নবজাতকের পরিচর্যা

নবজাতকের পরিচর্যা নিয়ে আজকের আলোচনা। জন্মের পরই নবজাতকের প্রথম ভাষা বা ধ্বনি হলো ‘কান্না’। কান্নার মাধ্যমেই সে সকলকে জানান দেয় তার আগমনবার্তা। আর কান্নার সঙ্গে সঙ্গে তার ফুসফুসে প্রথমবারের মতো বাতাস ঢোকে এবং ফুসফুস হয় সক্রিয়। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন শিশুর ফুসফুস তৈরি হলেও তখন সেটি থাকে নিষ্ক্রিয়। কারণ মাতৃগর্ভে সন্তানের ফুসফুসে বাতাস ঢোকে না বা ঢুকতে পারে না।

নবজাতকের পরিচর্যা

জন্মের পর কান্নার সঙ্গে সঙ্গেই বাতাস ফুসফুসে ঢোকে এবং সেখানে শরীরের রক্তে অক্সিজেন যুক্ত হয়। একইসঙ্গে রক্ত থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড বাতাসে চলে আসে। জন্মের পরপরই কান্নার মাধ্যমে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশ না করলে শিশুর শরীরে ধীরে ধীরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয় এবং রক্তে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ ক্রমশ বাড়তে থাকে। নবজাতকের গায়ের রং নীল বর্ণ ধারণ করে। তখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হলে শিশুর মারাত্মক পরিণতি হতে পারে।

নবজাতকের পরিচর্যা

নবজাত শিশুর পরিচর্যা

  • জন্মের পর নবজাতকের শরীর ভালোভাবে পরিষ্কার করে, তাকে মায়ের কাছে (মায়ের প্রসব কষ্ট কাটিয়ে ওঠার পর) দেওয়া উচিত। মায়ের স্পর্শে শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে, মায়ের ত্বকের সংস্পর্শে মা ও শিশুর মধ্যে নিবিড়তা গড়ে ওঠে। তাই প্রত্যেক মায়ের উচিত নবজাত শিশুর পরিচর্যা নিজের হাতে করা। এতে করে মায়ের নিজের ওপর আস্থা বাড়ে এবং মা ও শিশুর সম্পর্ক প্রগাঢ় হয়। এতে পরনির্ভরতা কমে।
  • নবজাত শিশুকে বাইরের লোকের সংস্পর্শে যত কম আনা যায়, ততই তার পক্ষে ভালো।
  • যে শিশুর ওজন ৪ পাউন্ড বা তারও কম হয়, তাকে তাপ নিয়ন্ত্রণ বাক্সে (ইনকিউবেটর) রাখার প্রয়োজন হয়। কেননা কম ওজনের শিশুর তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম থাকে।
  • বাইরে থেকে ঘুরে আসা জামাকাপড়ে কখনোই শিশুকে কোলে নেওয়া, দুধ খাওয়ানো বা আদর করা উচিত নয় ।
  • শিশুর পরিচর্যার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যেমন- গোসলের পাত্র, সাবান, তোয়ালে ইত্যাদি আলাদা থাকা প্রয়োজন।
  • জন্মের পর শিশুর শরীরের তাপমাত্রা, দেহের রং, শ্বাসের গতিপ্রকৃতি এবং নাভির উপর বিশেষ লক্ষ রাখা প্রয়োজন।

People Children 449 1 নবজাতকের পরিচর্যা

নবজাত শিশুর শরীরের তাপমাত্রা

  • যে শিশু ৬ থেকে ৮ পাউন্ড ওজন নিয়ে জন্মায়, তার দেহের তাপ সমতা রাখার জন্য তেমন চিন্তার কোনো কারণ নেই। স্বাভাবিক পরিচর্যায় সেই তাপ সমতা রক্ষা করা যায়।
  • শিশুকে অতিরিক্ত কাপড় বা মোটা ভারী কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখা উচিত নয়। কারণ, এতে তার শরীরের স্বাভাবিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং সে নিজেও অস্বস্তিবোধ করে।
  • শীতের দিনে অনেক সময় গায়ে যথেষ্ট গরম জামাকাপড় থাকা সত্ত্বেও শিশুর হাত-পা স্বাভাবিক অবস্থায় ঠান্ডা থাকে। সেই অবস্থায় তাকে আরও বেশি জামাকাপড় পরানোর প্রয়োজন নেই। তবে যদি দেখা যায়, শিশুর মুখের রং বিবর্ণ হয়ে পড়েছে বা সে অস্বস্তিবোধ করছে, তাহলে বুঝতে হবে- সে শীতে কাতর হয়ে পড়েছে।

