শিশুর জন্য তার মা হলো পৃথিবীর প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। তাই যখন শিশু মাকে চোখের সামনে না পায়, তখন তার মনে অসহায়ত্ব, নিরাপত্তাহীনতা এবং দুশ্চিন্তা তৈরি হতে পারে। মায়ের অনুপস্থিতি অথবা অচেনা কারো উপস্থিতিতে শিশু ভয় পায়, উদ্বিগ্ন হয় এবং এ অবস্থার প্রতিক্রিয়ায় কান্নাকাটি শুরু করে। অনেক শিশু নিজের আঙুল চোষে, জামাকাপড় দাঁতে কাটে বা বারবার মেঝেতে বসে পড়ে। এসবই দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্বস্তির বহিঃপ্রকাশ।

আপনি কী করবেন:
- সহানুভূতির চোখে দেখুন: এই ধরনের আচরণ অনেক শিশুরই হয়ে থাকে। তাই দোষারোপ না করে বোঝার চেষ্টা করুন।
- অচেনা কারো সঙ্গে জোর করে পরিচয় করাবেন না: শিশুর মনের প্রস্তুতি ছাড়া অচেনা লোকের কোলে তুলে দেওয়া তার মনে আরও ভয় তৈরি করতে পারে।
- খেলনার মাধ্যমে মনোযোগ সরান: আঙুল চোষা বা জামা কামড়ানোর বদলে হাতের কাছে রঙিন, শব্দ করা বা বুদ্ধিদীপ্ত খেলনা রাখুন।
শিশু যখন হতাশ হয়ে পড়ে:
হামাগুড়ি দেওয়া শেখা শিশুরা জগতের নতুন কিছু আবিষ্কারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নতুন কিছু ধরতে গিয়ে পড়ে যেতে পারে, উঁচু কিছু টেনে নিজের গায়ে ফেলে দিতে পারে, এমনকি বিপজ্জনক বস্তুতে হাত দিতে পারে। এসব ঠেকাতে গিয়ে যখন তাকে বারবার থামানো হয়, তখন সে জেদ করে, কাঁদে এবং হতাশ হয়ে পড়ে।
করণীয়:
- ঘরটিকে শিশুবান্ধব করুন: টেবিল-কাচ, ভারী আসবাব বা বিদ্যুৎসংযোগের তার, ধারালো জিনিস বা ছোট বস্তু যেগুলো মুখে দিতে পারে, তা শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।
- পোষা প্রাণী থেকে বিরত থাকুন: এই সময়ে কুকুর, বিড়াল, খরগোশ ঘরে না রাখাই ভালো; অজান্তে তারা শিশুকে আঁচড়ে দিতে পারে বা ভয় দেখাতে পারে।
- বিকল্প খেলনা ও সময় দিন: শিশুকে নিরাপদ ও আনন্দদায়ক খেলনায় ব্যস্ত রাখুন এবং আপনি নিজেই সময় দিন যাতে ও অনুভব করে—সে একা নয়।
বয়স যখন এক থেকে দুই:
এই সময় শিশুর মানসিক বিকাশের গতি অনেক বেড়ে যায়। যদিও ও ধীরে ধীরে আপনার গা থেকে আলাদা হয়ে চলতে শেখে, তবুও মাঝে মাঝে ভয়, দুশ্চিন্তা এবং নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়। বিশেষ করে মা হঠাৎ পাশে না থাকলে বা নতুন কারো মুখ দেখলে শিশুর মধ্যে একধরনের হতবুদ্ধি ভাব আসে।
করণীয়:
- আপনার উপস্থিতি শিশুর জন্য খুবই জরুরি: কাজের ব্যস্ততার মাঝেও চেষ্টা করুন যেন শিশুকে নিয়মিত সময় দিতে পারেন।
- নতুন কিছু শেখার সুযোগ দিন: শিশুকে খেলাধুলা, ছবি আঁকা বা শব্দ শেখার মত সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করুন। কাজ শেষে প্রশংসা করুন বা ছোট পুরস্কার দিন।
- ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করুন: শিশুর “আমি নিজে করব” মানসিকতা এ বয়সে গড়ে ওঠে। ওকে বারবার বাধা না দিয়ে তার চেষ্টা ও আগ্রহকে সম্মান করুন।
- ভালোবাসা অনুভব করান: শিশুর মনে গেঁথে দিন যে, “মা আমাকে ভালোবাসে”—এ অনুভব থাকলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকবে।
মানব শিশুদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে “আনন্দ ও নিরাপত্তা” সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শিশুর কান্না, রাগ বা চেঁচামেচির পেছনে সাধারণত কোনো শারীরিক নয়, মানসিক কারণ থাকে। শিশুর যত্নে মা-বাবা বা অভিভাবকদের সংবেদনশীলতা, ধৈর্য এবং ইতিবাচক মনোভাবই তার আত্মবিশ্বাসী ও সুস্থ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার ভিত্তি গড়ে দেয়।
