বয়ঃসন্ধির কাল ও মা-বাবার দায়

বয়ঃসন্ধির কাল ও মা-বাবার দায় – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” নিয়ে আজকের আলোচনা।

 

বয়ঃসন্ধির কাল ও মা-বাবার দায়

বয়ঃসন্ধির কাল ও মা-বাবার দায় | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

 

বয়ঃসন্ধি কি? সন্ধিতে যেমন পূর্ববর্ণ ও পরবর্ণ থাকে বয়ঃসন্ধিতে থাকে তেমনি একটি পূর্ব-স্তর অ-যৌন জীবন ও একটি পর-স্তর যৌন জীবন। বয়ঃসন্ধি বলতে তাই একটা স্তরবিন্যস্ত অবস্থা-অবস্থান্তর-গন্তব্যকে বোঝায়, শৈশবকালের কিছুটা এবং তরুণ কালের কিছুটাকে ঘিরে এই বয়ঃসন্ধির এলাকা। সমপাত-উপরিপাত বলা যায় । শৈশবের অ-যৌন অবস্থান থেকে জৈবমানসিক প্রক্রিয়া পরিবর্তনের ফলে যৌন অবস্থানে উদ্বর্তন এবং আরও জৈবমানসিক পরিবর্তন শৃঙ্খলের উদ্ঘাটনকে অ্যাডোলেসেন্‌স্‌ বা বয়ঃসন্ধি কাল বলা যায়। কৈশোরের অ-যৌন কিশলয় ক্রমঅন্বয়ে বয়ঃসন্ধি বা পিউবার্টি পার হয়ে পর্ণে পরিণত হয়।

প্রধানত জৈব অভিব্যক্তি; মানসিক উত্তরণ ঘটে অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে। তাই বিজ্ঞানী বলবেন বয়ঃসন্ধি হল দেহজ শ্রীবৃদ্ধির ও অগ্রসরণের সেই পর্যায় যখন যাবতীয় যৌন প্রকরণ ও দেহাঙ্গের পরিপূর্ণতা সন্তান ধারণ, পোষণ ও প্রসবের’ (ছেলেদের বেলায় শুধু প্রজননের) যোগ্যতা অর্জনমুখী হয়ে পূর্ণতা পায়। এই শারীরিক শ্রীবৃদ্ধি ও অগ্রসরণ মানসিক দিক থেকেও কৈশোরকে বিকাশশীল করে তোলে। ভিতর থেকে শরীর, ভিতর ও বাইরে থেকে মন। গ্রীক দার্শনিক আরিস্টটল তো মানসিক পরিবর্তন ও ব্যবহারিক পালাবদল বা ধারা বিকাশকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন।

নবযৌবনের নবোদ্ভিন্ন কৌমার কালে এরা আবেগবিহ্বল, সদাসশঙ্ক, ত্রস্ত, উৎসুক এবং উচ্ছ্বসিত থাকে। সঙ্গে সঙ্গে ফল্গু-প্রবাহ যৌন- অভীপ্সার কারণে এদের প্রতি অভিভাবকীয় নজরদারির দাবিটাও অনিবার্য হয়ে দেখা দেয় ৷ অভ্যন্তরীণ ভাঙ্গাগড়ার খেলায় আর জোয়ার ভাটার টানে এই সব কিশোর-কিশোরীরা নিজেরাই টের পেয়ে যায় যৌবনোদয়ের নবারুণ আলোকময়তা, টের পায় যে তারা নবদিগন্তের পথিক, তারা নবজীবনের দ্বারে সুস্বাগতম।

আর প্রতি পর্বের উপলব্ধ শিহরণের সঙ্গে সঙ্গে টের পায় নতুন করে প্রতিযোজনের প্রয়োজনীয়তা, সামাজিক-পারিবারিক দায়দায়িত্বের বোঝা, টু-বি অর নট-টু-বি-র ম্যাকবেথীয় অনিশ্চয়তা এবং প্রতি পদে পদে অভিভাবকদের বাধা-নিষেধের ডোর। টের পায়, জীবন কঠিন বড়ো, বয়ঃসন্ধির সমস্যা অধিকতর! প্রকৃতির আপন গৃহের ঘটন-অঘটনকারী নবজলধারায় সেচন। নবোন্মেষ পরিষেবায় অবগাহনকারী বয়ঃসন্ধিকাল। শরীরের পরতে পরতে হালকা হাসির পক্ষতাড়না। স্ফুটমান অনির্দেশ্য আকাশের নীলের ডাক। উচ্ছসিত হয়ে ওঠে মন।

মনের গভীর স্তরে স্তরে উদ্বেল সমুদ্রের তরঙ্গভঙ্গের অনুভব। উদ্ভাসিত বোধ। তারই পাশাপাশি অভিজ্ঞ অভিভাবকত্বের অশেষ দড়িদড়ার বাঁধনে পেষণে পর্যুদস্ত কৈশোর-তারুণ্য। দুরত্ত কৈশোর তাই দুর্বিসহ কৈশোর। বাধাবন্ধহীন প্রকৃতি-প্রস্রবণের সসঙ্গীত সহস্রধ্বনি কলতানে শত শত না-না-র প্রস্তর-প্রকীর্ণ ছন্দপতনের অনুভব অসত্য নয়! এখানে অভিভাবকদের অনেক অভিভাবনার অবকাশ আছে। একদিকে গানের কলকল্লোল; অন্যদিকে শংকার উতরোল। ‘শিশুর মন ও শিক্ষা গ্রন্থে আমরা তিন ধরনের অভিভাবক-দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছি : শক্তিতান্ত্রিক বা অথরিটেরিয়ান, সর্বানুমোদনতান্ত্রিক বা পারমিসিভ এবং গণতান্ত্রিক বা ডেমোক্রেটিক।