People Children 444 1 নবজাতকের পরিচর্যা

 

নবজাত শিশুর ত্বকের পরিচর্চা

  • জন্মের পর নবজাতকের ত্বক সাধারণত লাল বা গোলাপি বর্ণের হয়ে থাকে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে লাল বর্ণের পরিবর্তে জায়গায় জায়গায় নীল বর্ণ দেখা যায়। এটা অনেক সময় প্রসবকালীন অবস্থা বা অন্য কোনো কারণে (যেমন- নবজাতকের গলায় যদি নাভির ২/৩টি প্যাঁচ থাকে) হয়ে থাকে এবং অল্প সময়ের মধ্যে তা মিলিয়ে যায় ।
  • অনেক সময় জন্মের ৪৮ ঘণ্টা পর থেকে শিশুর ত্বক, চোখ ও প্রস্রাবের রং হলুদ হয় । নবজাতকের জন্ডিস বা পাণ্ডু হওয়ার জন্যই সাধারণত এটি ঘটে । এরূপ অবস্থায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত ।
  • জন্মের কিছু সময় পর কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল বা গা মুছিয়ে দেওয়া যায়। গোসলের পর নরম তোয়ালে দিয়ে গা মুছিয়ে হালকা কাপড় পরানো ভালো। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, নবজাতকের ত্বক ও নাভির মাধ্যমে রোগ সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এ বিষয়ে মায়ের বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

People Children 445 1 নবজাতকের পরিচর্যা

জন্মের পর নবজাতক যদি শ্বাসগ্রহণ করতে না পারে

  • জন্মের পরপরই নবজাতক যদি না কাঁদে, শ্বাসগ্রহণে সক্ষম না হয় অথবা নীল হয়ে যায়, তাহলে যথাশিগ্‌গির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া একান্ত জরুরি। কেননা, নবজাতক যত দেরিতে কাঁদবে, তত তার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং ক্ষতি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ক্ষতি হয় অপূরণীয়।
  • শিশুর জন্ম যদি হাসপাতাল বা মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোথাও হয়, তাহলে সেসব ক্ষেত্রে নবজাতককে তাড়াতাড়ি নিকটতম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই ভালো।
  • আশেপাশে যদি হাসপাতালে বা চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা না থাকে সেক্ষেত্রে নবজাতককে একটি ট্রে বা অন্য কোনো পাত্রে রেখে পায়ের দিক সামান্য উঁচু করে শুইয়ে দিতে হবে। তারপর নরম পরিষ্কার কাপড়, তুলা বা গজ দিয়ে নবজাতকের নাক, মুখ, গলা পরিষ্কার করে দিতে হবে।
  • কাপড় বা তুলার সাহায্যে গলা ও নাকের শ্লেষ্মা পরিষ্কার করে নাকে সুড়সুড়ি দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া শরীরের সংবেদনশীল স্থানগুলো (যেমন – মুখ, কান, গুহ্যদ্বার ইত্যাদি) অনবরত কুসুম গরম ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিতে হবে। এসব প্রক্রিয়ার সাহায্যে শিশু হঠাৎ গভীরভাবে শ্বাস নেয় এবং ক্রমে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে থাকে ।
  • উপরের ব্যবস্থা অনুযায়ী যদি কোনো সুফল না পাওয়া যায়, তাহলে শিশুর মুখে আপনার মুখ রেখে জোরে জোরে ফুঁ দিতে হবে প্রতি মিনিটে ১৮ থেকে ২৫ বার। নবজাত শিশুর শ্বাস ক্রিয়া চালানোর পক্ষে এ পদ্ধতি খুব কার্যকর ।

তারপর নবজাত শিশুকে অবশ্যই কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে বা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

