শিশুর অসদাচরণ , অস্বাভাবিক ব্যবহারের সমস্যা

অসদাচরণ , অস্বাভাবিক ব্যবহারের সমস্যা – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের অংশ। শৈশবে উপ্তবীজ প্রথম বাল্যে বিকৃত ব্যবহারে প্রকাশ পায়। বাল্যে মা-বাবার শির পীড়ার কারণ হয়। শৈশবের কথা আমরা শিশুর তত্ত্বাবধান বইতে ছোট্ট করে বলেছি। এখানে অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত করে অস্বাভাবিক এবং অবমানস ব্যবহারের, নমুনাগুলি দেখতে, তাদের কারণ খুঁজতে এবং করণীয় বিষয়ে বিজ্ঞানীদের নির্দেশ উপদেশ তুলে ধরতে চাই। অস্বাভাবিক উনমানস বা বিকৃত ব্যবহার প্রধানত phychoses এবং গৌণত autism. সাইকোসিস বলতে বোঝায় বাস্তবের সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া—আবেগ প্রকাশে, চলাচলে নড়াচড়ায়, প্রত্যক্ষে, কথাবলা- বাচনভঙ্গিতে, চিন্তাভাবনায় এবং পরস্পর প্রতিক্রিয়ায় (in teraction বা মিথস্ক্রিয়ায়)।

অসদাচরণ , অস্বাভাবিক ব্যবহারের সমস্যা

এই অংশকে বলে Schizophrenia. এই অবস্থায় সন্তান নানান রকমের অ-স্বাভাবিক, একেবারে অন্যরকম আচরণ করে—যেমন, চুপচাপ থাকা (withdrawal), অতি-নির্ভরতা (over dependence), মাত্রাছাড়া আনন্দ বা ভয় প্রকাশ করে, কিম্ভূত ধরন ধারণ বা বিকৃত ব্যবহার করে (আঙুল মটকানো, দেয়ালে-পিলারে মাথা ঠোকা, দোমড়ানো-মোচড়ানো দেহের অবস্থান), স্থান ও কাল বিষয়ে বোধহীনতা, বোবা-হাবা মতো ব্যবহার, ভাঙ্গাচোরা-বিকৃত শব্দ-বাক্য প্রয়োগ, পারম্পর্যহীন চিন্তাভাবনার প্রকাশ। আশার কারণ এই যে এদের সংখ্যা শতকরা তিন ভাগ।

 

Autism কে early infantile autism বলা হয়। সাইকোটিকদের মধ্যে এরা শতকরা দশ জন। এবং প্রধানত ছেলেদের মধ্যে দেখা যায়, মেয়েদের মধ্যে খুবই কম। অটিস্টিক শিশুদের বেলায় কয়েকটি বিষয় নজর করার মতো :

অস্বাভাবিক ব্যবহারের সমস্যা

১ . মা-বাবার মানসিকতায় বিশেষ খামতি দেখা যায়নি। বরং তাঁদের বুদ্ধি, শিক্ষা এবং পেশাগত স্তর বেশ উঁচু মানের বলে দেখা গেছে।

২. এই অটিস্টিক শিশুরা দেখতে বেশ সুন্দর এবং স্বাস্থ্যবান হয়।

৩. এদের মধ্যে অপ্রায়শদৃষ্ট ক্ষমতার স্ফুরণ দেখা যায়—ক্রিয়াশীল ও শারীরিক নৈপুণ্যের বেলায়। এমন কি মানসিক অসাধ্যসাধন শক্তি প্রকাশ পায়— অস্বাভাবিক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলে, যা সাধারণ ভাবে অসম্ভব।

৪. পরিবেশের সামান্য পরিবর্তন হলে এরা ভীষণ মুষড়ে পড়ে—যে পরিবর্তন অন্যের কাছে অত্যন্ত সাধারণ। দৈনন্দিন রুটিন বিষয়েও একই প্রতিক্রিয়া দেখায়।

