শিশুর স্মরণের চর্চা ও উন্নতি

স্মরণের চর্চা ও উন্নতি – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের অংশ। আপনার শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ জোরদার করতে কী করবেন সে বিষয়ক পরামর্শ।

স্মরণের চর্চা ও উন্নতি

শিশুর স্মরণের চর্চা ও উন্নতি | শিশুর মন ও শিক্ষা

 

স্মৃতি :

শৈশব থেকেই আমরা ‘দেখছি’, প্রত্যক্ষ করছি। অভিজ্ঞতা। পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়ে এবং মন দিয়ে দেখছি। বস্তু বিষয় লোকজন পরিবেশ। এককভাবে দেখছি,  চিরা, চির-বেগা, চির-চিরা। বেগ মানে গতিবেগ তাড়াতাড়ি। চির-চিরদিন-দীর্ঘস্থায়ী, অনেকসময় ধরে। এবারে বোঝা যাবে। তাড়াতাড়ি শেখে তাড়াতাড়িই ভুলে যায়-বেগ বেগা। তাড়াতাড়ি শেখে, দীর্ঘদিন বা চিরদিন মনে রাখে-বেগ-চিরা। চির-বেগা-অনেকদিন ধরে শেখে, তাড়াতাড়ি ভুলে যায়। চির-চিরা=অনেক চেষ্টা করে শেখে, এবং অনেকদিনই মনে রাখে] যেমন গাড়ির নাম্বার বা টেলিফোন নাম্বারের উদাহরণ।

দ্বিতীয় কক্ষ থেকে কর্ষণ প্রক্রিয়ার শেষে প্রতিক্রিয়া ঘটলে বেগ-চিরা। তৃতীয় কক্ষ থেকে দু’রকমের স্মরণ উদ্ধার ঘটবে ঃ এক চির-বেগা—যখন কর্ষণসেচন দীর্ঘসময় ধরে হবে এবং দ্রুত মানসিক যোগাযোগ ঘটে উত্তর-প্রতিক্রিয়াও দ্রুত ঘটবে। দুই, প্রথম প্রক্রিয়া সময় নেবে কিন্তু দ্বিতীয় প্রক্রিয়া—যোগাযোগ, connection দেরিতে ঘটবে। প্রথম প্রকারের প্রতিক্রিয়া চির-বেগা, দ্বিতীয়কে বলা হবে চির-চিরা। স্বাভাবিক কারণেই বেগ-চিরা স্মরণ প্রক্রিয়াকেই শ্রেষ্ঠ বলা যায়। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাই। শিখবে তাড়াতাড়ি, বেগে আহরণ করবে এবং দীর্ঘদিন মনে থাকবে।

স্মরণ চর্চা করে বাড়ানো :

তাহলে দেখা যাচ্ছে স্মরণ এবং শিক্ষাকে কার্যকর এবং উন্নতর করতে হলে স্মৃতি সহায়ক প্রক্রিয়া-পদ্ধতির কর্ষণ-চর্চা দরকার। স্বল্পস্থায়ী ভাণ্ডার থেকে Rehearsal, Over learning এর মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণ কেন্দ্রে জমা করে দিতে হয়। এবং তথ্য ইত্যাদিকে, সংস্থিত-সুস্থিত-বিন্যস্ত রাখতে হয় যাতে প্রশ্নের উদ্দীপক খোঁচা মারলেই যথাযথ প্রতিক্রিয়া সহজ হয়। ২ নং কক্ষ ৫ বছর বয়স থেকে ২১ বছর বয়স পর্যন্ত আপেক্ষিকভাবে একইরকম কাজ করতে পারে। সংরক্ষণের বেলায়। কিন্তু স্মরণ থেকে হারিয়ে ফেলার বেলায়, তথ্য খোয়ানোর বেলায় প্রভেদ আছে। এর কারণ কর্ষণ-চর্চা প্রক্রিয়া প্রয়োগের তফাত, কুশলতার প্রভেদ। বয়স যত বাড়ে এই কুশলতা তত বেশি দখলে আসে, আসতে পারে।

স্মৃতির ক্ষেত্রে এবং সুতরাং শিক্ষার বেলায় স্মৃতিসহায়ক কৌশল বা প্রক্রিয়ার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কৌশল তথ্যাদি সংগ্রহের বেলায় যেমন ঠিক পুনরুদ্ধারের বেলাতেও তেমনি জরুরি। তথ্যাদি সংগ্রহ করলেই হবে না তাকে সঠিক প্রসঙ্গে যথাযথ সময়ে উদ্ধার করার ক্ষমতাও থাকা চাই, কর্ষিত হওয়া চাই। অর্থাৎ সংগ্রহ-সংরক্ষণ (Retention), পুনরায় উদ্ধার করা (Recall, Revival) এবং প্রত্যাভিজ্ঞা (Recogni tion) স্মরণের উপাদান। এই তিন রকমের স্মরণ উপাদানের মধ্যে প্রথম দুইটিকে চেষ্টা করে বাড়ানো যায়। (তৃতীয়টি স্বাভাবিক অনুসরণ করে)। যথাযথ প্রক্রিয়ায় এবং কর্ষণে এদের উন্নতি ঘটানো যায়। এই প্রক্রিয়া পদ্ধতিগুলি কি কি? (প্রধানত লেখাপড়ার বেলায়) : -3

 

স্মরণ উন্নত করতে করণীয় :