নবজাত শিশুর নাভির পরিচর্যা

  • নবজাতকের জন্মের পর তার নাভির বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন ।
  • প্রতিদিন কমপক্ষে দুবার স্পিরিট দিয়ে নাভি পরিষ্কার করা যেতে পারে।
  • কোনোরকম পাউডার নাভিতে লাগানোর প্রয়োজন নেই। জন্মের ২ থেকে ৪ ঘণ্টা পর লক্ষ রাখতে হবে নাভি থেকে রক্তপাত হচ্ছে কি না। এ সময়ে নাভিবন্ধনি ঢিলে হলে রক্তক্ষরণ হতে পারে। রক্তক্ষরণ হলে এ সময় সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
  • সাধারণত নাভির উপরের অংশ এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে খসে পড়ে। তবে কোনো কারণে দূষিত বা ঘা হলে বেশি সময় লাগতে পারে। কখনো কখনো দেখা যায়, নাভির মুখ স্বাভাবিকভাবে খসে পড়ার পর ঘা সারতে দেরি হয়। এ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত ।
  • শিশুকে গোসল করানোর সময় নাভিমূল ঢেকে রাখা ভালো। তা না হলে গোসলের পানির মাধ্যমে নাভিমূল জীবাণু সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • ব্যান্ডেজ জাতীয় কোনো জিনিস নাভিতে না বাঁধা ভালো।

 

নবজাত শিশুর চোখের পরিচর্যা

  • জন্মের পর থেকেই নবজাতকের চোখ বন্ধ থাকে। জোর করলে চোখ আরও বন্ধ করে রাখে।
  • স্বাভাবিকভাবে প্রথম দিন থেকেই নবজাত শিশু দেখতে পারে এবং অনেক সময় শিশু আলোকরশ্মির অনুসরণ করে।
  • জন্মের পরেই যদি শিশুর চোখ লাল হয়ে ওঠে, চোখে পিচুটি পড়তে থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত ।
  • স্বাভাবিক অবস্থায় জন্মের পর প্রথম কয়েক দিন হালকা গরম পানিতে তুলা ভিজিয়ে চোখ দুটো পরিষ্কার করে বা মুছে দিলে ভালো হয়। আর চোখ লাল হলে বা পিচুটি পড়লে একই তুলাতে দু-চোখ পরিষ্কার করা উচিত নয়। তাতে এক চোখ সংক্রমিত হলে অপরটির সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। আর চোখ দিয়ে অবিরত পানি পড়লে, সেক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
  • যদি শিশুর চোখে কিছু অস্বাভাবিক লক্ষণ, যেমন- চোখের মণির (কর্নিয়া) উপর সাদা দাগ, চোখ অস্বাভাবিক বড়ো হওয়া, হঠাৎ ট্যারা হয়ে যাওয়া প্রভৃতি দেখা দেয় তবে এসব ক্ষেত্রে সময়মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত ।
  • নবজাতকের চোখে কাজল লাগাতে অনেকেই পছন্দ করেন। কাজল লাগিয়ে চোখের সৌন্দর্য বাড়ানোর আগে ভেবে দেখুন, কাজল জিনিসটি কী। আসলে আগুনে কাপড় পোড়ানো কালি আর তেল মিশিয়ে হয় কাজল। চোখের জন্য এসব কোনোটাই ভালো নয়। বাড়িতে বানানো বা বাজারের কেনা কাজল কোনোটাই ব্যবহার করা ঠিক নয়। মানুষের কুনজর যাতে আপনার নবজাতকের উপরে না পড়ে সেজন্য তার শরীরের যে-কোনো জায়গায় কাজলের ফোঁটা দেন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কারো পরামর্শে নবজাতকের চোখে ওষুধ ব্যবহার না করা ভালো।

 

নবজাত শিশুর নাক ও মুখ

  • শিশুর নাকের ভেতরে যে সূক্ষ্ম লোম থাকে, সেগুলো ধুলাবালি নাকের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। ফলে ধুলাবালি নাকের সামনের অংশে জমা হয়। আবার সর্দি হলে তা নাকের ভেতরে জমতে থাকে। তাই তুলা বা কটন বাড দিয়ে সাবধানে নাকের ছিদ্র নিয়মিত পরিষ্কার করা ভালো।
  • নাক ভালোভাবে পরিষ্কার না করলে, অনেক সময় শিশুর স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসে অসুবিধা হয়।
  • মুখের ভেতরের মসৃণ ত্বক, তালু প্রভৃতি ভালোভাবে দেখা উচিত এবং কোনোরকম অসুবিধা হলে যথাসময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

