১১ বছর বয়সে শিশুর বুদ্ধির পরিমাপ । আলফ্রেড বিনের টেস্ট প্রশ্ন | শিশুর মন ও শিক্ষা

শিশুর মানসিক বিকাশ ও বুদ্ধিমত্তা নির্ধারণে মনোবিজ্ঞানে একাধিক পরীক্ষা প্রচলিত রয়েছে। বিখ্যাত ফরাসি মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড বিনে (Alfred Binet) ২০ শতকের গোড়ার দিকে প্রথম আধুনিক বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষার প্রচলন করেন। তার তৈরি টেস্টগুলোর মাধ্যমে শিশুর চিন্তন, বিশ্লেষণ, উপলব্ধি, এবং সিদ্ধান্ত নেবার দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। নিচে ১১ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রযোজ্য এমন কিছু পরীক্ষার প্রশ্ন ও মূল্যায়নের পদ্ধতি উপস্থাপন করা হলো।

 

পরীক্ষা : অসংগতির বিশ্লেষণযুক্তি বিশ্লেষণ ক্ষমতা যাচাই

নির্দেশনা:
শিশুকে বলা হবে—

“আমি কিছু ঘটনা বলছি। মন দিয়ে শুনো। এর মধ্যে কিছু অসংগত বা অযৌক্তিক দিক আছে। সেগুলো চিহ্নিত করে বলো।”

প্রশ্নসমূহ:

. “একদিন একটি লোক সাইকেল চালাতে চালাতে পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। সকলে মিলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা বললেন— ‘এই ব্যক্তির স্বাভাবিক হওয়া আর হবে না।’”
→ এখানে কী অসংগতি আছে?

. “একদিন একটি দরিদ্র নারীর দেহ জঙ্গলের মধ্যে পাওয়া গেল। দেহটি ১৮টি টুকরোয় কাটা। সকলে বলাবলি করলো— ‘মেয়েটি নিশ্চয়ই আত্মঘাতী হয়েছে।’”
→ অসংগতি কোথায়?

. “গতকাল একটি রেলদুর্ঘটনা ঘটে। আজকের কাগজে লেখা হয়েছে, ‘দুর্ঘটনাটি মারাত্মক হয়নি। মাত্র ৪৮ জন লোক মারা গেছে।’”
→ কী অমিল আছে এতে?

. “একটি ছেলে আমাকে বললো— ‘আমার তিনটি ভাই: অরুণ, তপন আর আমি।’”
→ এখানে সমস্যা কোথায়?

. “একদিন এক ব্যক্তি বিরক্ত হয়ে বললো— ‘যদি আমাকে আত্মহত্যা করতেই হয়, তাহলে আমি শনিবার করবো না, কারণ শনিবারটা খুবই দুর্ভাগ্যের দিন।’”
→ এখানে যুক্তিহীনতা কোথায়?

মূল্যায়ন নির্দেশিকা:
মৌখিকভাবে প্রশ্ন করা হবে। অন্তত ৫টির মধ্যে ৩টি প্রশ্নের যুক্তিসম্মত ও যথাযথ উত্তর দিতে পারলেই উত্তীর্ণ ধরা হবে।
কোনো সাহায্য করা যাবে না। শুধু যদি উত্তর অস্পষ্ট হয়, তবে বলা যাবে:
আর একটু বুঝিয়ে বলো।

উদাহরণস্বরূপ সঠিক উত্তর:

১. মারা গেলে আর ‘স্বাভাবিক’ হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
২. নিজে নিজেকে ১৮ টুকরো করে আত্মহত্যা করা অসম্ভব।
৩. ৪৮ জন মারা গেছে, এটি অবশ্যই মারাত্মক দুর্ঘটনা।
৪. নিজেকে ‘ভাই’ বলা অসংগত, কারণ আপনি নিজের ভাই নন।
৫. আত্মহত্যা করলে ‘শনিবার ভালো না খারাপ’ সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়— মৃত্যুর পর দুর্ভাগ্য বলে কিছু থাকে না।

 

পরীক্ষা : যৌক্তিক বিশ্লেষণ নৈতিক উপলব্ধি যাচাই

নির্দেশনা:
“ঠিক ঠিক উত্তর দাও।”

. বিদ্যালয়ে যাবার পথে তুমি বুঝলে যে তোমার দেরি হয়ে গেছে। তুমি কী করবে?

