শিশুর বিবেক ও নীতিবোধ

শিশুর বিবেক ও নীতিবোধ নিয়ে আজকের আলোচনা। বিবেক ও নীতিবোধ বিষয়টি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের বুদ্ধির পরিমাপ অধ্যায়ের অংশ |

শিশুর বিবেক ও নীতিবোধ

বুদ্ধির পরিমাপ বিষয়ে প্রথা প্রকরণ উল্লেখ করতে এই আপাত-অপ্রাসঙ্গিক বিষয়টি কেন এলো? বুদ্ধি একটা অস্ত্র, কৌশল, হাতিয়ার; সন্তান একে ব্যবহার করবে; সেই ব্যবহারের রকম, এলাকা, প্রকৃতি সেই সন্তানের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব গড়ে দেবে। সন্তান বুদ্ধিমান হোক যেমন চাই তেমনি চাই যে সে একজন বিবেকবান, নীতিঋদ্ধ, ব্যক্তি হয়ে উঠুক। এবং ঘটনা এই যে যখন থেকে সন্তানের বুদ্ধি বিষয়ে আমরা ভাবিত তখন থেকেই তার বিবেক এবং নীতিবোধগুলোও পাশাপাশি, সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে চলেছে। অস্ত্র ব্যবহারের নৈপুণ্য কতটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সেই অস্ত্রটি যে ব্যবহার করবে তার বিবেক ও নীতিবোধ গঠনে সমান দৃষ্টি অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত।

শিশুর বিবেক ও নীতিবোধ

নীতিবোধ গঠনের বিষয়ে দুটি মতবাদ আছে : এক, সামাজিক প্রশিক্ষণ-প্রলক্ষণ মতবাদ এবং দুই, ফ্রয়েডীয় স্যুপারইগো মতবাদ। (এই লেখকের ‘শিশুর মন ও শিক্ষা’ বইটিতে প্রাসঙ্গিক এবং ‘দর্শন ধর্ম বিজ্ঞান ও আমরা’ গ্রন্থে বিশেষ আলোচনা করা আছে।) অভিভাবকরা অবহিত হবেন এবং নিজ নিজ মতে ও পথে যথাকর্তব্য নিশ্চয় করবেন যাতে সন্তান বুদ্ধিমান এবং নীতিনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

দুটি মতবাদেই বলা হয় যে আচরণের গতি-প্রকৃতি, নৈতিক মান, নৈতিক মূল্য ও নৈতিক বোধ প্রধানতই বাইরে থেকে আরোপিত হয়ে সন্তানের নিজের মূল্যবোধে পরিণত হয়। এরা দ্বিমত এইখানে যে সামাজিক প্রশিক্ষণ-প্রলক্ষণ মতবাদে (i) বিবেক এবং অপরাধবোধকে সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফসল বলে এবং (ii) উভয়কেই সুতরাং প্রকাশিত আরোপিত আচরণ বলে মনে করে। অপরদিকে ফ্রয়েডীয় স্যুপারইগো বা মনঃসমীক্ষণ মতবাদে (i) মা-বাবা-সমাজের নির্দেশ অমান্য জনিত মনোভাবের কারণে ও উৎসে জাত অবদমিত অপরাধ বোধের গর্ভে বিবেকের জন্ম এবং (ii) স্যুপারইগোর শক্তি যত বেশি বিবেকের চাপ বা শক্তিও তত বেশি হয়।

প্রথম মতবাদে মা-বাবার নীতিবোধ অনুসরণ অনুকরণ করে সন্তানরা বিবেকবান হয়; স্নেহ-ভালবাসা, যুক্তি-ব্যাখ্যার সমর্থন এবং মানসিক নৈকট্যই প্রধান— শাস্তি-পুরস্কার গৌণ। মা-বাবার সঙ্গে একাত্মবোধ সন্তানের নীতিবোধকে মনের গভীরে স্থান ও স্থিতি দেয়।

দ্বিতীয় মতে স্যুপারইগোর চাপে, অপরাধবোধের কারণে, অবদমনের প্রক্রিয়ায় নৈতিকতা দানা বাঁধে এবং মা-বাবার স্নেহভালবাসার সম্ভাব্য বঞ্চনার তাড়নায় ক্রিয়াশীল বিবেক তৈরি হয়। সম্ভানের বুদ্ধির পরিমাপ করা এবং অনুশীলনের সাহায্যে সর্বোত্তম প্রাপ্তিতে পৌঁছে দেওয়াটা বর্তমানের ভোগবাদী সমাজের প্রয়োজনেই জরুরি; সন্তানের ধারণার প্রসার ও অবহিতির পরিধি বৃদ্ধি তার ব্যক্তিত্বের উন্নতির জন্যে জরুরি। আর তার মূল্যবোধ নীতিবোধ-আদর্শবোধকে বীরস্থির যত্নে গঠন করে দেওয়াটা জীবনের জন্যেই জরুরি— তার নিজের জীবন, মা-বাবার জীবন এবং সমাজের সার্বিক জীবনের জন্যে অত্যন্ত জরুরি।\

প্রত্যেক মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের মধ্যে বুদ্ধির প্রকাশ দেখতে চান, প্রত্যেক শিক্ষক তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে সেই বুদ্ধিরই ছাপ দেখতে চান এবং প্রত্যেক বড়োরা তাঁদের প্রিয় ছোটদের কাজেকর্মে চলনে বলনে বুদ্ধির ঝলক দেখতে চান। এমন কি পরবর্তী জীবনে অভিভাবক-মালিক-নিয়োগকর্তারাও তাকিয়ে থাকেন তাঁদের অধীনস্থদের মধ্যে যেন ঝরঝরে বুদ্ধির ভাণ্ডারটি পূর্ণ না হলেও সম্পন্ন অবস্থায় থাকে। আজকের প্রগতির যুগে আর প্রতিযোগিতার সর্বগ্রাসী বাতাবরণে এই বুদ্ধিকেই সকলে উচ্চস্থানে বসিয়ে রেখেছেন।

জ্ঞানের ভাণ্ডার, বিচারের ক্ষমতা, শিক্ষার ঔজ্জ্বল্য, অবহিতির প্রসার, প্রজ্ঞার সম্পন্নতা— সবই অর্জনযোগ্য যদি ব্যক্তির বুদ্ধিটা সুধার থেকে ক্ষুরধার থাকে। আবার এই থাকাটা শৈশব-বাল্য-কৈশোর-তারুণ্যেই বাস্তব হতে হবে। সকলেই জানেন যে ১৬ বছর পর্যন্ত (কখনও কখনও ১৮ পর্যন্তও) বুদ্ধির বৃদ্ধি হয়ে থাকে; তার পরে যার হয় না ষোলতে তার হয় না ছিয়াশিতে! কারণ তার পরে যা হয় তা অন্য কিছু হয়, বুদ্ধির আর বৃদ্ধি হয় না।

Leave a Comment