শিশু প্রতিভাবানদের কথা – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের অংশ। শিশুর মন ও শিক্ষা , প্রতিভা (Talented, Gifted child) প্রতিভাবানদের কথা একটু বলা দরকার। ধীমান, প্রতিভাধর, সূক্ষ্মবুদ্ধি, বিদগ্ধ, অসাধারণ gifted, talented, বিচক্ষণ শিশু বালকদের নিয়ে মা বাবারা হিমশিম খেয়ে যান। এদের দিকে বিশেষ নজর না দিলে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি। গৃহে এবং বিদ্যালয়েও।
Table of Contents
প্রতিভাবানদের কথা | শিশুর মন ও শিক্ষা
১২০-১২৫ বা বেশি IQ. আছে এমন শিশুকে অ-সাধারণ বা উন্নতমানের বলা যায়। এরা শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগ। এদের মধ্যে ১৩৫-১৪০ IQ যাদের তাদের gifted. আর ১৭০-১৮০ হলে অসাধারণ gifted বা exceptionally brilliant বলা যায়। এরা ১ থেকে ৩ ভাগ মাত্র।
এদের বৈশিষ্ট্যগুলি
১. এদের স্মরণ শক্তি ও মেধা অনন্যসাধারণ।
২. ঔৎসুক্য তীব্র, তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন করার ক্ষমতা অসীম।
৩. যেমন যেমন বেড়ে ওঠে তেমন তেমন এদের প্রশ্নের এলাকা এবং ধার বেড়ে যায়।
৪. শব্দের দখল এবং সম্ভার অবাক হবার মতো। অবহিতিতে সমৃদ্ধে, শব্দার্থের সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝে। শব্দের shades of meaning টের পায়, প্রকাশ করতে পারে।
৫. অত্যন্ত দ্রুত পড়তে পারে। অর্থ বোঝে। অনেক পড়ে। প্রায় যা পায় তাই পড়ে ফেলতে চায়। বড়দের বই, বিষয়, সমস্যা বলে এরা থেমে থাকে না। অভিধান এবং কোষগ্রন্থও এদের পড়ার মধ্যে এসে যায়।
৬. উঁচু শ্রেণীর বই এবং বাইরের বইয়ের প্রতি বিশেষ ঝোঁক দেখা যায়।
৭. বয়সের জন্যে ভাবা যায় না এমন অনেক কথা, ধারণা, নিয়ম-নীতি, বিচার বিশ্লেষণ এরা প্রকাশ করতে পারে। ৮. চরিত্রে, ব্যবহারে, চিন্তায়, দায়িত্ববোধে এবং ব্যক্তিত্বে এরা অত্যন্ত সংস্কৃত-স্বাভাবিক হয়।
প্রতিভা
এই সব অ-সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যাও অ-সাধারণ :
১. এদের অনেকে নিজ নিজ ধী-ক্ষমতাকে কাজে লাগায় না (বা তেমন বাতাবরণ পায় না) :
(ক) অনেকের বিদ্যালয়ে, ক্লাসে, শিক্ষিকাদের bore লাগে, একঘেয়ে মনে হয়। (খ) কাজে মন দিতে পারে না—ক্লাসের মধ্যে। মনবুদ্ধির এলাকার নিচে পড়ে বলে।
(গ) আবেগ জনিত সমস্যায় পড়ে যায়।
(ঘ) যা সব পড়ানো হয় তা অর্থহীন, বিস্বাদ লাগে।
(ঙ) অনেকে বেশি নম্বর পেতে ইচ্ছে করে না—বন্ধু-বান্ধবীরা অন্য চোখে দেখবে। উঁচু ক্লাসে এমন বেশি হয়। Unpopular হতে চায় না।
২. এরা নিজের ব্যক্তিগত আবেগীয় সমস্যা চেপে রাখে এবং রাখতে পারেও, বিশেষ করে শিক্ষকদের কাছ থেকে।
৩. নিজেদের সম্পর্কে বাস্তব সম্মত বোধ থাকে এবং যোগ্যতা বিষয়ে আত্মপ্রত্যয় থাকে।
৪. নিজেরাই চিন্তাভাবনা করে সমস্যার সমাধান বার করে নেয়; বিভিন্ন বিষয় ব্যাপারে সুচিন্তিত মতামত তৈরি করে নেয়, অকারণে ঝামেলায় জড়ায় না, এড়িয়ে যায়।
৫. কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভ্রান্ত স্বমূল্যায়ন ঘটে যেতে পারে এবং চারপাশের চাপে নিজেকে বোকা, stupid বলে মনে করে বসতে পারে। সাধারণ পরিবেশগত কারণে অথবা অধিকতর gifted ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে প্রতিতুলনায়। অথবা ভাই বোন ও মা বাবার কারণে।