১. বাতাবরণ ও শরীর মনের যোগ্যতা। পড়ার ঘর, টেবিল-চেয়ার বা মেঝে-ডেস্ক আলো-বাতাস। পরিবেশ-পরিজনেদের মনোযোগ ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করে পড়ুয়াকে। বিড়াল যখন ইঁদুর ধরে তখন সে একটা set তৈরি হয়ে যায়। টানটান, তীক্ষ্ণ, লক্ষ্যমুখী। পড়ুয়ার বেলাতেও তাই।

২. স্পষ্টতা এবং তীব্রতা। বিষয় স্পষ্ট হবে, পড়া বা লেখা স্পষ্ট উচ্চারণে বা কলমে হবে। মিনমিন করে লেখাপড়া হয় না। তীব্র, প্রয়োজনীয় রকমের তীব্র হবে।

৩. বারবার করা/পড়া। বিষয়কে সংগ্রহে স্থায়ী করতে হলে হেলাফেলায় তা হয় না। বারবার ‘প্রত্যক্ষ’ করলে — পড়লে লিখলে বা করলে সংগ্রহ হয়। এবং সংরক্ষণ দৃঢ়

৪. সংবদ্ধতা বা Organisation. লেখাপড়ার বিষয় কোন্ কোন্ বিষয় বা সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত, সমগ্রের সঙ্গে পঠিত বিষয়ের সম্পর্ক, বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক সম্পর্ক- —এরকম তুলনা-প্রতিতুলনা করে তথ্যাদি সংগ্রহ করলে স্মরণ-যোগ্যতা রেড়ে যায়।

৫. শ্রেণীকরণ, সামগ্রীকরণ : অধীত বিষয় বা বস্তুকে শ্রেণী উপশ্রেণীতে বিভক্ত বিন্যস্ত করে বুঝে নেওয়া। সংগ্রহ সম্পর্কের নিরিখে সম্পন্নতর হয়।

৬. বিষয়কে যত বেশি ইন্দ্রিয়ের সংযোগ দেওয়া যাবে সংগ্রহ তত বেশি ও ভাল হবে। দৃষ্টি, উচ্চারণ, আবৃত্তি (জোরে জোরে পড়লে কান পড়াটা শুনছে) এবং সম্ভব হলে নোট করা, মডেল দেখা, ম্যাপ অনুসরণ করা ইত্যাদি একই সঙ্গে কাজে লাগালে স্মরণ বেশি উন্নত হয়।

৭. সবিরাম পদ্ধতি (Spaced learning)। এক নাগাড়ে বা অবিরাম পাঠ্য বিষয়ে লেগে না থেকে সময়ান্তরে- আবার পড়লে স্মরণ ভাল হয়। ভুলে যাওয়াটা বাধা পায়, গভীর দাগ পড়ে স্মরণে। তাই।

৮. সবটা এককালে পড়বে না-কি অংশ অংশ করে পড়বে? ছোটখাট বিষয়, পাঠ্য, এককালে অধিগত হতে পারে। পাঠ্য বিষয় দীর্ঘ হলে অংশে ভাগ করে অধ্যয়ন করা ভাল। অংশ পাঠে অবশ্যই সমগ্রের সঙ্গে অংশের সম্পর্ক জানা থাকা দরকার ।

৯. সমগ্র অবধারণ। মা বাবা বা শিক্ষক শিক্ষিকা ছাত্রের মনে সমগ্র বিষয়ে ধারণা প্রথমেই তৈরি করে দেবেন। নতুন বিষয়, দীর্ঘ পাঠ্য, জটিল পড়া হলে সরল করে মূল মানেটা শিশুর মনে ঢুকিয়ে দিতে হয়।

১০. মানে বুঝে পড়া। শব্দের অর্থ, বাক্যের মানে এবং সমগ্রের মধ্যে যে ঘটনাগত বা যৌক্তিক পরম্পর্য আছে সেটি শিশুর মনে সহজবোধ্য হওয়া চাই। খটখটে শব্দ,খটমট মানে আর ছেঁড়াছেটকা সম্পর্কহীন পাঠ্য মনে হলে ইতো নষ্ট ততো ভ্ৰষ্ট অবস্থা হয়। ইচ্ছেটাই মার খেয়ে যায়। সময় নষ্ট হয় পড়াটা মনেই থাকে না।

১১. বেশি পড়া (Over learning) এবং পর্যালোচনা। পড়া হয়ে গেছে, সব মনে আছে—এমন যখন শিশু বলে তখন বোঝা যায় শেখাটা হয়ে গেছে। কিন্তু সেই সংগ্রহ ধীরে ধীরে সহজেই আবছা হয়ে যেতে থাকবে। ভুলে যাবে। কিন্তু যদি তার পরেও দু-চারবার পড়ে, বেশি পড়ে, over learning হয় তাহলে গভীর দাগ কেটে বসে যাবে। আবছা হবে না। সেই সঙ্গে মুখে মুখে পঠিত বিষয়ের আলোচনা পর্যালোচনা করলে ভাণ্ডারে দীর্ঘদিন থেকে যাবে।

১২. স্মৃতি সহায়ক কৌশল (memonic, technique) : আদ্যক্ষর নিয়ে সংক্ষেপীকরণ (যেমন-BODMAS) সব পাঠ্য বিষয়ের যেখানে যেখানে শিশুর মনে রাখার কষ্ট হয় সেখানে সেখানে শিশুকে সাহায্য করা বড়দের কাজ।