সেই বিস্তারিতে দ্বিতীয় বার প্রবেশের প্রয়োজন নেই। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটিই যে শ্রেষ্ঠ তা বিশেষ বিশ্লেষণের দাবি রাখে না। সিদ্ধান্তে পৌঁছোনোটা যদি সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় সম্ভব করে তোলা যায়, তাদের বক্তব্যের প্রতি যদি যথাযোগ্য মূল্য ও গুরুত্ব আরোপ করা হয় তা হলে মানসিক মন্দ-রক্তের (ব্যাড-ব্লাডের) উৎসটি বন্ধ হয়ে যায়, নৈতিক দায়বদ্ধতার চাপটি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, সিদ্ধান্তটি অনুসরণের জন্যে প্রয়োজনীয় শক্তির আবাহনটিও সদর্থক হয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে অধিকন্তু প্রাপ্য হয় সন্তানের আত্মপ্রত্যয়ের উপলব্ধি, ব্যক্তিত্বের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ এবং যুক্তি-বুদ্ধি-বিচার-বিবেচনা প্রকাশের উৎকর্ষ। অভিভাবকদের কিছুটা থেকে অনেকটা ধৈর্যই এই প্রক্রিয়ার দাবি।

বয়স, সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান— এরা কেবলমাত্র ভার তৈরি করলেই বিপদ, অন্তত সন্তানদের বেলায় অবশ্যই বিপদ; এরা তো গভীরতা এবং স্থৈর্যেরও পাথেয়। উত্তেজনা সকলক্ষেত্রেই ব্যক্তির জন্যে ক্ষতিকর; সন্তানদের সামনে, সমস্যায়, তা অধিকতর ক্ষতির কারণ : দ্বিপ্রান্ত, দ্বিমুখী ক্ষতি ঘটায়, তাই। এবারে এই ত্রিতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি ত্রি-প্রকৃতি মা-বাবাদের কথা বলা যাক : (ক) মনোবৈজ্ঞানিক মা-বাবা (সাইকোলজিক্যাল পেরেন্টস্), (খ) মেনে নেওয়া মা-বাবা (অ্যাকসেপ্টিং পেরেন্টস্) এবং (গ) কঠিন-কঠোর মেনে-না-নেওয়া মা-বাবা (রিজেক্টিং পেরেন্টস্)। এঁদের বিষয়ে একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার।

 

মনোবৈজ্ঞানিক মা-বাবা বা সাইকোলজিক্যাল পেরেন্টস্ :

‘প্রসব করলেই হয় না ‘মাতা’, মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালবাসা, দরদি-মরমি মনোভাব, অপত্য-বাৎসল্য, অন্তরের টান, মনের আত্তি— এইসব মানসিকতা জৈব মা-বাবা না হয়েও অনেকের মধ্যে থাকতে পারে। যাঁদের মধ্যে ফাদারলি-মাদারলি কোয়ালিটিস আছে তাঁদেরই সাইকোলজিক্যাল মা-বাবা বলা হয়। এঁদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি এইরকম : এঁরা—

১. সন্তানকে স্নেহ প্রীতি বিতরণে সক্ষম,

২. একটি স্বতন্ত্র সত্ত্বা বলে সম্মান করেন,

৩. সঙ্গ দান ক’রে নিজেদেরও সুখ খুঁজে পান, আনন্দ বোধ করেন,

৪. ছেলেমিকে কিছুটা প্রশ্রয় দেন, ছেলেমি করাটা স্বাভাবিক বলেই,

৫. সন্তানরা গায়েটায়ে ঠেস দিলেও, একটু আধটু মাখামাখি করলেও স্বচ্ছন্দে মেনে নেন (এটা নির্ভরশীলতাকে প্রশ্রয় দিতে নয়),

৬. সন্তানদের প্রতি ব্যবহারে এবং প্রতিক্রিয়ায় অনেক ধৈর্য প্রকাশ করে থাকেন,

৭. নিজেদের সুখসুবিধার চাইতে সন্তানদের সুখসুবিধার দিকে বেশি নজর দিতে অভ্যস্ত,

৮. সন্তানদের অনেক ধৃষ্টতা, নির্বুদ্ধিতা, বিরুদ্ধতাকেও এঁরা শাস্ত মনে মেনে নেন,

৯. সন্তানদের মন মানসিকতাকে বুঝে নিতে সচেষ্ট থাকেন, তাদের অভিমান অভিযোগ গুলোকেও সহানুভূতির সঙ্গেই দেখে থাকেন,

১০. সন্তানদের প্রতি ‘যথাযোগ্য’ ব্যবহারে এঁরা স্বাভাবিক, এবং সচেষ্টও।

এই যাবতীয় বৈশিষ্ট্যকে ছাপিয়ে থাকে এঁদের সন্তানদের প্রতি ভালবাসার টান বা মনটি। এই ভালবাসা যে সদাসর্বদাই নম্র-নত হয় বা হবে তা নয়, প্রয়োজনের সময় যথার্থ রকমের দৃঢ়তা প্রকাশের মানসিক শক্তিটি সন্তানের অসন্তোষকে অগ্রাহ্য করেও এঁরা ধরে রাখেন। ধরে রাখতে পারেন সেই ভালবাসার জোরেই। এখানেই ভালবাসার সঙ্গে অভিভাবকত্বের মেলবন্ধন ঘটে।

Leave a Comment