শিশুর দেরিতে কথা বলা – যা জানতে হবে

শিশুর বিকাশের প্রতিটি ধাপ অভিভাবকদের জন্য আনন্দের একেকটি মুহূর্ত। বিশেষত শিশুর প্রথম কথামা, বাবা, টাটা ইত্যাদিশুনতে পাওয়া এক অসাধারণ অনুভূতি। তবে অনেক সময় দেখা যায়, শিশুর বয়স বাড়লেও সে বাকউচ্চারণে পিছিয়ে থাকে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মাবাবা। প্রশ্ন জাগেশিশুর দেরিতে কথা বলাটা কি স্বাভাবিক, নাকি চিকিৎসার প্রয়োজন?

এই লেখায় আমরা একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করবো, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শসহ আপনাকে শিশুর সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর বিষয়ে সচেতন করবো।

 

শিশুর দেরিতে কথা বলা | শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা

শিশুর দেরিতে কথা বলা

বাস্তব ঘটনা: শিশুর দেরিতে কথা বলা

একটি শিশু, যার বয়স ৩ বছর ৯ মাস, এখন পর্যন্ত কেবল “টা-টা” ও “মা”—এই দুটো শব্দই বলতে পারে। যদিও সে বোবা বা শ্রবণ প্রতিবন্ধী নয়—কারণ টেলিভিশনের নির্দিষ্ট কিছু বিজ্ঞাপন শুনলেই সে সাড়া দেয় এবং দৌড়ে চলে আসে—তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন তার নাম ধরে ডাকা হয়, তখন সে কোনো সাড়া দেয় না, তাকায় না; যেন কিছুই শুনছে না।

আরো লক্ষণীয় হলো—শিশুটি অন্য খেলনা উপেক্ষা করে বাথরুমের একটি শ্যাম্পুর বোতল নিয়েই খেলতে বেশি আগ্রহী। চারপাশে থাকা অন্য খেলনাগুলোতে তার কোনো উৎসাহ নেই। পাশাপাশি, সমবয়সি বা কিছুটা বড় শিশুরা যখন সাবলীলভাবে কথা বলছে, প্রশ্ন করছে, তখন তার এই আচরণ স্বাভাবিকভাবেই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরিবারের অনেক সদস্য বলতেই পারেন যে, “অনেক বাচ্চাই দেরিতে কথা বলে।” কিন্তু বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা তো সহজেই মিটে না।

বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি পরামর্শ:

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি স্পিচ ডেভেলপমেন্ট বা কথাবলার বিকাশে বিলম্ব হওয়ার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হতে পারে। এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক খতিয়ে দেখা জরুরি:

. শ্রবণ ক্ষমতা ঠিক আছে কি না:

যদিও শিশুটির আচরণ দেখে মনে হচ্ছে সে শুনতে পাচ্ছে, তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি ভালো ইএনটি (ENT) স্পেশালিস্ট এর মাধ্যমে শিশুর শ্রবণশক্তির টেস্ট করিয়ে নেওয়া উচিত। এটা চিকিৎসার প্রথম ধাপ।

. শ্রবণ শক্তি ঠিক থাকলে পরবর্তী সম্ভাবনা কী?

শ্রবণ শক্তির কোনো সমস্যা না থাকলে, তখন চোখ রাখতে হবে অন্যান্য কিছু সাধারণ কারণে, যেমন:

  • অটিজম (Autism Spectrum Disorder)

 

শিশুর দেরিতে কথা বলা | শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা

 

অটিজম – শিশুর আচরণগত একটি জটিলতা

অটিজম একধরনের স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যা (Neurodevelopmental Disorder), যা শিশুর মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতিকে প্রভাবিত করে। এতে শিশুর আচরণ, যোগাযোগ সামাজিক সম্পর্ক গঠনে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অটিজমের সাধারণ উপসর্গ:

  • চোখে চোখ রেখে কথা না বলা
  • নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া
  • একই খেলনা বা বস্তুর প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ
  • সামাজিক যোগাযোগে অনীহা
  • একই ধরনের কাজ বারবার করা (repetitive behavior)
  • দেরিতে বা অস্বাভাবিকভাবে কথা বলা

⚠️ উল্লেখযোগ্য বিষয়: অটিজম নির্ণয়ে কোনো ব্লাড টেস্ট বা জেনেটিক টেস্ট নেই। এটি শিশুর আচরণ, কথা বলা ও বিকাশগত অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক শনাক্ত করে থাকেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসায় উন্নতি সম্ভব

ভয় পাওয়ার কিছু নেই। গবেষণায় প্রমাণিত, অটিজম বা ভাষা বিকাশে দেরির মতো সমস্যাগুলো যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, তবে সঠিক চিকিৎসা থেরাপির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর আচরণ ও কথাবলার দক্ষতা উন্নত করা সম্ভব।

কী করতে হবে?

  • একজন চাইল্ড সাইকিয়াট্রিস্ট বা ডেভেলপমেন্টাল পেডিয়াট্রিশিয়ান এর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করুন।
  • শিশুর সঠিক ডায়াগনসিসথেরাপি পরিকল্পনা তৈরি করুন।

আপনার জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নসমূহ:

১. শিশুর কত বয়সে প্রথম শব্দ বলা শুরু করা উচিত?
২. তিন বছর পার হয়ে গেলেও শিশু কথা না বললে সেটা কি অটিজমের লক্ষণ?
৩. শ্রবণশক্তির সমস্যা না থাকলেও কেন শিশু সাড়া দেয় না?
৪. শিশু যদি নির্দিষ্ট কিছু বস্তুর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ দেখায়, তবে সেটা কি বিপদের লক্ষণ?
৫. অটিজম নির্ণয় কীভাবে করা হয়?
৬. অটিজম কি সারানো সম্ভব?
৭. শিশুর স্পিচ ডেভেলপমেন্টে সহায়ক ঘরোয়া কিছু উপায় কী হতে পারে?
৮. থেরাপির মাধ্যমে কি শিশু স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে?

 

প্রত্যেক শিশু আলাদা। তাদের বিকাশের গতিও ভিন্ন। তবে সচেতন অভিভাবক হিসেবে আমাদের উচিত—সময়ের আগেই লক্ষণগুলো চিনে নেওয়া ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। দেরিতে কথা বলার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে, এবং বেশিরভাগই সময়মতো চিকিৎসা পেলে উন্নতির সুযোগ থাকে।

ভালোবাসা যত্নই শিশুর বিকাশের মূল চাবিকাঠি।

Leave a Comment