৬. উজ্জ্বল এবং ধীমান ছাত্রছাত্রীদের ঔজ্জ্বল্য এবং বুদ্ধির পরিমাপ না করতে পেরে গৃহে অভিভাবকরা এবং স্কুলে দিদিমণিরা অনেক ক্ষতির কারণ হতে পারেন। যোগ্যতা অনুযায়ী প্রাপ্তি নেই দেখে দেখে, বুঝে অথবা না বুঝে, এই সব ছাত্রছাত্রীর মনে বিবশতা, অযোগ্যতা, অক্ষমতার ধারণা জন্মাতে পারে। নিজেদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠতে পারে।
দঙ্গলের সঙ্গে চলতে গিয়ে এরা অলস এবং ভগ্নমন হতে পারে।
মা বাবার লালন পালন (দূরদর্শিতা সহ), স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের পঠন পাঠন (দৃষ্টিভঙ্গি সহ) এবং পরিবেশের প্রতিক্রিয়া (মনোভাব সহ) এই সব উজ্জ্বল এবং অতিশয় ধীমানদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়। কি কি হওয়া উচিত, কেমন শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন এবং কেমন সুযোগ সুবিধা থাকা দরকার সে বিষয়ে শিক্ষা মনোবিদগণ অনেক কথা বলেছেন
(করণীয়) :
১. এগিয়ে দেওয়া, accelerate করা। গড্ডালিকা শিক্ষা নয়, প্রতিটি শ্রেণী-সিঁড়ি মেপে মেপে নয়, উপরের ধাপে তুলে দিয়ে এদের এগিয়ে দেওয়া উচিত। বুদ্ধির খাদ্য এবং যোগ্যতা অনুযায়ী বিষয়ে এদের এগিয়ে দেওয়া উচিত।
২ .সম্পন্নতর পাঠ্য বিষয়, enriched curriculum দেওয়া। (উভয় বিষয়ে একটি সমালোচনা আছে : এমন করলে এরা অসম বয়সী, দেহে বলশালী এবং অসম সামাজিক আচরণে অভ্যস্ত সহপাঠীদের সঙ্গে মিলতে বাধ্য হবে। ফল খারাপ হতে পারে। চাপে পড়ে যেতে পারে। যিনি এদের বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করেছেন সেই বিজ্ঞানী Terman বলেছেন—না, ক্ষতির ভয় নেই। দু-একটি ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে অন্যতর কারণে কারো কারো ক্ষতি হলেও সাধারণ ভাবে acceleration এবং enrichment ভালই করে থাকে। ·
৩. স্বতন্ত্র দল বা শ্রেণী গঠন, special group তৈরি করা (বিদ্যালয়ে) এবং বিশেষ শিক্ষক নিয়োগ করা। একাধিক উদাহরণে দেখা গেছে যে ‘অপ্রস্তুত’ এবং ‘অজ্ঞ’ শিক্ষক এই সব ‘খবর রাখা’, ‘সঠিক জানা’ ছাত্রছাত্রীদের অকারণে শাস্তি দিয়ে থাকেন এমন কি নালিশ করেন যে এরা ধৃষ্ট, অবিনয়ী, উদ্ধত’। নিম্নমানের IQ উচ্চমানের IQ ছাত্রছাত্রীদের মুখোমুখি হলে এরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, suffer করে।
৪. উচ্চমানের IQ সম্পন্নদের এক দলে শিক্ষাব্যবস্থা করলে ওরা নিজেদের পারস্পরিক প্রভাবেই নিজ নিজ স্থান বুঝে যায়। শান্ত গভীরতা পায়। [অনেকে বিরূপ সমালোচনা করেছেন। বলেছেন—এরা তাহলে elitist, বুদ্ধিজীবী, নাক উঁচু হয়ে যাবে। এটা পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণে সঠিক বলে ধরা পড়েনি। বরং নিম্নমানের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পড়ে থাকলেই এমন বিপরীত প্রতিক্রিয়া ঘটে থাকে বলে দেখা গেছে।]
৫. ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, বার বার পরীক্ষা করে তবেই উজ্জ্বলতা ও ধীশক্তি বিষয়ে নিশ্চয় হওয়া উচিত।
৬. মা বাবাদের দায় অনেক। ওদের মন মর্জি, চাহিদা এবং ক্ষমতা প্রবণতা বিষয়ে সজাগ থেকে যোগান দেবেন যখন যা চাই। ছোটো বলেই ওরা ‘ছোট’ নয়। অস্বস্তিকর প্রশ্ন মানেই অন্যায় প্রশ্ন নয়। শিশুর অন্তরে, এই সব শিশুদের অন্তরে অন্তত, শিশুর পিতা ঘুমিয়ে নেই, জেগে আছে জানবেন। ঠাকুৰ্দ্দা জেগে দেখা দিলেও বিস্মিত হবেন না; প্রস্তুত থাকা ভালো!
