শিশুর ভয় এবং উৎকণ্ঠা নিয়ে আজকের আলোচনা। এটা বয়ঃসন্ধির একটা বড় ইস্যু। কৈশোর তারুণ্যের বিশেষ এলাকায় এখানে করা হচ্ছে। অনেক ভয় আছে যেগুলো শৈশব পার হয়ে সোজাসুজি বা অন্যভাবে কৈশোর-তারুণ্য ছাড়িয়ে যৌবনের এলাকাতেও সচল থাকে, ক্রিয়াশীল থাকে। যেমন, জন্তুজানোয়ারের ভয়, আগুনের ভয়, রোগের ভয়, ডুবে যাবার ভয়, অতি প্রাকৃতিক বা ভূতের ভয়, অন্ধকারের ভয়, একাকিত্বের ভয়।
শিশুর ভয় এবং উৎকণ্ঠা
এই সব ভয়ের অনেকগুলিই উৎকণ্ঠাজাত অর্থাৎ বাইরের জগতের অবস্থাদির প্রভাবে কম, কিন্তু অন্তর-জগতের প্রবণতা ও মনোভাবের প্রভাবে বেশি ঘটে থাকে। অর্থাৎ এই ভয় গুলো আমরা প্রোজেক্ট করি, কল্পনায় প্রতিস্থাপনা করে নেই। আরও কিছু ভয় আছে যেমন ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাত, ডাক্তারের, পরীক্ষার, অগ্রাসী ছেলেমেয়েদের ভয়, শিক্ষক শিক্ষিকাকে ভয়। এই সব ভয়গুলি মনের ভিতরে ভিতরে নড়াচড়া করে, বাইরে ততো বেশি প্রকাশ পায় না।
ভয়ের বেলায় তিনটি উপাদান থাকে : এক, প্রত্যক্ষের প্রতিক্রিয়া। দুই, একটি বিশেষ অনুভব। তিন, আকুলতা বা প্রক্ষোভ। ভয় কেটে গেলে, বিচারবিশ্লেষণ করলে এই তিনটি বিষয়কে স্বতন্ত্র করে বোঝা যায়। তাই বলা হয় যে ভয় ব্যাপারটা বাস্তব অবস্থা থেকে ঘটে। উৎকণ্ঠার বেলায় এই ভয়ের উৎসটা সুপ্ত থাকে, লুকোনো থাকে। বিচারবিশ্লেষণে তেমন পরিষ্কার সামনে তুলে ধরা যায় না। এর কারণ অন্তর্নিহিত আবেগের জটিলতা-বিরুদ্ধতা- আত্মখণ্ডণ। এদেরই ইংরেজিতে ফোবিয়া বলে। অবচেতন মনের ক্রিয়াশীলতা উৎকণ্ঠার মূলে কাজ করে। তাই সচেতন স্তরে অনুসন্ধানে সুফল পাওয়া যায় না।
উৎকণ্ঠার উৎস :
১. নিজের মনের আবেগীয় বৈপরিত্য, কনফ্লিক্টস্। অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অক্ষমতা মনের দোদুল্যমানতা প্রকাশ করে।বয়ঃসন্ধির সমস্যা
২. কাঙ্ক্ষিত জনের স্নেহ-ভালবাসা-সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবার কাল্পনিক বা বাস্তব সম্ভাবনা।
৩. আত্মতুষ্টির প্রবল আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বাধা বা প্রতিরোধ— ব্যক্তি কেন্দ্রিক বা পরিবেশ-পরিস্থিতি-কেন্দ্রিক— যদি জোরালো হয়। শিশুর মন ও শিক্ষা’ বইতে ‘ছোট হানস্’-এর কাহিনী বলা আছে।
8. যা চাই তা পাইনা আর যা পাই তা চাই না। চাওয়া-পাওয়ার এই বিরোধ থেকে শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব তৈরি হয়। পিতামাতার প্রতি, নিজের প্রতিও। এই ব্যাপারটা আরও জটিল হয়ে ওঠে অবচেতনের চাওয়া-পাওয়ার সুপ্ত বাসনাগুলোর কারুকার্যে।
৫. মা-বাবা শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অন্যান্য জনেরা ‘প্রত্যাশার’ বীজ বুনে দেন, বাস্তবের ছেলেমেয়েরা সেই ‘কল্পনার রূপরেখায় আঁকা’ তাদের অবস্থানের চাপে মথিত হতে থাকে। আপ্রাণ চেষ্টা করে সেই ‘বর্ণিত’ অবস্থানে পৌঁছোতে এবং থাকতে। যদি ক্র্যাক করে, ফেটে যায়, সেই অবস্থানে পৌঁছোতে-থাকতে না পারে? এই ভয় বা উৎকণ্ঠা প্রধানত আবেগীয় গভীরে জন্ম নেয় ।

৬. মানসিক অস্বাস্থ্য বা অব-উন-মানসিকতার কারণে।
বয়ঃসন্ধির সমস্যাটি অন্যান্য সমস্যার মতো নয়; সংস্কার, লজ্জা, এক ধরনের অনিশ্চয় গোপনীয়তা, কিছুটা ভয়, অনেকটা সংশয় এবং একরাশ বিস্ময় এই বয়ঃসন্ধির কাল ও অবস্থানকে ঘিরে শরীর-মনে কুণ্ডলী পাকিয়ে তোলে। কিছুটা তার প্রকাশিত বাস্তব; অনেকটাই তার ফল্গু-প্রবাহের অনুভব-অনুরণনে সত্য। চতুরঙ্গ দেহের আর সাতরঙ্গ মনের সব কিছুর মধ্যে এবং সব কিছুকে ছাড়িয়ে একটা যৌনঝরনার জলতরঙ্গ যেমন অবিরাম সংগীতের মূর্ছনা তোলে তেমনি সে তার তাপে ও চাপে অনেক অনেক সত্য-শিব-সুন্দরকে ওলটপালট করে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়।