৫. শব্দ-ভাষার ব্যবহারে ঘাটতি প্রকাশ পায়। এদের অর্ধেক প্রায় বাক্যহীন হয়। যা এদের বলা হয় তা ঘুরিয়ে বলে— বেঠিক প্রয়োগ বুঝতে পারে না। ‘আমি, আমাকে’ সর্বনামগুলি গুলিয়ে ফেলে। তুমি, সে’ বলে। উল্টে দেয়।

৬. অন্যান্য সাইকোটিক শিশুদের বেলায় অস্বাভাবিক EEG (Electroence phalograms) দেখা যায়। অটিস্টিক শিশুদের বেলায় তা দেখা যায় না।

৭. এরা ভীষণ একা একা থাকে, বোধ করে। অন্যদের প্রতি বোবা এবং অন্ধ থাকে শোনেও না, দেখেও না। সামাজিক ভাবে হাসে না, মায়ের কোলে গেলেও আনন্দ প্রকাশ করে না, তাকায়ও না। হাত বাড়ালেও কোলে উঠতে প্রতিক্রিয়া করে না। অপরিচিত লোকের প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করে না।
কারণ—

১. শরীরের ত্রুটি, যোগ্যতার ঘাটতি, উৎকণ্ঠা। Laurette Bender বলেন—দেহের বৃদ্ধিতে জৈব বাধা বা অস্বাভাবিকতা, অ-স্বাভাবিক বয়ঃ সন্ধির শুরু, ছোঁয়াচে রোগের বেলায় অতিশয় প্রতিক্রিয়া;খাদ্য গ্রহণের বাধা বিপত্তি। বলছেন—সাইকোসিস বংশগতিদ্বারা প্রভাবিত কিন্তু শারীরিক বাধাবিপত্তির দ্বারা বাস্তবায়িত ।

২. অটিস্টিকদের বেলায়, Rim Land এর মতে, প্রতিভার বিপথ চলন ঘটে যায় ৷ genious, talent দিকভ্রষ্ট হলে Autism দেখা দেয়। অক্সিজেনের অভাবে ঘটে। জন্মের আগে বা জন্মের সময়। ফলে reticular area of the brain is af fected, brain association বিঘ্নিত হয় ।

৩. Bettelheim মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেন। বললেন—সাইকোসিস এবং অটিজম উভয়ই শিশুর দুবছরের শৈশব জীবনের মানসিক অবস্থার দান। কাঙিক্ষত প্রতিক্রিয়াশীল উষ্ণ-স্নেহ পরিবেশের বদলে শিশু যখন ম্যাটমেটে, ঠাণ্ডা, একঘেয়ে পরিবেশ পায় তখন তার মনে ঘা লাগে, উৎকণ্ঠা জাগে, অর্থহীনতার বোধ চেপে

ধরে। ওদের কিছুই করার থাকে না। ধীরে ধীরে আপন একাকিত্বের দুর্গে ঢুকে যায়। প্রতিক্রিয়ার ইচ্ছেটা হারিয়ে ফেলে। বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যায়। বলেন— ব্যাপারটা এমন নয় যে শিশুর প্রতি অযত্ন হচ্ছে, তার প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে না। ব্যাপারটা এই যে সব কিছু এমন সুশৃঙ্খল নির্ঘণ্টে হচ্ছে, এমন যান্ত্রিক নিয়মে ঘটছে যে শিশুর তাতে কোনো হাত থাকছে না!

শিশু তার কান্নাকাটি, চিৎকার চেঁচামেচি দিয়ে আদায় করছে না কিছুই। সবই আপনাআপনি ঘটে যাচ্ছে—এমন একটা বোধ শিশুকে পেয়ে বসে, পীড়ন করে। পরিবেশ তার কাছে unrespon sive. 4. Refrigerator Parents ঠাণ্ডা, যান্ত্রিক, আবেগ অনুভবহীন মা-বাবা অথবা Schizophrenogenic mother (বিটকেল মেজাজ, উৎকণ্ঠা জর্জর, অস্থিরমতি, মা) সন্তানের উন-মানস, বিকৃত ব্যবহারের দায় বহন করতে বাধ্য। বিজ্ঞানীরা ফল দেখে গাছের প্রকৃতি এবং গাছ দেখে ফলের প্রকৃতি খুঁজেছেন—সন্তানদের অনুসরণ করে করে মা-বাবাদের এবং মা-বাবাদের দেখে দেখে সন্তানদের ।