১৩. বিষয়ের প্রতি আগ্রহ, অনুরাগ, মনোযোগ। ভাল লাগা চাই, ভালো লাগানোর জন্যে অভিভাবকদের চেষ্টা করা চাই। তবেই ছাত্রছাত্রী মনের দিক থেকে তৈরি হয়ে উঠবে। আগ্রহ আরও আগ্রহ বাড়ায়। অনুরাগ আরও অনুরাগ। সাফল্যের চাইতে বড়ো সফলতা নেই। মা-বাবা এবং স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা যদি মানবিক না হন, অনুভব প্রবণ না থাকেন, শিশুদের ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রতি সজাগ না থাকেন তাহলেই বিপত্তি। আনন্দের সঙ্গে শিখতে শুরু করুক, রক্তচক্ষু তাড়নার সহযোগে নয়। মিটে যাবে ভয়।

১৪. ইংরেজি বাংলার জন্যে ছাত্রছাত্রীকে নিজেদের ‘অভিধান’ তৈরি করতে দিন। অন্য বিষয়ের জন্যে সহায়ক নোট বুক –পয়ন্টেগুলি ১, ২, ৩,….. করে লিখে রাখবে। প্রশ্নকেন্দ্রিক অথবা বিষয় কেন্দ্রিক।

১৫. ওরা ঠিক ঠিক করছে কিনা আপনারা তা দেখুন। সঙ্গে থেকে দেখুন। সমস্যা বোধ করলে bottleneck-গুলি ছাড়িয়ে দিন। অনেক বিষয় বা অবস্থা আছে যা স্মরণ প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়, অকরণীয়। যেমন—

 

যা স্মরণ প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়:

১. আবছা বা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া। ফিরে ফিরে মনে না করলে, পর্যালোচনা, revive না করলে স্মৃতি হারিয়ে যেতে যাকে।

২. পিছনের বিষয়কে, স্মরণকে, বাধা দান। কবিতা পড়ার পরেই, সঙ্গে সঙ্গেই ভূগোল শুরু করলে (বা এমন ঘাড়ে ঘাড়ে বিষয় পালটালে) পরের বিষয়টি আগের বিষয়ের শেষটাকে প্রভাবিত করে, মুছে দেয়। প্রত্যেক বিষয়ের পঠনপাঠনের পরে সেই বিষয়ের একটা রেশ থাকে। মনে মস্তিষ্কে। সেখানেই বাধাটা এসে ধাক্কাটা দেয়। মুছে দেয়।

৩. আবেগের বাধা। রাগ-দ্বেষ, দুঃখ-কষ্ট, উল্লাস-উচ্ছ্বাস, কান্নাকাটি। কতই আছে। পড়াতে মন বসতে বাধা দেবে, স্মরণ ক্রিয়ায় বাধা দেবে। এমন কি ভালো করে পড়ে মন রাখা বিষয়কেও তুলে আনতে recall বা revival করতে বাধা দেবে।

৪. অবদমন (Repression) যে সব প্রত্যক্ষের সঙ্গে অবদমন জড়িত—লজ্জাজনক বা অপমানকর কোনো অভিজ্ঞতা, অথবা যে ঘটনার সঙ্গে অপরাধবোধ জড়িত, ছিঃ ছিঃ রকমের একটা মনোভাব যে অনুভবে সংযুক্ত—এমন সব ক্ষেত্রে অবদমন ঘটে। অবদমন অর্থে সচেতন মনের স্তর থেকে অভিজ্ঞতাকে অবচেতন স্তরে ঠেলে দেওয়া। ছোটদের বেলায় suppression আছে। কৈশোরে অবদমনের শুরু। শিশুদের পঠন-পাঠনের বেলায় বড়রা নজর রাখবেন যেন ওরা ‘অসম্মানিত’ ‘লজ্জিত’ বোধের দ্বারা আক্রান্ত না হয়।

ভুল দেখিয়ে দিন—পিয়ারসে। শুধরে দিন—মৃদু স্পর্শে। তাহলে শেখাটা স্মরণে থাকবে। কর্ণ মর্দন, পিঠে বজ্রাঘাত, মাথায় গাঁট্টা— এইসব পথ মস্তিষ্কের কোষে প্রবেশের সহজ পথ নয়! মনের দ্বার চপেটাঘাতে খোলে না!

৫. আঘাত (Shock)। নাটক সিনেমা দেখে দেখে আমাদের প্রয়োজনের বেশি জানা হয়ে যায়। স্মৃতি বিলোপের কারণ হঠাৎ আঘাত আর টেবিলে মেঝেতে ‘অপগোণ্ড’ দের নিয়ে বসে গুরুগিরি করতে অনেক অনেক দৈহিক অত্যাচার ও মানসিক পীড়ন ঘটে।

তার ফলে পিঠ-কান-চুল হাতের তালু শক্ত হতে পারে কিন্তু মনটাও যে অকারণে অনাকাঙিক্ষতভাবে ‘শক্ত’ এবং নিরেট হয়ে ওঠে তার হদিস কে রাখে! এই সব ছোটখাট দৈনন্দিন ব্যবহারের শক্, ছ্যাঁকা দিয়ে দিয়ে স্মরণ প্রক্রিয়ার দফারফা করে দিয়ে থাকে। আগ্রহ, মনোযোগ অনুরাগের অংকুরেই মৃত্যু ঘটে যায়। শিশুরা নন্দ ঘোষ হয়ে ওঠে।

৬. বাইরের বাধা (distraction) : পড়াশুনোর পরিবেশের অভাব—মাইকে গান, কবিতা, বাজছে। পাশের ঘরে ছোটো মাসি রগরগে গল্প বলছে। ঘরের মধ্যে টুনিটা পুতুল নিয়ে অথবা রিঙ্কু বল নিয়ে হৈচৈ লাগিয়ে দিয়েছে। রান্নাঘরে মায়ের মাথায় রক্ত উঠে গেছে। বাবা রাজনীতির নীতিহীনতা নিয়ে ছাদ ফাটাচ্ছেন, ছোড়দি জানলার পাশে জিভে টাক দিতে দিতে আচার খাচ্ছে—পড়া হবে? স্মরণে কিছু থাকবে? স্মরণ থেকে কাউকে ডেকে খুঁজে পাওয়া যাবে?

