শিশুর বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর

শিশুর বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর- বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের অংশ। বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর Period of Formal Operation (II – through adult hood বা Adolescence : শারীরিক, মানসিক, আবেগীয় ও বৌদ্ধিক maturity-র কাল। সন্তান এখন বড় হয়ে গেছে, বড়দের দলে মিশে যাবার জন্যে ভিতরে ভিতরে তৈরি কাল।

শিশুর বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর

আমরা এই বয়সটি নিয়ে এই বইতে আলোচনা করবো না। বিরাট ব্যাপক বিষয়। তাই স্বতন্ত্র উপস্থাপনার দাবি রাখে। তবে দু-চারটি কথায় এই সময়ের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ না করলে প্রথম বাল্য ও দ্বিতীয় বাল্যকে যথাযথ বোঝা যাবে না। চলমান বর্ধমান বাল্যকাল কৈশোরের কূলে পৌঁছে নতুন প্রবাহে গতি ও শক্তিকে নিজের মধ্যে খুঁজে পায়। নিজেই এক পরিপূর্ণতায় বহমান হয়ে ওঠে। নবীন কিশোর। অতীতের জঠরে জন্ম। ভবিষ্যতের আকাশে পথিক । বৈশিষ্ট্যগুলি—

১. গুরুত্বপূর্ণ লাফ-পাটাতন কাল। শরীরের পরিবর্তন ও মনের নানাবিধ উন্মেষের কাল ৷

২. অপসৃয়মাণ কাল। বালসুলভতাকে বাতিল করে ব্যক্তিসুলভতার আবাহনের কাল। চিন্তা-ভাবনা, আচার-আচরণ, আবেগ-অনুভব, ক্রিয়াশীল-সৃষ্টিশীলতার আগামী দিনের জন্যে transitional period.

৩. পরিবর্তনের কাল। সব, প্রায় সব কিছুই : আবেগীয় জীবন, যৌন অনুভব,সামাজিকতার দায়, মূল্যবোধের আগ্রহ, প্রবণতা, দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য উদ্দেশ্য পাল্টায় এবং গড়ে ওঠে।

৪. সমস্যার কাল। বাল্যের সমস্যা সমাধানে মা-বাবার সাহায্য পাওয়া গেছে। সমস্যাগুলো ছিলও নিয়মিত। এখনকার বেশির ভাগ সমস্যাই যৌন অথবা সেই শিরশিরানিতে ওতপ্রোত। এবং অনভিজ্ঞতা। অথৈ জলের অনুভব। অপার  ‘স্বাধীন’ মনের চাহিদা। সব মিলে সে এক অনন্যপূর্ব, অনধিগম্য, অনভ্যস্ত জটিল অবস্থা। সামলানো দায়—নিজের নিজেকে। আবার অভিভাবকরাও বিপন্ন হয়ে পড়েন—বিষয়ের জন্যেও বটে, বয়সের জন্যেও বটে।

৫. কল্পনার উড়ানের কাল। কবিতা-র কাল। বাস্তবতা বোধ বিবর্জিত কল্পজীবন ধারণা। দিবাস্বপ্নের ঘোর, আদর্শবাদের প্রবল টান, ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা’-র পক্ষ তাড়নার কাল। sky is the limit-এর জীবনদর্শন।

৬. পরিবর্তন ঘটে—বাইরে শরীরে : উচ্চতা, ওজন, অঙ্গ অনুপাত, যৌন অঙ্গ, অনুষঙ্গ যৌন অঙ্গ। ভিতরে ব্যবস্থায় : পাচক ক্রিয়ায়, রক্ত চলাচল ব্যবস্থায়, শ্বাস প্রশ্বাসে, Endocrine system-এ স্নায়ু বিন্যাসে। মনের কথা ৩ নম্বরে আছে। এই বয়সের মনের কথা অশেষ।

 

Adolescence-কে কৈশোর বলা যাক। বয়ঃসন্ধিকে puberty. এই বয়সের সমস্যা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী শরীরবিজ্ঞানী মনোবিজ্ঞানীরা ব্যস্ত । মা-বাবা অভিভাবকরা উদ্ব্যস্ত! এই সময়ের মূল সমস্যা কি কি? এক, ঝড়, দুই, নিজের খোঁজ। প্রথমটিকে বলা যায় ঝটিকাহত ঝঞ্ঝাসমাকুল ঘূর্ণিবাত্যায় টালমাটাল জীবন সন্ধিকাল। দ্বিতীয়টিকে স্ব-অন্বেষণের, আত্মানুসন্ধানের সময়। ১. কৈশোরের ঝড় : এই সময়ের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য

