শিশুর প্রত্যক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ | শিশুর মন ও শিক্ষা

শিশুর প্রত্যক্ষণ ও শিশুর পর্যবেক্ষণ : পাঁচটি বাইরের ইন্দ্রিয় ও একটি ভিতরের (মন) এই ছয়টি ইন্দ্রিয়। শত শত বিষয় এই ইন্দ্ৰিয় পথে আমাদের মনোযোগের জন্যে অনবরত হানা দিচ্ছে। সব আমরা দেখি শুনি না। মনোযোগ দেই না। আমাদের বেলায় যেমন শিশুর বেলাতেও তেমনি। বাইরের উদ্দীপকের জন্যে এবং ভিতরের মনোভাবের কারণে আমাদের দেখা-শোনা জানা-চেনার জগৎ তৈরি হয়। উদ্দীপকের তীব্রতা, প্রসার, নতুনত্ব, স্থায়িত্ব, স্পষ্টতা, প্রসন্নতা পুনঃ পুনিকতা ইত্যাদি আমাদের ইন্দ্রিয়কে টেনে ধরে। বাধ্য হয়েই যেন দেখতে শুনতে হয়। আবার আগ্রহ, আনন্দবোধ, প্রবণতা, প্রতীক্ষা, প্রয়োজনবোধ, অনুশীলিত মানসিকতা, ব্যাগ্রতা ইত্যাদি ভিতর থেকে প্রত্যক্ষকে চালিত করে।

[ শিশুর প্রত্যক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ]

শিশুর প্রত্যক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ

শিশুর জগৎ একটা জটিল বিশৃঙ্খল তালগোলপাকানো অস্পষ্ট হরিবোলের জগঝম্প হ য ব র ল নয়। প্রথম থেকেই সে এই পরিবেশের মধ্যে সংগঠন, একটা পটভূমির সঙ্গে বিষয়ের সংলগ্নতা টের পায়। টের পেতে থাকে। মস্তিষ্কের মধ্যে থাকে একটা নিউরোন সংগঠন। বাইরের জগতে থাকে উপাদানগত সংগঠন। আনুরূপ্য-বৈপরিত্যের অনুভব। শিশু যা দেখে শোনে তা শিশুর কাছে স্বতন্ত্র দাবি রাখে বলেই দেখে শোনে। অথবা শিশু সেই সেই বিষয় বা বস্তুকে দেখতে চায় বলেই দেখে শোনে। বাইরেটা এবং ভিতরটা সমানভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর প্রত্যক্ষকে গড়ে তুলতে, তার পর্যবেক্ষণকে পথ দেখাতে এই বিষয়টি মা বাবার মনে রাখা দরকার। ছাত্রজীবনে (এবং বাকি জীবনেও) সন্তানের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ তার বুদ্ধিকে এবং বুদ্ধি মনোভাব তার প্রত্যক্ষ-পর্যবেক্ষণকে প্রভাবিত করে। করবে।

বিশাল বিস্তৃত পরিবেশ থেকে শিশু যা দেখে তা প্রয়োজনের নিরিখেই দেখে। আর তার মনোযোগ অনেকটা যেন ছাঁকনির মতো, filter এর মতো, হেঁকে বেছে তাকে দেখতে সাহায্য করে। তাহলে বলতেই হয় যে শিশুর মনে প্রয়োজন বোধটা জাগিয়ে তুলতে হবে এবং মনোযোগের ছাঁকনিটাকে যথাসম্ভব উঁচ মানে বেঁধে দিতে হবে। কি ভাবে? (করণীয়) :

 

১. বেড়াতে যাবার সময়—বৈকালিক অথবা আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে। স্থির দৃশ্য অথবা চলমান পরিবর্তিত দৃশ্য। শিশু প্রশ্ন করবে। তার প্রশ্ন ধরে ধরে তার মনকে আরও পর্যবেক্ষণে টেনে নিয়ে যান। Background foreground, পটভূমি-সামনের জমি, প্রসারিত ক্ষেত্র আর সেই ক্ষেত্রের মধ্যের উপাদান প্রত্যক্ষ করতে শেখান। গরু, ছাগল, ঘোড়া, গাধা, শালিক। একরূপতা বৈপরিত্য বোঝান। এক শ্রেণী, বিষম শ্রেণী বোঝান।

২. বৃহৎ (macro) ও ক্ষুদ্র (micro) প্রত্যক্ষ দেখিয়ে দিন। সংশ্লেষক এবং বিশ্লেষক। সমগ্র আর উপাদান। একই Frame এর মধ্যে, দৃষ্টি-ক্ষেত্রের মধ্যে, দুরকমই আছে, থাকে। এটা জেনে যাবে। ফলে যখন বই পড়বে, অংক করবে তখন লাভ ধরা পড়বে। সমগ্রকেও দেখতে শিখবে আবার অংশ অংশ উপাদানকেও চিনে নেবে। পাঠ্য বিষয়ের সব এলাকাতেই বিচরণ সহজ হবে। মনে রাখা সহজ হবে।

৩. বস্তু প্রাণী ও বিষয়কে শ্রেণীকরণ করতে শেখান। সাহায্য করুন। প্রত্যেক একক বস্তু ইত্যাদির মধ্যে বা সঙ্গে সঙ্গেই একটা সামান্য যুক্ত আছে। একেই শ্রেণী বলেছি। (দার্শনিকেরা সামান্য প্রত্যক্ষ নিয়ে তর্ক করুন। আমরা সামান্যকে প্রত্যক্ষ করতে শিখলেই চলবে। ‘গরু’ সামান্য বা সাধারণ নাম। ধবলী, কালী, মঙ্গলা (দুধ মঙ্গলার দুয়েছে প্রসন্ন ইত্যাদি বঙ্কিম উক্তিতে মঙ্গলা এবং প্রসন্ন বিশেষ) নামের গাভীগণ প্রত্যেকেই বিশেষ।