মতবাদ অনেক। বিতণ্ডাও কম নেই। সে সব থাক। শৈশব থেকে শিশুকে শিক্ষা দিতে কি কি বিষয় অনুসরণ করা দরকার।

 

শিক্ষার জন্য করণীয়:

১. শিশু চেষ্টা করবে। এই চেষ্টা করতে ভুল করবে, ঠিকও করবে। ঠিক করাটা যাতে তার মনে মাথায় বসে যায় তার জন্যে (ক) পুরস্কারের ব্যবস্থা একটা চাই, (খ) আগ্রহটা বাঁচিয়ে রাখা চাই, (গ) বার বার ঠিকটাই করা চাই।

২. সম্বন্ধ বা সম্পর্ক তৈরি করে শিক্ষা দিতে হবে। সাপেক্ষ প্রতিবর্ত শিক্ষা ব্যবস্থা। পড়াটার পরে পর্যালোচনা। তার পরে খাওয়া বা খেলাটাকে যুক্ত করে দিন। লেখা, মূল্যায়ন তার পরে বেড়াতে যাওয় কটা কোনো আজকের কাজের সঙ্গে একটা কোনো অনুশীলন বা চর্চার সম্বন্ধ তৈরি করে দিন।

৩. শিশুকে সম্বন্ধ বা সম্পর্ক খুঁজে বার করতে শেখান। ২, ৪, ৬…কি হবে? প্রত্যেকটি সংখ্যা দুই করে বাড়ছে। এই দুই করে বাড়ার সম্পর্কটা ধরিয়ে দিন। শব্দ উচ্চারণের বেলায় জিভ দাঁত ঠোটের নড়াচড়া-অবস্থানের সম্বন্ধ দেখিয়ে দিন। শব্দের বানানের বেলায় অক্ষরের (Syllable) এর সম্পর্ক; অংকের বেলায় প্রদত্তের সঙ্গে অপ্রদত্তের সম্পর্ক, ভূগোলের পড়ায় বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ফসলের, মাটির প্রকৃতির সঙ্গে ফসলের ইত্যাদি। কবিতার বেলায় ছন্দ-যতি-মিল এবং অর্থ সম্পর্ক। গল্পের বা উপাখ্যানের বেলায় বাস্তবতা ও যৌক্তিকতা, পারম্পর্য।

৪. শিশুকে পাঠ্যবিষয়ের মধ্যে মধ্যে অন্তর্দৃষ্টি (insight), অগ্রদৃষ্টি (foresight) এবং পশ্চাৎদৃষ্টির (hindsight) অনুশীলনে সাহায্য করুন। হঠাৎ কোনো তথ্য-সম্বন্ধ সংযোগ খুঁজে পেলে শিশু আনন্দে আপ্লুত হবে। আগ্রহ বেড়ে যাবে। নিজেই খুঁজতে চেষ্টা করবে।

৫. অনুকরণ। শিশুর শিক্ষার বেশিটাই দেখে দেখে, শুনে শুনে শেখা। অনুকরণ করে শেখা। অনুকরণীয় মডেলকে উন্নতমানের হতে হয়। না হলে এলেবেলে রকমের করে শেখা হবে। পড়তে-পড়াতে বসা, কলম-পেন্সিল ধরা, শরীরের অবস্থান বা set, পঠন-লিখন-ক্রিয়ার পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা বা লাইন ধরে লেখা এবং বর্ণদের যথার্থভাবে ও আকারে লেখা, দাড়ি-কমা-সেমিকোলন নির্দেশ অনুসরণ করা ৷ কণ্ঠ, উচ্চারণ ও শব্দক্ষেপণ—সবই শিশু অনুকরণ করে শিখবে। আপনি আচরি পঠন পাঠন শিশুকে শেখান !

৬. শিশুর দেহগঠন, বৃদ্ধি এবং মনমানসিকতার পর্ব-স্তর বুঝে বোঝা চাপান। ঘুমের, খেলার ও দুষ্টুমি করার সময় বাদ দিয়ে নির্ঘণ্ট তৈরি করবেন। সেই রুটিন বিষয়ে নিজেরা সরকারি কর্মচারীদের মতো সময়হীন ব্যবহার করে শিশুদের সময়ানুবর্তী হতে নীতিশিক্ষা দেবেন না। স্ববিরোধ ধরা পড়ে যাবে।

৭. শিশু শ্রমিকদের বিষয়ে আমরা সচেতন (?) হতে চলেছি। মানব শিশুও শিশু। মানবক বলে তার পিঠে বই-পত্র রূপ ইটের বোঝা বইবার দায় ক্রমশই বেশি বেশি করে চাপানো হচ্ছে। আমাদের জীবনে প্রতিযোগিতা বাড়ছে বলে ওদের কাঁধে পিঠে জীবন্ত ঘা (ক্ষত) তৈরি করার কারণ আছে কি? শৈশবেই ভারবাহী হলে বয়সকালে বোঝা ছেড়ে দিতে পারে। তখন?