ক. প্রবণতার বেপরীত্য। সংবেদনশীলতার সঙ্গে নিষ্ঠুরতার। স্বার্থপতার সঙ্গে পরার্থ পরতার। পরিবর্তনমুখীতার সঙ্গে রক্ষণশীলতার। কিশোর মনের মধ্যেই এই বিপরীত প্রবণতা জেগে থাকে, প্রভাবিত করতে চায় তার চিন্তাভাবনা অনুভব আবেগকে। তার চাওয়া পাওয়ার নিরিখটিকে। তাই ঝড়। ঝঞ্ঝা এবং ঘূর্ণি। অশান্ত কৈশোর। নির্দয়, নিষ্ঠুর। অকরুণ।

খ. Anna Freud এর মনঃ সমীক্ষণ পদ্ধতিতে সমর্থন রইলো। বললেন— এই উত্তালতা, এই ঘূর্ণি অনিবার্য এবং ইতিবাচক। কৈশোরের ক্রম-অভিব্যক্তির, ক্রম-উন্নতির জন্যেই অনিবার্য। ঈদ এবং ঈগোর দ্বন্দ্ব জঠরে জাত এই উত্তাল-উত্থান অবশ্যম্ভব—অযৌন বাল্যকালের গর্ভ থেকে সদ্য স্ফুরিত যৌন-জাগৃতি কৈশোরকে নির্ভরশীল মানবক অবস্থা থেকে স্বরাজ ব্যক্তিত্বে উন্নীত করতে- গ্য। একদিকে অতীতের অভ্যন্তর বাধা আর অন্য দিকে স্ফুরমান ঈগোর কল্প-উড়ান — তছনছকারী, upsetting, কখনও কখনও বা হতবুদ্ধিকারী ।

গ. সমাজ বিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞানের নিরিখ থেকে দেখে Bandura (1964) বললেন—না, ব্যাপারটা তেমন মারাত্মক নয়। কৈশোর একটা পর্ব, একটা পর্যায়গত দিকপরিবর্তনের কাল। সমস্যা অবশ্যই আছে এবং তা বেশ জটিলও বটে। তবে তা চলমান-বহমান জীবনেরই একটা ধাপ। বিশেষ অবশ্যই। এবং transitional. অনেকে বলেন—এই সময়ে ভিতরে ভিতরে ‘বড়ো হয়ে গেছি’— বোধ ব্যক্তিগত উৎসে যেমন অনুভবের সেচন পায়, তেমনি সমাজ ও সংস্কার অনেক ক্ষেত্রেই সেই সেচনকে কৃষ্টিয় পুষ্টির যোগান দেয়।

 

বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর | শিশুর মন ও শিক্ষা

 

এই উভয়ত প্রবাহিত মানসিক বাতাবরণ, সামাজিক প্রেক্ষিত, কৈশোরের মাথাটাকে সুপথ চলনে অথবা বিপথ গমনে প্রণোদিত করতে পারে। সমতা, সত্তোলন, টাল খেয়ে যেতে পারে। অত্যন্ত কঠিন তা রক্ষা করা; শান্ত ও ধীর পদক্ষেপেই তা অর্জনযোগ্য।

নিজেকে খুঁজে পাওয়া বা আত্মউপলব্ধি; অত্যন্ত দ্বন্দ্বমুখর, সংঘর্ষসংকুল এই উপলব্ধির অর্জন। Erikson একে সংকট বা crisis বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন—এই সময়ে স্বরূপান্বেষণের সঙ্গে করণীয়-ভূমিকার সংঘর্ষ ঘটে, con fusion বা অব্যবস্থিতচিত্ততার জন্ম দেয়। যা ছিল তা নেই, যা হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়, হাজির নয়। বোঝা-না-বোঝার দ্রুত অপসৃয়মাণ প্রেক্ষাপট। মনে, শরীরে।