তার ফল মা বাবাদের বিপক্ষেই গেছে। অবমানস শিশুদের মা-বাবারা বেশি বেশি উৎকণ্ঠিত, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী (হিটলারীয়-সন্তানদের বেলায়) অসামঞ্জস্য এবং সদা দাঁত • কিড়িমিড়ি স্বভাবের। দেখা গেছে। তবে এটাও বলেছেন—ওঁরা যে এরকম তা ছেলেদের জন্যে নয় তো? প্রশ্নটা সন্দেহের; উত্তরটা কিন্তু মা-বাবার বিরুদ্ধেই গেছে। এখনও অনুসন্ধান চলছে। জৈব উপাদান ও পরিবেশের প্রভাব দুটোই দায়ী। তবে কে কতোটা তা এখনও বৈজ্ঞানিক ভাষা পায়নি ।

অনেক রকমের চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে intrapsychic fixation, educa tion, behavioral intervention and vitamin intake এবং অন্যান্য। সমস্যা বা জটিলতার সঙ্গে চিকিৎসার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে—যত বেশি জটিল ও গভীর তত কম নিরাময় সম্ভাবনা। So, prevention is better.

Neurosis : স্নায়বিক জটিলতা—বিছানা ভিজানো (Enuresis), স্কুলে যেতে অনিচ্ছা, শান্ত পোষা কুকুরের ভয়, অন্যদের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় ভীতু ভীতু ভাব, এবং অন্যান্য যাবতীয় ভয়, phobias. আবার, ধাক্কামারা, লাথিমারা, কামড়ে দেওয়া, তারস্বরে চিৎকার ইত্যাদি আক্রমণাত্মক ব্যবহার, aggressive behaviour. ৬ থেকে ১২ বছরের ৫০০ শিশুর মায়েদের দেওয়া তথ্য। জানা গেল শতকরা ৪৩ জনের ৭ টার বেশি ভয় বা দুশ্চিন্তা আছে ৪৯ ভাগের অতিক্রিয়াশীলতা (overactive reaction) আছে।

৪৮ অস্বাভাবিক ব্যবহারের সমস্যা ভাগ সপ্তাহে অন্তত দুবার মেজাজ নষ্ট করে, ২৮ ভাগ দুঃস্বপ্ন দেখে, ২৭ ভাগ নখ কাটে, ১০/১২ ভাগ বিছানা ভেজায়, বুড়ো আঙুল চোষে। মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত করলেন—

১. অব-ব্যবহার, behavior disorder সাধারণ ভাবে বেশ বেশি, quite frequent.

২. ছেলেরাই বেশি ভোগে মেয়েদের তুলনায় ।

৩. ছেলেদের বেলায় আক্রমণাত্মক অবব্যবহারের সম্ভাবনা, মেয়েদের ক্ষেত্রে উৎকণ্ঠা এবং অবদমনের পরিমাণ বেশি।

৪. অনেকগুলো সমস্যা (অব-ব্যবহারের, dysfunction-এর সমস্যা) এমনি এমনিই সেরে যায়, কমে যায়। কয়েক বছরের মধ্যেই।

এখানে তিনটি বিষয় নজর দেবার মতো : এক, মূল্যায়ন অনপেক্ষ নয়। মা বাবার সহ্যক্ষমতা-দৃষ্টিভঙ্গি-মূল্যায়ন ঠিক করে দেয়, কখন শিশুর ব্যবহার অব বা উন বা বিকারগ্রস্ত হচ্ছে। কতটা অন্যরকম, অনাকাঙ্ক্ষিত হলেই বা তাঁরা তেমন মনে করবেন। স্কুল-প্রশাসনের বা সমাজের (পুলিশ ইত্যাদির) ব্যপারটাও তাই। খুবই আপেক্ষিক।