৮. লেখা পড়ার প্রতি ঝোঁকটি হওয়া চাই। প্রেষণা। মা বাবা ঠিক করে নেবেন কিভাবে এই ঝোঁকটা, প্রবণতা আকাঙক্ষাটুকু অংকুরিত পল্লবিত করে তোলা যায়। পীড়ন অবশ্যই বিষবৃক্ষ তৈরি করবে।

৯. প্রায়োগিক শিক্ষা দিন। শিক্ষাটা যে শিশুর জীবনে এখুনি কাজে লাগছে— প্রশংসা পেতে, পুরস্কার পেতে, বেড়াতে যেতে, ছবির বই পেতে ইত্যাদি—তা শিশু টের পাবে। যেমন যেমন বয়স বাড়বে তেমন তেমন প্রাপ্তির উপযোগের ব্যবস্থা থাক। পড়ুয়ার মনে যেন এই প্রাপ্তির দিকটা, utilitarian দিকটার বোধ দানা বেঁধে ওঠে।

১০. লেখাপড়া শেখে শিক্ষিত বেকারিত্বের সংখ্যা বাড়াতে! সামাজিক রাজনৈতিক খোঁচাখুঁচিতে আগ্রহ নেই। মনোবিজ্ঞানের চোখে বলা যায় : লেখা পড়া এবং অনুশীলন মনমানসিকতাকে প্রসারিত করে, মস্তিষ্ক-বুদ্ধিকে ক্রিয়াশীল, সূক্ষ্ম ও উৎপাদনক্ষম করে তোলে। চাকরিই জীবনের মোক্ষ নয়—একটা চেয়ার, টেবিল এবং মাথার উপরে সব্লেড-ফ্যান। ব্যাস্। ব্যাস্? শিক্ষাটা জীবনের যুদ্ধক্ষেত্রে কাজে লাগানোর প্রস্তুতি বলে বুঝতে দিন।

১১. অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই। পর্যালোচনা সংরক্ষণকে এবং ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। জীবনের বাঁচাটা জৈবিক না হয়ে বৌদ্ধিক হতে পারে। অভিধানে জুড়ে দিন, শব্দকোষ দেখতে শেখান, নিজেকে প্রকাশ করতে রোজ কিছু কিছু লিখতে অভ্যস্ত করে দিন। সোনা ফলবে। স্কুলের প্রগতি পত্রই শেষ কথা নয়; বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যায়ন পত্রও নয় বাঁচার প্রকৃত রসদ। এরা আবশ্যিক, অনিবার্য নয়। Necessary but not sufficient.

ছাত্রছাত্রীদের যেমন রিভিশন করতে বলি তেমনি আমরাও ও একবার রিভাইস করে নিতে পারি :

 

চলুন রিভাইস করি:

১. ২-৭ বছর বয়স। সমস্যার কাল। খেলার বেলা। প্রশ্ন করা, অভিযানের কাল।

২. শরীরের উন্নতি ধীর। কিন্তু শৈশবের ভিতে অনেক অভ্যাস, প্রভূত প্রাপ্তি ও প্রকাশের কাল।

৩. এটা আরও শেখার কাল। নতুন নতুন ক্রিয়া-প্রক্রিয়া কলাকৌশল শেখার সময়। পুরোনো ‘জ্ঞান’ বাধার সৃষ্টি করে না এখন। নমনীয় বয়স। শেখালেই শেখে।

৪. শব্দ ভাষা এবং আলাপচারিতা দ্রুত বাড়ার কাল।

৫. শিশুর আবেগীয় জীবনের ভিত তৈরি হয়ে যাবে। কিছু কিছু স্বাভাবিক, কিছু অস্বাভাবিক আচরণ শিখে নেবে।

৬. সামাজিক ব্যক্তির শুরু এখানে। দলবদ্ধতার জীবনে ঝুঁকবে। Peer Group খুঁজবে। ৭. নীতিশিক্ষার কাল—যদিও চাপিয়ে দেওয়া নীতিশিক্ষা। শাস্তি প্রশংসার মাধ্যমে। নিজে না জেনে বুঝেই শিখবে।

৮. কয়েকটি জিজ্ঞাসার অংকুর প্রকাশ পায়। আগ্রহ : শরীর, জামাকাপড়, যৌনবিষয়, ধর্ম এবং স্বকেন্দ্রিক।

৯. পারিবারিক সম্পর্কের অবহিতি, অধিকার-যোগ্যতার নিরিখ, পক্ষপাতিত্বের ধারণা।

১০. শারীরিক বিপদ আপদের কাল।

১১. সুখের সময়। মা-বাবার জন্যে। অথবা যন্ত্রণাবোধের। লালন-পালনে অথবা পঠনপাঠনে ভুল প্রক্রিয়ার জন্যে।  এই সময়ে শিশুর সুখের কারণগুলি – (মা-বাবারা নজর রাখবেন )

 

শিশুর সুখের কারণ:

১. পুষ্ট স্বাস্থ্য, নিরোগ শরীর। খেলা সফল জীবন দর্শন।

২. প্রচুর উদ্দীপনার যোগান। ক্ষমতা যোগ্যতা নৈপুণ্যের অবাধ প্রকাশের সুযোগ।

৩. বিরক্তিকর ব্যবহারেও অভিভাবকদের নম্র-দৃষ্টি। প্রতিনিয়ত শিখিয়ে পড়িয়ে লালন পালন ।

৪. সামঞ্জস্যপূর্ণ শৃঙ্খলা উপ্ত করা। করণীয়-অকরণীয় জানা থাকে। শাস্তি পেলে ক্ষোভ হয় না।