 

নবজাত শিশুর কানের পরিচর্যা

  • শিশুকে গোসল করানোর সময় তুলা দিয়ে কান বন্ধ রাখা উচিত।
  • মাঝে মাঝে কটন বাড দিয়ে সাবধানে কানের বাইরের অংশ পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তবে কখনো কানের ভেতর কোনোকিছু দিয়ে পরিষ্কার করা উচিত নয়। কারণ, শিশুর কানের পর্দা বড়োদের তুলনায় সামনের দিকে এগিয়ে থাকে এবং সামান্য আঘাতে পর্দার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • কানের ভেতরে কোনো তেল দেওয়া উচিত নয় ।

নবজাতকের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি

সুস্থ স্বাভাবিক নবজাতক প্রায় সারাদিনই ঘুমিয়ে থাকে। শুধু খাওয়ার সময় হয়তো একটু চোখ খুলতে পারে। অনেক সময় মায়ের দুধ চুষে খাওয়াটাই তার জন্য এত পরিশ্রমের কাজ হয়ে দাঁড়ায় যে, পুরো দুধ না খেয়েই সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে । জেগে থাকা অবস্থায় সুস্থ নবজাতক হাত-পা গুটিয়ে থাকে অথবা ছোড়াছুড়ি করে। শিশু সুস্থ হলে তার কতকগুলো স্বাভাবিক অভিব্যক্তি বা Reflex থাকে।

সাধারণত ৩/৪ মাস বয়সের দিকে এসব অভিব্যক্তি চলে যায়। এসব অভিব্যক্তি খুব মনোযোগের সঙ্গে এবং ভালোভাবে নিজের শিশুর ক্ষেত্রে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। নিচে কিছু অভিব্যক্তির বর্ণনা দেওয়া হলো :

  • ঠোঁটের খুব কাছে বা ঠোঁটের উপর আলতোভাবে আঙুল রাখলে দেখতে পাবেন শিশু চোষার ভঙ্গি করে, যেন সে কিছু চুষে খাচ্ছে বা খেতে চাচ্ছে।
  • শিশুর মুখে কোনো খাবার দিলে তা সে গিলতে চেষ্টা করে।
  • শিশুর হাতের তালুতে আঙুলের কাছাকাছি কিছু রাখলে (যেমন পেনসিল, কলম বা আপনার আঙুল) সে তার আঙুল দিয়ে চেপে ধরবে। ঠিক তেমনি পায়ের আঙুল দিয়েও চেপে ধরবে।
  • শিশুর সামনে হঠাৎ কোনো শব্দ করলে অথবা শরীর থেকে হঠাৎ কাপড়টা সরিয়ে নিলে, প্রথমে সে দুহাত এবং দুই পা বাইরের দিকে প্রসারিত করে পরক্ষণেই ভেতরের দিকে নিয়ে আসবে- যেন সে কাউকে জড়িয়ে ধরতে চাচ্ছে এবং পরক্ষণেই চিৎকার করে কেঁদে উঠবে।
  • নবজাত শিশুকে দুই বগলের নিচে ধরে তাকে দাঁড় করাতে চেষ্টা করলে প্রথমে সে দাঁড়াতে চাইবে এবং পরে এক পা বাড়িয়ে সামনে এগোতে চাইবে ।

তাছাড়া, আরও কিছু অভিব্যক্তি রয়েছে। তবে উল্লিখিত অভিব্যক্তিসমূহ কোনো নবজাতকের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকলে, তা অবশ্যই উদ্‌বেগের কারণ। তখন দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র অথবা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

