শিশুর নীতিবোধ ও নৈতিকতা – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের অংশ। অনন্য সব মানবিক গুণাবলির সমষ্টি হচ্ছে নৈতিকতা বা নীতিবোধ। মানুষ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মকে ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি মেনে চলে। এই নিয়মগুলো মেনে চলার প্রবণতা, মানসিকতা, নীতির চর্চাই হলো নৈতিকতা। অন্তত একজন ভালো মানুষ হতে হলে, নৈতিকতটাকেই আগে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরতে হয়। এ কারণেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা, বাকি সব তার অধীন। একটা সময় মানুষের বদ্ধমূল বিশ্বাস ছিল, ধনই সব নয়-মনটাই প্রধান।
এখন সে অবস্থা নেই। আমরা সবাই ছুটে চলেছি অর্থ সম্পদ ও বিত্তের পেছনে। একজনকে পেছনে ফেলে আর একজনের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা প্রত্যেককে করে ফেলেছে অন্ধ। তা করতে গিয়ে আমরা অবলীলায় বির্সজন দিচ্ছি নৈতিকতা। একটি সমাজের দুরন্ত বিকাশের জন্য প্রয়োজন আদর্শ ও মনুষ্যত্ব বোধসম্পন্ন নাগরিক। আর একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হওয়ারও পূর্বশর্ত হলো নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানবসম্পদ। দেশে শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি হলেও নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষ প্রত্যাশা মতো তৈরি হচ্ছে বলে মনে হয় না। আর সে কারণেই পিতা-পুত্র, পুত্র-মাতা কিংবা কন্যা-পিতা পরস্পরকে খুন করছে-এমন খবরও আমাদের পড়তে হয়।
শিশুর নীতিবোধ ও নৈতিকতা
শিশুর নীতিবোধ ও নৈতিকতা (morality) বিষয়ে কিছু জানা দরকার— সমাজ বিজ্ঞানের মতে:
(১) মা বাবার লালন পালনের উচ্চ মান।
(২) তাঁদের স্নেহ ভালবাসার বাতাবরণ।
(৩) খোলামেলা আলোচনা ব্যাখ্যা সন্তানের মনে উচ্চমানের বিবেক (conscience) এবং অপরাধ বোধ (guilt)-এর ধারণা তৈরি করে দেয়। সব ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ফলের অর্জনে তীব্র দৈহিক শাস্তি পুরস্কার এবং প্রশাসনিক দৃঢ়তা অকেজো।
(৪) ওঁরা বলেন শিশু মা-বাবার নৈতিক মূল্যাবোধের সঙ্গে একাত্মতা বোধ করে এবং নিজের মধ্যে উপ্ত করে নেয়। মা-বাবাকে মডেল বলে মনে করে।
অন্যদিকে ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণে নীতিবোধ এবং নৈতিকতাকে Superego-র অবদান বলা হয়েছে। এবং Superego-র তীব্রতা ও দৃঢ়তার উপর নৈতিকতা নির্ভরশীল। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও কোনো সর্বজনস্বীকৃত পথ বা নির্দেশ পাওয়া যায়নি।
[ শিশুর নীতিবোধ ও নৈতিকতা ]

তবে তার মধ্যে যেটুকু সকলেই মানেন তা এই রকম—
১. উত্তম স্নেহভালবাসার সম্পর্ক আছে (মা-বাবার সঙ্গে) এমন বাল্যকাল যখন খারাপ কাজের শাস্তি হিসেবে ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন জোরালো এবং দৃঢ় নৈতিক বোধ দানা বাঁধে।
২. দৈহিক শাস্তি (শৃঙ্খলার জন্যে) অথবা নরম মনোভাব (permissive attitude) যদি খারাপ ব্যবহার বা আক্রমণাত্মক (aggressive) আচরণের প্রতি প্রযুক্ত বা দেখানো হয় তাহলে বিবেকের মান নিচের দিকেই থেকে যায়।
৩. মা-বাবা এবং সন্তানের মধ্যে একটা উভয়ত-প্রভাব আছে। ওঁরা যেমন সন্তানকে প্রভাবিত করেন, সন্তানও তেমনি ওঁদের প্রভাবিত করে থাকে। উপরের ১-এর ক্ষেত্রে যেমন ২-এর ক্ষেত্রেও তেমনি। উষ্ণ হার্দ্য মনোরম সম্পর্ক যেমন সন্তানের মনে উচ্চমানের নৈতিকতা তৈরি করে তোলে তেমনি সেই সন্তান মন মা-বাবার মধ্যে আরও গভীর স্নেহভালবাসার উৎস খুলে দেয়। আবার স্বভাব-আক্রমণাত্মক সন্তান মা-বাবাকে তীব্র দৈহিক শাস্তি দিতে বাধ্য করে। সন্তান আরও রূঢ় আচরণে পড়ে। তাহলে?