৫. শিশুর কামনা-বাসনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়। মা-বাবার সঙ্গে অনেক সময় পায় ।

৬. মা-বাবার উৎসাহদান— খেলাধূলায়, ছবি আঁকায়, নাচে—সব দিকে। উৎসাহ উদ্দীপনা আনন্দ ৷

৭. ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব মিলেমিশে মধুর ও উজ্জ্বল সামাজিক সম্পর্ক গড়ে অম্যের সঙ্গেও। ওঠে।

৮. মনের মতো, আনন্দময় বাতাবরণ। ছোটদের জগতে বড়দের আনাগোনা, সামিল হওয়া।

এই সবের বিপরীত হলেই দুঃখের কারণ – ভবিষ্যতের সমস্যার বীজ এখানেই উপ্ত হবে। শিশুর তত্ত্বাবধান বইতে প্রধানত ২ বছর পর্যন্ত শিশুকে নিয়ে আলোচনা করেছি। সেই আলোচনায় অনেক পরের বিষয় এসে গেছে। কারণ অনেক সমস্যার শুরু তখনইহয়ে যায়। আবার সেই প্রথম শৈশবের অনেক ব্যবহার প্রথম বাল্য (২-৭ বছর) এবং দ্বিতীয় বাল্য (৭-১১) পর্যন্ত প্রভাব ফেলে।

অনেকে এই বয়সটা ২-৬, ৬-১১ ধরেন । এই বইতে প্রথম বাল্য আলোচিত হয়েছে। এবারে দ্বিতীয় বাল্য। Piaget-এর মতে Preoperational Period (2-7 yrs.) এবং Period of Concrete operation (7-11 yrs.) একেই আমরা প্রথম বাল্য এবং দ্বিতীয় বাল্যকাল বলেছি। তফাৎ কোথায়? কিসে কিসে? এক কথায়, দ্বিতীয় বাল্য অনেক বেশি সংবদ্ধ—প্রত্যক্ষ এবং অভিজ্ঞতা, স্মরণ ও শিক্ষার এলাকায়।

অনেক বেশি সক্ষম— অভিজ্ঞতার এবং শিক্ষার উপাদানসমূহকে অনেক বেশি গুছিয়ে গাছিয়ে নিতে organise করতে এবং ক্রিয়াশীল নাড়াচাড়ায়, সংযোগাদি সাধনে (to manipulate) বিতং দিয়ে বললে বলা যায়—

১. ধারণ ক্ষমতা বেশি। মনে-স্মরণে।

২. ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। স্ববিরোধটা বুঝতে শিখেছে। বস্তু ও বিষয়কে প্রতিরূপের সাহায্যে প্রকাশ করতে পারছে। ৩. পরিবেশ পরিস্থিতির অংশ এবং উপাদানসমূহের মধ্যে সম্বন্ধ-সম্পর্ক বুঝতে শিখেছে।

কিন্তু প্রকল্প রচনা করে সমস্যা সমাধানের যোগ্য সামর্থ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। ৪. দ্বিতীয় বাল্যেই (৬-১১ ধরলে) প্রথম বিরাট পরিবর্তন আসে জীবন যাপনে দৈনন্দিন সময় নির্ঘণ্টে। স্কুল বা বিদ্যালয়। নার্সারি বা কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাব্যবস্থায় যারা যাতায়াত শুরু করে দেয় তারা অনেকটাই অভ্যস্ত থাকে। তবুও ছয় বছরে প্রথম শ্রেণী হলে একটা নতুন পরিস্থিতি এসেই পড়ে।

দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব, মূল্যবোধ এবং আচরণে ভিন্নতা এসে যায়। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সমঝোতা করা। মানিয়ে নেওয়ার একটা সমস্যা এসে যায়। ফলে

(ক) ঝামেলার কাল। আগের মতো ‘সুবোধ’ থাকে না—যা পায় তাই খায় না,যা বলা হয় তাই করে না। মা-বাবার নির্দেশ উপদেশের চাইতে বন্ধুবান্ধবের কথার দাম বেশি হয়ে দাঁড়ায়।

(খ) অগোছালো, বিশৃঙ্খল কাল। জামাকাপড়, বইপত্র, ঘরদুয়োর—সবই ছড়ানো ছেটানো, অসংলগ্ন হয়ে যায়। ছেলেদের বেশি। অযত্ন আর ‘ঠেলায় রক্ষে কর’ মতো জীবন।

(গ) ঝগড়া মারামারির কাল। ভাইবোনের মধ্যে। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে। কিছুতেই যেন বাগে আনা যায় না।

৫. অর্জনের বয়স। স্কুলে, বাড়িতে, খেলার মাঠে, পুতুলের সংসারে—পাঠ্য এলাকায় এবং পাঠ-বহির্ভূত কাজেকর্মে। ছড়ানো ছেটানো এই জীবনে যে যত বেশি বিষয়ে যোগ্যতা পারদর্শিতা দেখাতে পারবে তার পক্ষে তত ভাল। কারণ, দেখা যায়—

প্রাপ্তি-অর্জন-যোগ্যতা এখন যার যেমন ভবিষ্যতেও তার তেমনই থাকে। মনোযোগের এলাকা এবং পরিমাণ, চেষ্টার কম-গড়-বেশি মাত্রা একই ভাবে থেকে যায়। শুধু লেখাপড়ার বেলায়ই নয়, সব ব্যাপারেই এটা দেখা গেছে। দলবদ্ধ জীবন—gang age. একা একা থাকতে চায় না। নড়াচড়া, ওঠাবসা সবই ঝাঁক বেঁধে করতে চায়।  দলের মূল্যায়নের, আশা-প্রত্যাশার যোগ্য হতে চায়—(conformity to gang code) অন্যদের নকল করে, মা-বাবার কথামতো চলতে চায় না।