নবজাতক সারাক্ষণই চোখ বন্ধ করে রাখতে পারে। এমনকি চোখ খুললেও অনেক সময় তার চোখ ট্যারা বলে মনে হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে তা নয়। জন্মের পরপরই নবজাতক দেখতে পায় এবং হঠাৎ চোখে আলো পড়লে চোখ কুঁচকে বন্ধ করে ফেলে অথবা কেঁদে ওঠে। তা সত্ত্বেও, কোনো বস্তুর দিকে সে তার দৃষ্টি স্থিরভাবে নিবদ্ধ করতে না পারার জন্য অনেক সময় চোখ ট্যারা বলে মনে হয়।

একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, নবজাতক কাঁদলে সাধারণত চোখের পানি বের হয় না। তবে চোখ ও নাকের সংযোগকারী নালি বন্ধ থাকলে চোখে পানি জমা হতে পারে।

জীবনের প্রথম থেকেই স্বাদ সম্বন্ধে সে ওয়াকিবহাল থাকে। ব্যথার অনুভূতি তার অত্যন্ত সংবেদনশীল। ঠান্ডা ও গরমের পার্থক্য সে সহজেই বুঝতে পারে। তাছাড়া, জন্মের পর থেকে নবজাতক শুনতেও পায়।

নবজাতকের প্রস্রাব-পায়খানা

  • জন্মের পর নবজাতক সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম প্রস্রাব করে। তবে অনেক সময় ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সে প্রস্রাব করতে পারে, যা হয়তো কারো চোখেই পড়ে না। সেক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার ভেতর সে আর প্রস্রাব নাও করতে পারে।
  • শিশু যদি ঠিকভাবে খায়, বিশেষ করে মায়ের দুধ, তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রস্রাব না করলেও, উদ্ধৃবিঘ্ন না হয়ে আরও কয়েক ঘণ্টা (৪/৫ ঘণ্টা) অপেক্ষা করা যেতে পারে। এ সময়ের মধ্যে প্রস্রাব না হলে, অবশ্যই শিশুকে হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অথবা কোনো চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
  • জন্মের পর কয়েকবার (২/৩ বার) নবজাতক লালচে রঙের প্রস্রাব করতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই। তবে দুই তিনবারের বেশি লালচে প্রস্রাব হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • নবজাতকের প্রথম পায়খানা কালচে ও সবুজ হতে পারে। কালো পায়খানার কারণ হচ্ছে মিকোনিয়াম। জন্মের প্রথম তিন-চার দিনের মধ্যে সাধারণত পায়খানা এভাবে চলে যায়। শিশু শুধু মায়ের দুধ খেলে দৈনিক ৫/৬ বার পায়খানা করতে পারে। কিন্তু টিনের গুঁড়ো দুধ খেলে সাধারণত ৩/৪ বারের বেশি পায়খানা করে না।

নবজাতকের জন্ডিস

নবজাতক শিশুর রং প্রায় হলুদ বর্ণ হলে বলা হয় জন্ডিস হয়েছে। নবজাতকের জন্ডিস বলতে আমরা সাধারণত ফিজিয়োলজিক্যাল জন্ডিসকেই বুঝি। জন্ডিসের গুরুত্ব হলুদ বর্ণের তীব্রতা ও কারণের ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় জন্মের ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হলদে বর্ণ ধারণ করে এবং ৫-৭ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। সেজন্য চিন্তার কোনো কারণ নেই। কখনো কখনো আবার মাতৃদুগ্ধে পালিত শিশু ৪ থেকে ৭ দিনের মধ্যে মোটামুটি রকমের হলুদ বর্ণের হয়। সেক্ষেত্রেও চিন্তার কোনো কারণ নেই।

নবজাতকের জন্ডিস হলে কী করবেন

নবজাতকের জন্ডিস হলে প্রথমেই বাবা-মাকে ধৈর্যধারণ করতে হবে। এটি কোনো বংশগত বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। এটা আপনা-আপনি সেবে যায়। এ অবস্থায় শিশুকে প্রতিদিন সকালে ১০-১৫ মিনিট করে ২/৩ বার রোদে রাখুন। ঘরের মধ্যে কাচের জানালা দিয়ে যে রোদ আসে সেখানে রাখলে ভালো হয়। এ সময় শিশুর মাথা ছায়ায় রাখতে হবে অথবা মাথায় যেন রোদ না লাগে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। রোদে থাকাকালীন কয়েকবার শিশুকে এপাশ-ওপাশ ও উপুড় করে দিতে হবে। এ সময় নবজাতকের শরীরে পুষ্টি ও পানির চাহিদা বেড়ে যায়। তাই তাকে বেশি করে বারেবারে মায়ের দুধ ও ফুটানো পানি ঠান্ডা করে খাওয়াতে হবে।