. যদি কেউ তোমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, আর তুমি জানো সে খুব রেগে ছিল— তাহলে তুমি তাকে ক্ষমা করতে পারো। কিন্তু সে যদি স্বাভাবিক অবস্থায় থেকে দুর্ব্যবহার করে, তাহলে কেন ক্ষমা করতে পারো না?

. কেউ তোমার কাছে একটি ছেলে/মেয়ের সম্পর্কে মতামত জানতে চাইল। অথচ তুমি তাকে ভালোভাবে চেনো না। তুমি কী বলবে?

. আমরা কারো কথা নয়, তার কাজ দেখে বিচার করি কেন?

. তুমি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করতে যাচ্ছো— প্রথমেই কী করবে?

মূল্যায়ন নির্দেশিকা:
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ভাবার জন্য ২০ সেকেন্ড সময় দিন। অন্তত তিনটি প্রশ্নের যুক্তিযুক্ত উত্তর দিতে পারলে উত্তীর্ণ ধরা যাবে।

সঠিক উত্তরের উদাহরণ:

১. “দ্রুত চলবো” / “শিক্ষককে জানাবো” / “কাজটা শেষ করবো।”
২. “রেগে গেলে অনেকেই ভুল করে— তাই ক্ষমা করি।” / “রাগে মানুষ অমানুষ হয়।”
৩. “ভালো করে না জেনে কিছু বলবো না।” / “জিজ্ঞাসা করতে হবে।”
৪. “কারণ অনেকে যা বলে, তা করে না।” / “কাজই মানুষকে চেনায়।”
৫. “কাজটি বুঝে পরিকল্পনা করবো।” / “প্রস্তুতি নেবো।”

 

পরীক্ষা : শব্দভাণ্ডার ধারাবাহিক চিন্তার পরিমাপ

শিরোনাম: তিন মিনিটে ৬০টি ভিন্ন শব্দ বলা

নির্দেশনা:
“তোমার মনে যা আসে, সেই শব্দগুলো একে একে বলো— যেমন: বিদ্যালয়, বই, শিক্ষক, বন্ধু… ইত্যাদি। কিন্তু বাক্য নয়, শুধু একেকটি শব্দ। তিন মিনিট সময় থাকবে।”

মূল্যায়ন:
একটি কাগজে দাগ কেটে শব্দ গুনে রাখুন। পুনরুক্তি বাদে কমপক্ষে ৬০টি ভিন্ন শব্দ হলে উত্তীর্ণ ধরা হবে। যদি থেমে যায়, শুধু বলবেন:

ঠিক আছে, বলো বলো।

(একই বিষয়ের একাধিক শব্দ থাকলে সেটি আলাদাভাবে নোট করা যেতে পারে, তবে মূল মূল্যায়নে ধরা হবে না।)

 

পরীক্ষা : তিনটি শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন করার দক্ষতা

নির্দেশনা:
শিশুকে তিনটি আলাদা শব্দ দেওয়া হবে। যেমন—

  • মার খাবো
  • বাড়ি থেকে বেরোবো
  • ক্ষমা চেয়ে নেবো

এই শব্দগুলোর ভিত্তিতে সে যেন একটি অর্থপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক বাক্য তৈরি করতে পারে।

মূল্যায়ন:
শিশু যদি বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত ও ভাবগম্ভীর বাক্য রচনা করে— যেখানে পরিস্থিতি, নৈতিকতা বা যুক্তির প্রকাশ ঘটে— তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে।

 

আলফ্রেড বিনের এই বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষাগুলো শিশুদের যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, চিন্তা প্রবাহ, নৈতিক উপলব্ধি এবং মৌলিক কগনিটিভ দক্ষতা পরিমাপের জন্য উপযোগী। এগুলো শিক্ষকের হাতে একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে, যার মাধ্যমে শিশুর মানসিক বিকাশের স্তর বোঝা যায় এবং সে অনুযায়ী উপযুক্ত শিক্ষাদান পরিকল্পনা করা সম্ভব।

Leave a Comment