সৃষ্টিশীল কাল। হাতে-কলমে অনেক কাজ করতে চায়। চেষ্টা করে। এ ধরনের ঝোঁক যাদের থাকে এবং অনুশীলনের সুযোগ পায় তারা সৃষ্টিশীলতাকে বাঁচিয়েই রাখে। খেলার কাল। শৈশবের খেলা-মনটি বাড়ির চাপ ও স্কুলের রুটিন এড়িয়েও বেঁচে থাকতে চায়। সময় কম পায়। মনটি থেকে যায়।

 

নৈপুণ্য অর্জনের কাল। আত্মপ্রত্যয়ের কাল।

(ক) নিজে নিজে করা। খাওয়া, জামাকাপড় পড়া, স্নান, বইপত্র গুছিয়ে স্কুল যাওয়া।

(খ) সাহায্য করা। বাড়িতে মাকে—বিছানা করা, ঝাড়পোঁছ করা। স্কুলে বন পরিষ্কার
করা, ব্ল্যাক বোর্ড ঘষামাজা করা। মাঠে-দালানে—ঘর কাটা, সংসার পাতা।

(গ) শিক্ষার ক্ষেত্রে—লেখা, ছবি আঁকা, মাটি ইত্যাদির মডেল তৈরি করা। নাচ, গান, সেলাই, কাঠের কাজ ইত্যাদি।

(ঘ) খেলায় –বল ছোঁড়া-ধরা, সাইকেল, স্কেটিং, সাঁতার, অন্যান্য খেলা। ১১. উন্নতির কাল। শব্দসম্ভার, ধারণা গঠন, বক্তব্যের বিষয়, কথাবলার পরিমাণ।

(ক) ভদ্রতার শব্দ—দয়া করে, অনুগ্রহ করে, ধন্যবাদ, Thank you, Please, sorry.

(খ) বর্ণ শব্দ—সব রকমের রঙ চিনবে এবং বলবে।

(গ) সংখ্যা ও রাশি বাচক শব্দ।

(ঘ) টাকাপয়সা বিষয়ক শব্দ।

(ঙ) সময় জ্ঞাপক শব্দ।

(চ) প্রতিজ্ঞা-বোধক শব্দ এবং গালমন্দ শব্দ (slangs)।

(ছ) গোপন শব্দ code words, symbolic signs, বিকৃত শব্দ গঠন, কোনো বর্ণকে অকারণে ঢুকিয়ে শব্দের গঠন-উচ্চারণ আলাদা করে বলা বা লেখা। খেলা-খেলা অথবা বড়দের ফাঁকি দিয়ে নিজেরা কথা বলা।

এই সব সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে মেলামেশায় গড়ে ওঠে, অনুশীলিত হয়, বাড়ে কাদের সঙ্গে মিশছে, কতক্ষণ কাটাচ্ছে তার উপর বেশি নির্ভর করে। ধারণা গড়ে উঠতে থাকে। অনেক অনেক বিষয়ে। অফুরন্ত কথা বলতে থাকে।

দ্বিতীয় বাল্যের এই সব বৈশিষ্ট্য জানা থাকলে মা-বাবারা নিজ নিজ সন্তানের গতি-প্রকৃতি বিচার-বিবেচনা করে পথ নির্ণয় করে নেবেন। মানব সন্তানকে দুম সিধে করা যায় না। বিপরীত বিরুদ্ধ মোড় নেওয়ানো বা সমকোণী দিক পরিবর্তন হিতে বিপরীত ঘটতে পারে। তাই সঙ্গ দিয়ে এবং সঙ্গে থেকে যথাসম্ভব কাম্য দিকপরিবর্তন করানো সুফলপ্রসূ হয় ।

 

দলে ভিড়লেই যে খারাপ হয় তা তো নয়। যা যা ঘটে তার একটা বিবরণ দেওয়া যাক—

১. দল বা গোষ্ঠী আনুগত্য বাড়ে, সমগোত্রীয় মনোভাব সেচন পায়।

২. বয়স্কদের বুড়োটে প্রভাব এড়িয়ে, স্বতন্ত্রস্বাধীন চেতনার অংকুর ছাড়ে।

৩. সহযোগিতা-সহমর্মিতার মন তৈরি হয়। কাজেকর্মে উৎসাহ বাড়ে।

৪. সামাজিক ব্যবহার গড়ে ওঠে। প্রতিযোজনার ক্ষমতা তৈরি হয়।

৫. প্রতিযোগিতার মনোভাব সেচন পায়। প্রাপ্তির আনন্দ বোধ করে ।

৬. দায়-দায়িত্ব ঘাড়ে নেবার শক্তি গড়ে ওঠে। দায়িত্ববোধ বাড়ে।

৭. খেলোয়াড়ি মনোভাব দানা বাঁধে। হারি-জিতি নাহি লাজ। বিবশতা-হতাশা জমে ওঠে না।

৮. দুর্যোগ ও বিপদ-বিপত্তিতে ভেঙ্গে পড়ে না। অপরের দুঃখে অংশ নিতে শেখে।

৯. বিভিন্ন ক্রীড়া ও খেলাধূলায় অংশ নিয়ে শরীরে ও মনে তৎপর হয়ে ওঠে।

১০. দল-গোষ্ঠী মূল্যবোধে উপনয়ন ঘটে।

১১. নেতৃত্বগুণ থাকলে তা সেচন পায় ।

১২. সৃষ্টিশীলতা, ক্রিয়াশীলতা এবং কুশলতা অনুশীলিত হয়।

ভালো দিকগুলো বলা হলো।

 