  • যদি দুই তিন দিনের মধ্যে ত্বকের হলুদ বর্ণ বা জন্ডিসের মাত্রা না কমে অথবা প্রথম থেকেই যদি ত্বকের হলুদ বর্ণ বেশি হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • জন্ডিসের মাত্রা বেশি হলে প্রয়োজনে নবজাতককে হাসপাতালে ভর্তি করে ফটোথেরাপি দিতে হবে।
  • ফটোথেরাপি বর্তমানে সবচেয়ে নিরাপদ এবং কার্যকর চিকিৎসা। এর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা (কারো কারো ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টা)-র মধ্যে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা (অর্থাৎ জন্ডিস) কমানো সম্ভব।
  • শিশুকে একনাগাড়ে ৪৫ মিনিট ফটোথেরাপি ইউনিটে এবং পরবর্তী ১৫ মিনিট বিছানায় বা কোলে বিশ্রামে রাখতে হবে। বিশ্রামের সময়েই তাকে খাওয়াতে হয়। ফটোথেরাপি চলাকালীন নবজাতকের চোখ ও ছেলেদের ক্ষেত্রে জননাঙ্গ পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। নতুবা চোখ ও লিঙ্গের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • লক্ষ রাখতে হবে ফটোথেরাপি চলাকালীন শিশুর ত্বকের বেশিরভাগ অংশ যাতে আলোতে আনা যায়, সেজন্য শিশুকে একটু পরপর এপাশ-ওপাশ ও উপুড় করে দিতে হবে।
  • চিকিৎসা চলাকালীন মায়ের দুধের পাশাপাশি তাকে পানি খাওয়াতে হবে। আলাদাভাবে পানি খাওয়ানোর প্রয়োজন আছে কি না, এ ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • যদি মায়ের রক্তের গ্রুপ আর এইচ নেগেটিভ এবং বাবার আর এইচ পজিটিভ হয়, সেক্ষেত্রে নবজাতকের জন্মের আগে চিকিৎসককে অবশ্যই তা জানিয়ে রাখতে হবে। জন্মের পরপরই নবজাতককে অবশ্যই কোনো শিশু রোগের চিকিৎসককে দেখাতে হবে।

নাভি থেকে রক্তক্ষরণ বা নাভিতে সংক্রমণ

  • নাভি কাটার পর প্রতিদিন স্পিরিট দিয়ে নাভি পরিষ্কার করতে হয়। কোনোরকম পাউডার নাভিতে লাগানোর প্রয়োজন নেই।
  • জন্মের কিছু সময় পর লক্ষ রাখতে হবে, নাভি থেকে রক্তপাত হচ্ছে কি না। কারণ এ সময় নাভিবন্ধনি ঢিলে হলে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এ অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত ।
  • সাধারণত নাভির উপরের অংশ ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে খসে পড়ে। তবে কোনো কারণে দূষিত বা ঘা হলে বেশি সময় লাগতেও পারে। কখনো কখনো দেখা যায় নাভির মুখ স্বাভাবিকভাবে খসে পড়ার পরও ঘা সারতে দেরি হয়। এ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
  • শিশুকে গোসল করানোর সময় নাভিমূল ঢেকে রাখা উচিত। তা না হলে গোসলের পানির মাধ্যমে নাভিমূল জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অপরিণত ও কম ওজনের শিশু

নবজাতক শিশুর অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো নির্দিষ্ট সময়ের আগে মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়া কিংবা শিশুর জন্মকালীন ওজন কম হওয়া। জন্ম সময়ের ওজন যদি সাধারণত ২৫০০ গ্রাম কিংবা তার কম হয়, তবে তাকে কম ওজনের শিশু (Low birth weight baby) বলা হয় ।