তেমনি পাখি, গাছপালা, শিশু, মানুষ, ট্রেন—সবই সামান্য। শিশুরা প্রত্যক্ষের নিজের নিয়মেই এই সামান্যীকরণ শিখবে। আমরা সচেতনভাবে তাকে সহজ এবং দ্রুত করে দিতে পারি। ছাত্রাবস্থায় সবিশেষ কাজে লাগবে। ক্রমান্বয়ে সংগ্রহ ও সাঙ্গিকরণ (assmilation and accommodation: Piaget) চলতে থাকবে। ফলে বৌদ্ধিক প্রতিযোজনা বেড়ে যাবে (Adaptation. : a)

৪. একটি প্রত্যক্ষের বিষয়কে যতো বেশি ইন্দ্রিয় দিয়ে পাওয়া যায় ততো বেশি আপন হয়। মনে ধরা থাকে। চোখে দেখা জিনিসকে ছুঁয়ে দেখতে চায়, নেড়েচেড়ে দেখতে চায়। ছোটবেলায় তো মুখে পুরে দিয়ে বা জিভ্ দিয়ে চেটে না দেখলে যেন স্বস্তি পায় নি। বাধা না দিয়ে সুযোগ দিন। যদি তেমন জিনিসপত্র যা ওরা হাত দিলে নষ্ট হতে পারে অথবা ফেলে টেলে দিতে পারে, তাহলে আপনারা সাবধান থেকে এবং সন্তানকে সাবধান হতে বলে হাত দিতে দিন। অপুরিত কামনা বাসনা অনেক অকারণ সংঘাতের এবং বিপন্নতার কারণ হতে পারে। (এ বিষয়ে Freud এর বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নয়। পরে আছে)।

৫. চাক্ষুস প্রত্যক্ষ প্রাথমিক। স্পর্শ ইত্যাদি পরের ঘটনা। ৫ বছরের মধ্যে দৃষ্টি প্রত্যক্ষ চূড়ান্ত পর্যায় পায়। স্পর্শ (নাড়া ঘাঁটা) ৫-৮ বছরে সব থেকে বেশি হয়। কাজেই ছেলেমেয়েদের চাক্ষুস প্রত্যক্ষ যথাসম্ভব বাড়াতে চেষ্টা করবেন। সচেতন ভাবেই এটা করবেন। এবং স্পর্শ প্রত্যক্ষও। বস্তু বা বিষয়ের প্রতিরূপ গঠনে, ধারণা তৈরি করতে দৃশ্য প্রত্যক্ষ তুলনাহীন। ছবি আঁকা শেখান।

দৃশ্যমান এলাকার বিষয়গুলির পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝিয়ে দিন। খবরের কাগজের ছবি, বই, ফটো ইত্যাদির সাহায্য নিন। সামনের জিনিস বড়, পিছনের জিনিস ক্রমশঃ ছোট হয়ে দেখা দেয়। বুঝিয়ে দিন। (আমার এই লেখার টেবিলের বাঁ দিকে জানলা। দোতলা। জানলার বাইরে। ১৫০ ফুট দূরে একটা খেজুর গাছ। গাছটি ৪৫ ফুট মতো উঁচু। একেবারে কাছে, ১০ ফুট দূরে, একটি আম গাছ। ২০ ফুট উঁচু। জানলাটি ৫ ফুট খাড়াই দিকে। আমি দেখছি। আমগাছের মাথা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু খেজুর গাছটি জানালার মাঝ বরাবর উঁচু। অর্থাৎ গোড়া (দেখা যাচ্ছে) থেকে ডগা পর্যন্ত খেজুর গাছটি জানালার ফাঁকে ১ ফুট ৩ ইঞ্চি মতো জায়গা নিয়েছে মাত্র।

আবার ঐ সব ছবিটা যদি আমার চোখের মণিতে যেমন পড়েছে তেমন বর্ণনা করা যায় তাহলে রেটিনার দেয়ালে এক বর্গমিমি মতো হবে না। ক্যামেরাতে হলে যেমন ফিল্মের আকার হবে তেমন হবে। এই রকম ব্যাপারগুলো সন্তানের বয়স অনুযায়ী ভাষায় এবং ধারণায় বুঝিয়ে দিলে তারা প্রতিরূপ গঠনে সাহায্য পাবে)। ছবি আঁকার সময় সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করবে। পরে যখন জ্যামিতি এবং ভূগোল, ইতিহাস এবং বিজ্ঞান পড়বে তখন অসীম সহায়তা পেয়ে যাবে। অংকের বেলাতেও।

প্রত্যক্ষ এবং পর্যবেক্ষণ থেকেই, আপনা আপনিই, ধারণার জগৎ তৈরি হয়, চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে, সরল ও জটিল ধারণা ও সম্পর্কের সমস্যা ভাবতে পারে, সমাধানের পথ খুঁজে নিতে পারে। আমাদের স্কুলব্যবস্থায় এই ধারণার উন্নতির প্রক্রিয়াই প্রধান। একটা কথা বলা দরকার। ছাত্রছাত্রীর গুণমান যে স্তরের, পর্বের বা বয়সের, ধারণা এবং সমস্যা যদি সেই স্তর ইত্যাদির যোগ্য না হয় তাহলে সমাধান করতে পারবে না, আগ্রহ নষ্ট হবে। বিফলতা বিফলতার জন্ম দেয়। মা-বাবা এবং শিক্ষক হুঁশিয়ার হলেই বিফলতা সাফল্যের পিলার তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন:

“শিশুর প্রত্যক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ | শিশুর মন ও শিক্ষা”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন