেছি। কৌমার-তারুণ্য এই চলমান যুদ্ধের বাতাবরণে নৈতিক পরিবর্তনের পথে পথিক। যা অ-নিবার্য তা অনিবার্যভাবেই ঘটে চলেছে।

পরিবারে, সমাজে, পরিবেশে, রাজনীতি-রাষ্ট্রনীতি-অর্থনীতিতে। অফিসে আদালতে। সর্বত্র তাই ওদের স্বাভাবিক উত্তরণ-পরিবর্তন সম্ভবত মরূপথে পথহারা গতি পায়! গ্লাসে-ঘটিতে করে যতোই নীতি সেবনের ব্যবস্থা স্কুলে-গৃহে থাকুক না কেন তা সব ব্যর্থ হতে বাধ্য কারণ মানবপ্রকৃতির বর্তমান পঁচনশীল প্রবাহে বাস্তবে পেয়-নীতি-বারির অবসান প্রায় পরিপূর্ণ!

Leave a Comment