প্রকাশিত অংশে, অপ্রকাশিত তখনও-না-জানা অনাগত অংশে। একটা অনাস্বাদিতপূর্ব অনুভব, একটা অজ্ঞাত উদঘাটন ভিতরে ভিতরে ফল্গু বহমান তারে লয়ে কি করিবে, ভাবে কিশোর, কি তার উদ্দেশ। তরুণ গরুড় সম কি মহৎ ক্ষুধার আবেশ! তাই সে নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নিরিখে নিজের নবমূল্যায়নে নিবেদিত। Erikson কয়েকটি বিষয়ের প্রতি জোর দিলেন—

ক. হঠাৎ এবং দ্রুত দেহের পরিবর্তন : দেহের টিস্যু, পেশি, অস্থি এবং প্রজনন তন্ত্রের গঠন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন। ছেলেদের পুরুষোচিত ও মেয়েদের রমণীসুলভ প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নয়ন, শ্রীবৃদ্ধি। সব মিলে নিজেদের কাছে বিস্ময় আর বিস্ময়, প্রতিযোজনের দায়। আবার অপরের দৃষ্টিতে নব মূল্যায়ন, সমাজের কাছে নব নব প্রাপ্তি ।

খ. এই সব বিচিত্র-বিভিন্ন প্রাপ্তির মূলে যে শক্তি-প্রবাহ তা অনেকের বেলায় আে আবার কারো কারো বেলায় পরে ঘটে। যারা আগে আগে বা সময়মতই ‘প্রাপ্ত

 

বয়স্ক’ হবার সুযোগ পায় তারা দলে বা ক্লাসে প্রাধান্য পায়, ফলে —

(১) দায়দায়িত্ব, কাজ এবং সুযোগ সুবিধা বেশি পায়

(২) সাফল্য, প্রশংসা, উপহার এবং তৃপ্তি পায়

(৩) বড়দের এবং স্কুল-সমাজের কাছে স্বীকৃতি পেয়ে অধিকতর সাফল্যের দিকে এগিয়ে যায় এবং

(৪) পৌরুষ ও ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতায় অবগাহন করে।

 

গ. মেয়েদের বেলায় ব্যাপারটা বেশ অন্যরকম হয়ে যায়। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণেই এমন হয়। ছেলেদের তুলনায় প্রাকৃতিক কারণেই মেয়েদের ‘পূর্ণতা’ আগে আসে, কিন্তু সমগোত্রীয় মেয়েদের চোখ সহানুভূতির বদলে বিমুখিতা প্রকাশ পায়। বাধো বাধো রকমের কুণ্ঠাজড়িত আচরণ প্রকাশ পেতে পারে। এটা অবশ্য সাময়িক, পরে কেটে যায়।

 

ঘ. নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে পারিবারিক ও সামাজিক মেলবন্ধনে, সম্পর্কে। ১০ থেকে ১৬ বছরের ৬৮৬ জনকে নিয়ে প্রশ্ন উত্তর পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রশ্নের উত্তরে খোঁজা চলছিল— (১) কার সঙ্গে একাত্ম বোধ ( identi fied) করে—পরিবার না-কি বন্ধুদের সঙ্গে, (২) কোন দলের সঙ্গে মেলামেশা পছন্দ করে (৩) কোন দলের মূল্য ও আদর্শকে তারা নিজেদের বলে মনে করে।

কিশোর কিশোরীদের উত্তর বেছে নিতে বলা হয়েছিল—পরিবার, বন্ধুবান্ধবী, অথবা নিরপেক্ষ (অর্থাৎ দু’দিকেই সমান) অর্থাৎ তিনটি ধরণের প্রশ্ন ছিল : একাত্মতা বা identification মেলামেশা বা association মূল্যাদর্শ বা normative orientation. তিনটি সম্ভাব্য উত্তর ছিল : পরিবার, বন্ধুবান্ধবী, নিরপেক্ষ। এবং চারটি বয়সে ভাগ করে পরিসংখ্যান শ্রেণীভুক্ত ছিল : ১০, ১২, ১৪, ১৬ বছর।

এবারে অবস্থাটি দেখা যাক—

Capture e1667996144676 শিশুর বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর

Capture 1 e1667996222356 শিশুর বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর

যদিও এই তথ্য-পরিসংখ্যান আমাদের ছেলেমেয়েদের নয়, আমেরিকার, তাহলেও সমান ভাবেই দেখে নেবার বিষয়। বরং আমাদের দেশে পরিবার সম্পর্ক অনেক বেশি দেখা যাবে যদি অনুরূপ প্রচেষ্টা এখানে হয়। আমরা অনেকেই অনেক অকারণ ভয়ে মরি এবং অহেতুক সন্তানদের নির্যাতন করি— এই পরিসংখ্যান তাই বলছে না কি? আমরা ঝড় এবং একাত্মতার কথা বলেছি। তিন নম্বরে ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ বলে শেষ করছি :