এখানেই মুশকিল। একটা স্ববিরোধ নিশ্চিত ঘটে যায়। বিষে বিষক্ষয় হয় না। আয়নার সামনে ভেংচি কাটলে সুন্দর মুখ দেখায় না। উল্টো ফল হয়। সন্তান শক্তিশালী মা-বাবার প্রতি রূঢ় আক্রমণাত্মক ব্যবহার করে না—পিঠের, মাথার আর কানের ব্যথায়। অথবা অভুক্ত থাকার সম্ভাব্য যন্ত্রণায়। কিন্তু ‘শিখে’ যায় অপেক্ষাকৃত শক্তিহীনদের প্রতি দুর্ব্যবহার করতে। উচ্চবর্গের রূঢ় দৈহিক আচরণ তাকে নিম্নবর্গের প্রতি সেই আচরণে ঠেলে দেয়। মারকুটে স্বভাবের হয়ে যায়—ঘরে ভাইবোনেদের প্রতি, বাইরে সঙ্গী সাথীদের প্রতি। পিটিয়ে সিধে করা উদ্ধত মা-বাবারা হুঁশিয়ার। সন্তান আপনাদেরই রোল মডেল— অনুকরণযোগ্য নিরিখ করে নেবে। নালিশের তাড়নায় নাজেহাল হবেন।
(Role model identification বিষয়ে ‘শিশুর তত্ত্বাবধান’ বইতে বলা আছে। বিশেষ করে TV-তে দেখা দৃশ্য উপাখ্যান-গল্পে। ডিশিম-ডিশিম, স্যুই-স্যুই ইত্যাদি। দেখে নিতে পারেন।)
পরার্থপরতা (altruism স্বার্থপরতার বিপরীত) বাল্যের বিবেক গঠনের অঙ্গ। উদারতা, নিজের জিনিস অন্যের সঙ্গে ভাগ করে ভোগ করা (sharing) শিশু মনে মা-বাবার আচরণ থেকে এবং পরিবেশ থেকে আপনিই জায়গা করে নেয়। বাইরে থেকে আরোপ শাস্তি অথবা পুরস্কারের কারণে হলে তাকে মূল্যবান বলা যায় না। স্বভাব পরার্থপরতা হয় না। স্বভাব। যখন দেখে শুনে, জেনে বুঝে শিশু স্ব-ভাবে পরার্থপর হয় তখনই তাকে সামাজিক প্রাপ্তি বলা যায়। সম্ভাব্য শাক্তি অথবা পুরস্কার এখানে কোনো প্রভাব ফেলছে না। উদার ব্যবহার উদার ব্যবহারের জন্ম দেয়।
নৈতিক মনের আর এক প্রকাশ ঘটে যখন অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিশু জগতকে দেখতে শেখে। অন্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভাললাগা-মন্দলাগা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অনুভব ইত্যাদি টের পায়, বোঝে। এখানেই পরার্থপরতার উৎস। এই টের পাওয়াতে, এই বুঝতে পারার ক্ষমতার মধ্যে।
মা-বাবার কাজ সেই ‘নৈতিক-সামাজিক’ অনুভব বা প্রবণতাকে কর্ষণে সেচনে সমৃদ্ধ করা।
নীতিশাস্ত্রের আলোচনায় মিল এবং বেন্থাম মানুষকে সর্বথা ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিয় বলে ঘোষণা করেছেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের বিশ্লেষণে দেখা গেছে মানুষ না সর্বতো ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক না সে সর্বথা পরস্বার্থকেন্দ্রিক। অনেক মানুষ অনেক অবস্থায় অপরের স্বার্থে কাজ করে থাকে। করে নিজেদের ভিতরের প্রেরণায় শাস্তি বা পুরস্কারের জন্যে নয়। আনন্দের জন্যে, তৃপ্তির কারণে। ভাল লাগে বলেই সে পরার্থতার হয়ে পড়ে। তাই, এটা বড়দের বেলায় স্বাভাবিক, স্বভাবজ প্রকৃতিজ হলে, সেই সবের উৎস বাল্যের মনোভাবে অবশ্যই আছে, থাকে। সেখানেই কর্ষণের সেচনের প্রয়োজন।