দুই, আক্রমণাত্মক ব্যবহারের বেলায় মা-বাবা-সমাজ-স্কুল সহজেই বিব্রত বোধ করে বলেও ছেলেদের ব্যাপারটা শতকরা হিসেবে সামনে এসে পড়তে পারে। (তবে ছেলেদের বেলায় আরও যে প্রাধান্য আছে তা — শেখার অক্ষমতা (learning disability) সাইকোসিস এবং কথা বলার সমস্যা (speech problem)।

এবং তিন, উপরের চার নম্বর—নিজে নিজেই একসময় সেরে যায় ব্যাপারটা। এগুলি তাহলে অব-ব্যবহার বা বিকৃত আচরণ নয়, উন্নতির বা বৃদ্ধির ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠার অপসৃয়মাণ সংকট মাত্র। শিশুরা নরম মাটিতে গঠনশীল পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। তাই দুশ্চিন্তা না করে যত্ন নিলে অনেক ক্ষেত্রেই সুরাহা ঘটবে।

 

তবে যে সব ক্ষেত্রে বিচার বিবেচনার দরকার আছে, প্রকৃত ভোগান্তির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে সে সকল ক্ষেত্রে ‘সব ঠিক হ্যায়’ বয়স বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে মনোভাব ক্ষতিকর হতে পারে। গভীর বিশ্লেষণ চাইছে—মা-বাবার কাছে।

 

সমস্যাগুলি আলাদা আলাদা করে দেখা যাক—

বিছানা ভিজানো Enuresis এবং অক্ষণে কুক্ষণে মলত্যাগ করা (জামাকাপড়ে করে ফেলা ইত্যাদি) Encopresis. তিন/চার বছরের শিশু হলে তেমন ভাবনার নেই। যতো শিশু চিকিৎসার জন্যে আনা হয় তার শতকরা ১৫ ভাগের এনুরেসিস দেখা যায়: আর ১৪ বছর বয়সে ওদের অনুপাত ১: ৩৫ অর্থাৎ ৩৬ জনের মধ্যে ১জন। ছেলেদের বেলায় বেশি দেখা দেয়। প্রধানত শিক্ষা-অভ্যাসের প্রশ্ন বা অসম্পূর্ণ অযোগ্য অভ্যাসের জন্যে হয়।

Enco presis বা মলত্যাগের বিড়ম্বনা দুরকমের। এক, যাদের ক্ষেত্রে মলত্যাগের শিক্ষা সাফল্যের সঙ্গেই করা হয়েছে কিন্তু পরে ব্যাপারটার অবনতি ঘটেছে। দুই, যাদের সফল শিক্ষাটাই এবং অভ্যাসটাই গড়ে ওঠেনি। আর একটা দল আছে যারা কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে। ফলে মলত্যাগ ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে হয়ে যায়।

এরা ঐ দুই প্রকারের মধ্যেই পড়ে। প্রথম দল ঃ পায়খানার ব্যবহারশিক্ষা ও মলত্যাগের ট্রেনিং অত্যন্ত কঠোর এবং নির্দয় কঠিন ভাবে দিলে শিশু সুযোগ বুঝে বিদ্রোহ করে। এরা তাই বিদ্রোহী। প্রতিশোধ নেয় মা-বাবার উপর। দ্বিতীয় দল : ছোট বেলাটা যাদের অবহেলায় কেটেছে, তেমন যত্ন-আত্তি হয়নি।

অর্থাৎ কোনো অভ্যাসই তেমন করে গড়ে ওঠেনি। কোষ্ঠকাঠিন্যের ধাত কেন হবে, বা হয় তা বুঝে খাদ্যাদির ব্যবস্থা করলে এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ জল পান করালে সমস্যা কেটে যেতে পারে। না হলে ডাক্তার। আর যে দুরকমের বিপত্তির কথা বলা হয়েছে তার কারণ অপনিত করলেই কার্যরূপ বিপত্তিও আর থাকবে না। তিন রকমের শৃঙ্খলা শিক্ষার যে পদ্ধতি আছে তার মধ্যে ‘খোলামেলা, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি’ প্রয়োগ করলে অনেক অহেতুক যন্ত্রণার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

Leave a Comment