কী করণীয়

এ ধরনের শিশুকে অবশ্যই চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

সাধারণত শিশুর পরিচর্যার দায়িত্ব হয় মা অথবা ঘনিষ্ঠ পরিজন কিংবা ধাত্রীর ওপর ন্যস্ত থাকে। যিনিই পরিচর্যা করুন, শিশু পরিচর্যার প্রাথমিক জ্ঞান তার থাকা ও ধৈর্যশীল হওয়া একান্ত প্রয়োজন। প্রতিটি শিশু অন্য শিশু থেকে সব ব্যাপারে আলাদা। এ প্রাথমিক জ্ঞান শুশ্রূষাকারিণীর থাকা একান্তই দরকার। শিশুর সঠিক পরিচর্যার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর সাধারণত লক্ষ রাখা উচিত ৷

  • শিশুকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা এবং প্রয়োজনীয় পারিপার্শ্বিক অক্সিজেন, তাপ ও আর্দ্রতার ব্যবস্থা করা।
  • জীবাণুমুক্ত খাদ্য এবং খাওয়ানোর সুষম ব্যবস্থা করা।
  • রোগ নির্ণয়ের সুযোগসুবিধা থাকা সম্ভাব্য নতুন উপসর্গ সম্বন্ধে সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং সূচনায়ই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদি।
  • যে চিকিৎসাকেন্দ্রে শিশু পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকে, সেখানে স্থানান্তরিত করার জন্য প্রয়োজনমতো প্রস্তুতি রাখা।

বিশেষত বেশি অপরিণত শিশুর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সঠিক আবহাওয়া ও সঠিক তাপমাত্রা একান্ত প্রয়োজন। তাপমাত্রা ৩৪-৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা ৯০-৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ও আর্দ্রতা শতকরা ৬০ ভাগ থাকা প্রয়োজন । গ্রীষ্মকালে আমাদের দেশে এই আবহাওয়া ও আর্দ্রতা থাকা কোনো ব্যাপার নয়। প্রাকৃতিক আবহাওয়াই ওই তাপ ও আর্দ্রতা সৃষ্টি করে। শীতকালে অবশ্য বাড়তি তাপ সঞ্চারের প্রয়োজন হয়। শিশুকে ইনকিউবেটরে (যেখানে ওই আর্দ্রতা ও তাপ সৃষ্টি করা যায়) অথবা বাইরে বিছানার তলায় গরম পানির বোতল ব্যবহার করে এবং তুলোর হালকা ও উষ্ণ জামা পরিয়েও তাপ সৃষ্টি করা যায়। অধিক অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ইনকিউবেটরে থাকে। বাইরে অবশ্য মুখোশ বা নলের সাহায্যে দেওয়া হয়।

জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে স্তন্যপান করানো উচিত। তবে শিশুকে খাওয়ানোর সময় লক্ষ রাখতে হবে তার চোষা ও গেলার ক্ষমতা ঠিকমতো আছে কি না। যদি চোষা বা গেলায় অসুবিধা থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নলের সাহায্যে নবজাতককে দুধ দিতে হবে।

নবজাতকের বাঁকাত্যাড়া মাথা

শিশু জন্মের সময় বাঁকাত্যাড়া মাথা নিয়ে জন্মানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। শিশু জন্মাবার সময় তার মাথার যে অংশটি জন্মনালির পথে (Birth passage) অনেকক্ষণ থাকে সেখানে নরম ধরনের ফোলা অংশ দেখা যায়। তবে এই ফোলাটি কয়েক দিনের মধ্যে একেবারে চলে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ক্যাপুট সাকসিডেনিয়াম।

তা ছাড়াও আরও এক ধরনের ফোলা নবজাতকের মাথায় দেখা যায় যাকে বলা হয় কেফাল হেমাটমা। জন্মের সময় মাথায় আঘাত লাগলে সেখানে রক্ত জমে সাধারণত এটি হয়। তবে কেফাল হেমাটমা নিয়ে কোনোরকম উদ্‌বেগের প্রয়োজন হয় না। কারণ জন্মের দুই থেকে বারো সপ্তাহের মধ্যে এটি একেবারে মিলিয়ে যায়। তবে কখনো কখনো ঐ জায়গাটি সামান্য উঁচু হয়ে থাকে। এ অবস্থায় শিশু চিকিৎসক বা শিশু শল্যচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

Leave a Comment