১-৫ বছর বয়সে বাবা-মায়ের করণীয় – বিষটি নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পঠটি “শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা” সিরিজের অংশ। এ সময়টা শিশুর স্বাভাবিক ক্রমবিকাশের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান । এ সময় তার নিজস্বতা, তার ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠতে শুরু করে । আদর ভালোবাসার সঠিক অর্থ বুঝতে পারে । সে-ও যে সমাজের কেউ, সংসারে তারও একটা নির্দিষ্ট স্থান আছে— এটা উপলব্ধি করতে শুরু করে ।
১-৫ বছর বয়সে বাবা-মায়ের করণীয় | শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা

শিশুর মনস্তত্ব অত্যন্ত জটিল ব্যাপার । একটা শিশুকে বুঝতে হবে, তাকে জানতে হবে । ছোটো হলেও সে মানুষ । “আমার সন্তানকে মানুষের মতো মানুষরূপে গড়ে তুলব বলেই পাড়ার কারো সাথে মিশতে দিই না । সারাক্ষণ সে থাকে কড়া ধমক আর নিয়মকানুনের মাঝে । এটা ধরিস না, ওটা করিস না, এটা ভুল— এমনিভাবেই শিক্ষা দিই, যেন সে এখন থেকেই বুঝতে পারে, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ। আর তাছাড়া আজকালকার ছেলেমেয়ে”… এটা ভুল ।
শিশু দুষ্টুমি করবেই। এটা তার স্বাভাবিক ধর্ম বরং দুষ্টুমি না-করাটাই অস্বাভাবিক । আর সারাক্ষণ কড়া শাসনে রাখলে শিশুর কোমল মনে একটা অপরাধবোধ জেগে উঠবে । শিশুকে তার নিজস্বতা, তার স্বকীয়তা নিয়ে বড়ো হতে দিতে হবে। একবার আদর, একবার সোহাগ, প্রয়োজনে ধমক বা তিরস্কার— এমনি করে তাকে বড়ো করে তুলতে হবে । এ পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন । এতে পাস করতে অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন ।
মনে রাখতে হবে, বেশি আদর শিশুর জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর । তাতে সবকিছু পাওয়ার একটা গোপন বাসনা তার মনে দেখা দেয় । আর তাকে কার্যকর করতে ধীরে ধীরে সে অন্যায় করতেও পিছপা হয় না । বাবার পকেট বা মায়ের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে না বলে টাকা নেওয়া তার জন্য নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। পথে বেরোলেই এটা-ওটার বায়না ধরা তার জন্য স্বাভাবিক এবং তা কিনে না দেওয়া পর্যন্ত মা-বাবাকে কিল, চড়, লাথি মারতেও সে দ্বিধাবোধ করে না ।
এটা নিশ্চয় ভালো নয় । তাই শিশুকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে । তবে বড়ো করলেই চলবে না, আদর আর অনুশাসনের মাধ্যমে তাকে মানুষরূপে গড়ে উঠবার পথ তৈরি করে দিতে হবে । আর এর ওপরই সন্তানকে মানুষ করার মা-বাবার সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে ।
সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশু মানেই চঞ্চল শিশু । বাবা-মায়ের কর্তব্য হবে তার এই চঞ্চলতায় উৎসাহ দেওয়া, তাকে শক্তি ও সাহস জোগানো । এমনি ধরনের খেলনা দিতে হবে, যেটা ঐ শিশুকেই মানায়, সে তার খেলনার উপর বসবে, ছুড়ে মারবে, টানবে, খেলনার সাথে সাথে সামনে-পিছনে চলবে । খেলনার জন্য একবার উঠবে, একবার বসবে- এমনি করে যেন সে চলতেই থাকে । দূর থেকে সুন্দর, লোভনীয় খেলনা দেখিয়ে আদর করে কাছে ডাকতে হবে যেন সে হাঁটতে পারে, দৌড়াতে পারে । হাঁটতে বা দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গিয়ে ব্যথা না পায়, তার ভিতর অহেতুক ভীতি জেগে না ওঠে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে ।
বাইরে গেলে, পার্কে বা এমনি ধরনের জায়গায় শিশুর একহাতে খেলনা, বালতি, ঝুড়ি ইত্যাদি দেওয়া যায় এবং অন্যহাত বাবা-মা ধরে থাকবেন । বল দিয়ে লাথি মারা, ছুড়ে মারা ইত্যাদি শিশুকে শেখানো উচিত । গাড়িজাতীয় জিনিস দিয়ে তা টানতে শেখাতে হবে । হাতে পেনসিল-কাগজ দিয়ে ঠিকভাবে ধরা, আঁকা শেখানো উচিত ।
শিশুর কচি মনে সারাক্ষণই জমা হতে থাকে হাজারো প্রশ্ন । তার জবাব দিয়ে তাকে উৎসাহী করে তুলতে হবে। কারণ নিজেকে, অপরকে এবং পরিবেশকে চিনবার এবং জানবার জন্যই তার এ প্রশ্নের ডালি । ধমক দিয়ে শাস্তির মাধ্যমে শিশুর প্রশ্নের জবাব দেওয়া যাবে না। সে মাঝে মাঝে অসংলগ্ন প্রশ্ন করবেই । সুকৌশলে তার জবাব দিতে হবে । কিন্তু কেন এ প্রশ্ন করল, তাই তাকে শাস্তি পেতে হবে— এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ।
শিশুকে নিয়ে প্রতিদিন বিকেলে কিছুক্ষণের জন্য বেড়াতে বের হলে ভালো হয় । এতে তার বুদ্ধির বিকাশলাভ ঘটে । রাস্তার কোথায় কী ঘটছে, কী চলছে, এটা কী, ওটা কোথায় যাচ্ছে— এমনিভাবে তার সাথে সারাক্ষণ কথা বলা উচিত ।

চার-পাঁচ বছরের শিশুকে ছোটো ছোটো, কিন্তু সোজা ছড়া শেখানো উচিত । বই না দেখিয়ে ক খ বা ABCD না শিখিয়ে, প্রথমত তাকে ছড়া বা কবিতা শেখাবার পরামর্শ এজন্য দেওয়া হচ্ছে যে, এতে তার স্মৃতিশক্তি বাড়বে । ছড়া শিখিয়ে তার কাছ থেকে আবার তা ঠিকমতো আদায় করে নেওয়া বাবা-মায়ের কর্তব্য । শিশুকে বইয়ের বিভিন্ন ছবি দেখিয়ে গল্প বলতে হবে । তাকে ছবি চেনা শেখাতে হবে । বইয়ের গল্প বা অন্য কোনো গল্প বলতে সাহায্য করতে হবে ।
তার সাথে সারাক্ষণ আদুরে ভাষায় কথা বলা ঠিক নয়। কারণ, এতে সে ঐ ভুল আদুরে শব্দটা শিখে ফেলতে পারে। তাই মাঝে মাঝে আদুরে শব্দ ব্যবহার করলেও অধিকাংশ সময়ই শুদ্ধভাবে কথা বলতে হবে। কারণ, এ সময় শিশু থাকে অত্যন্ত অনুকরণপ্রিয় । তার চারধারে যা ঘটছে এবং তাকে যা শেখানো হচ্ছে, তাই সে শিখে যায় । শিশুকে জামাকাপড় পরা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, খেলনা গুছানো, জুতার ফিতা বাঁধা, বইয়ের টেবিল গুছিয়ে রাখা, দাঁত মাজা এবং প্রয়োজনে ছোটো ছোটো কাপড় ধোয়ার মতো কাজ শেখানো উচিত ।