অনাকাঙ্ক্ষিত গুণ:

অনাকাঙ্ক্ষিত গুণগুলো নজরে পড়লে ‘খোলামেলা’ পদ্ধতিতে (পৃষ্ঠা ১৬) আলোচনা করে সন্না দিয়ে খুঁটে খুঁটে বাতিল করে দিলে সুফল পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়বাল্যে (এবং তার পরেও) কিছু কিছু অসদাচারণ, ধৃষ্ট ব্যবহার, অনাকাঙিক্ষত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। আচরণগুলি—(ক) বাড়িতে এবং (খ) স্কুলে :

(ক)

১. ভাইবোনের সঙ্গে মারামারি।

২. অন্যের জিনিস (কখনও কখনও নিজের জিনিস) ভাঙ্গচুর করা।

৩. বড়দের প্রতি কর্কশ, ধৃষ্ট আচরণ।

৪. সময় নির্ঘণ্ট (routine) তছনছ করা।

৫. ঘরের দায়দায়িত্ব পালন না করা। অকাজে কুকাজে লেগে থাকা।

৬. মিথ্যাকথা বলা।

৭. অতি চালাকি করা।

৮. জিনিসপত্র হাতসাফাই করা।

৯. জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলা।

১. চুরি করা।

২. অপরকে ঠকানো, চিট (cheat) করা।

৩. মিথ্যাকথা বলা ।

৪. নোংরা ও অ-আভিধানিক কথা বলা। slangs.

৫. স্কুলের জিনিসপত্র নষ্ট করা, ধ্বংস করা ৷

৬. অন্য ছাত্রদের পিছনে লাগা, ধমকানো, গণ্ডগোল পাকানো ।

৭. পড়ায় নয়—অন্যদিকে মন দেওয়া। চিউইংগাম, কমিক বুকস ইত্যাদি নিয়ে থাকা।

৮. ফিফিস্ করা, কথা বলা, ক্লাসে শয়তানি করা, ধষ্টানি করা (মাঠ-বারান্দায়

৯. সহপাঠীদের সঙ্গে মারামারি, ঠেলাঠেলি করা।

১০. ড্রাগস্ ব্যবহার করা, অন্যায়ে সহযোগিতা করা।

 

মনোবিজ্ঞানীরা এই সব ব্যবহারের পিছনে যে কারণ থাকে তার অনুসন্ধান করেছেন—

১. অজ্ঞতা, বড়রা কি চায় তা ছোটরা বোঝে না। নীতি-নিয়ম বোঝে না। অথবা ভুল বোঝে।

২. ক্ষমতা জাহির করার জন্যে, অথবা স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে।

৩. গোষ্ঠী-ব্যবহার প্রক্রিয়ায়, group psychology-র প্রভাবে।

৪. নিজের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে নেতিবাচক nuisance value-র ব্যবহার। দ্রুত কাজ হাসিল, মনোযোগ দখল।

৫. নিয়ম-কানুনের নিরপেক্ষতা, সার্বিকতা থাকে না—ব্যতিক্রমে বিরক্ত হয়ে। ৬. ঘরে এক নিয়ম আর স্কুলে অন্য নিয়ম। নিয়মের বিরুদ্ধ-বিপরীত হওয়া।

৭. যত বয়স বাড়ে তত নিয়ম ভাঙ্গার ঝোঁক বাড়ে। নিয়ম ওদের কাছে নিয়মের অভাব বলে মনে হয়, স্ববিরোধী, অনুচিত বলে মনে হয়।

৮. ‘অন্যায়’ শাস্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ওদের কাছে যা অন্যায়, অনুচিত অযৌক্তিক বলে মনে হয়।

৯. বয়স বাড়লেই বয়স্কদের প্রতি বিরূপতা বাড়তে থাকে। লেখাপড়ার চাপ বাড়ে এবং বিষয় একঘেয়ে বলে মনে হতে থাকে। মন উঠে যায়।

১০. সহপাঠীদের অনেকের চোখেই এখন ‘হীন’ বলে ধরা পড়ে। প্রতিবাদ।

১১. ছেলেরা খারাপ ব্যবহার মেয়েদের তুলনায় বেশি করে। এর দুইটি প্রধান কারণ আছে। এক, ছেলেরা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে এবং তুলনামূলকভাবে কম শাক্তি পায়। দুই, ছেলেরা পৌরুষ দেখাতে চায়। নিজেদের আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্যে, বন্ধুবান্ধবদের চোখে হিরো হবার জন্যে। অভিভাবকের নীতি : যেমন কুকুর তেমন মুগুর করবেন না।

যেমন অবস্থা তেমন ব্যবস্থা নেবেন—বিচার বিবেচনা, খোলামেলা নীতিতে শৃঙ্খলা প্রবর্তন করা এবং বুঝিয়ে সুঝিয়ে সুপথে টেনে আনা। সঙ্গ দেওয়া আর ভালবাসার বাতাবরণ—বিকল্প নেই। শাস্তির মজুরি-নীতি, অর্জন অনুযায়ী প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও খোলামেলা হবে। Reformative or Educative theory of Punishment ভেবে দেখতে পারেন। আলাদা আলাদা case, আলাদা আলাদা treatment. এটাই স্বাভাবিক ।

Leave a Comment