৩. স্বাধিকার বোধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম : কৈশোর চায় নিজের জীবন নিজে যাপন করতে নিজের ইচ্ছা আর পছন্দে কোথায় যাবে, কি জামাকাপড় পড়বে, কি কি করবে, কার সঙ্গে খেলা করবে, মিশবে, কোন মূল্যাদর্শ সে অনুসরণ করবে—ইত্যাদি। আর এই করতে গিয়ে সে বিপদ বাধায়, মাথা ঠুকে মরে। স্থির, গ্রাহ্য এবং পারিবারিক অধিকর্তার সঙ্গে। অথবা অধিকর্ত্রীর সঙ্গে। তবে এই অবস্থাটা সব বিষয়ে হয় না, সকল ব্যাপারেও ঘটে না। এমন কি সকলের সঙ্গেও ঘটে না। এক একটি বিষয়-ব্যাপারে এক-একজনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে যায়, যেতে পারে।

কিছু কিছু মা-বাবা আছেন যাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ অধিকারটি হাতছাড়া করতে চান না। অভ্যস্ত হয়ে যান। অন্য অনেকে আছেন যাঁরা অভ্যস্ত মতে গোড়া নন, কিন্তু সন্তানদের বয়স, বুদ্ধিবিবেচনা, অদূরদর্শিতার কথা ভেবে অমন সিদ্ধান্ত ক্ষমতাটি আঁকাড়ে থাকতে চান।

এই প্রসঙ্গেও তথ্য-পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হয়েছে। ১৩-১৮ বছর বয়সের কিশোর কিশোরীদের মূল্যায়ন সংগ্রহ করা হয়েছে—ওদের মা-বাবাদের ব্যবহার এবং দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে। ওদের মূল্যায়ন থেকে জানা গেল—
স্বৈরশাসক মা 55.0% এঁরা সন্তানদের কোনো মতামত বা বাবা (0.0% সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা স্বীকার দোর্দন্ডপ্রতাপ, autocratic – করেন না।

বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর | শিশুর মন ও শিক্ষা

খোলামেলা মা ৮২.০% আলোচনা, মতবিনিময় ইত্যাদির মাধ্যমে বা গণতান্ত্রিক বাবা ৮০.০% 90.0% সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, democratic এঁরা একেবারেই মাথা গলান না, নজর দেন না, বা ‘যা করতে চায় করুক’ মনের permissive নরম (Permissive) মা বাবা ৭০.০% এই সব সন্তানদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল : মা এবং বাবার প্রবর্তিত নিয়ম-কানুন, ধারণা এবং নীতি-নিরিখ কি ভাল এবং যুক্তিযুক্ত বলে মনে করো ? না-কি ভ্রান্ত এবং অযৌক্তিক বলে মনে করো?

 

মূল কথা :

দেখা গেছে ‘খোলামেলা’ মা-বাবার পরিবারে সন্তানরা অত্যন্ত খুশি, সপ্রশংস । বিপরীতক্রমে স্বৈর-প্রশাসন মা-বাবার বেলায় সন্তানরা অসন্তুষ্ট। একটা মজার অনুসিদ্ধান্তও বেরিয়ে এলো—পাঁচ ভাগের তিন ভাগ সন্তানরা মা-বাবার নীতি নিয়ম রীতি-পদ্ধতি বিষয়ে তুষ্ট মনোভাব প্রকাশ করলো—তা সে তাদের মতামতের আবাহন হোক বা না হোক ।

এবং একটি বিস্ময়কর অনুসিদ্ধান্তও! কিশোর-কিশোরীরা তাদের মা-বাবাদের থেকে কতোই না আলাদা!

“how different adolescents are from their parents.”Developmental Psychology, a life-span approach t অংশ উদ্ধার করে শেষ করছি : “poor family relationships are psycho logical hazards at any age, but specially so during adolescencc because at this time boys and girls are typically unsure of them selves and depend on their families for feeling of security. Even inore important, they need guidance and help in mastering the developmental tasks of adolescence.”

Leave a Comment