শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর নিয়ম

শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর নিয়ম – নিয়ে আজকের আলোচনা। শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর নিয়ম বিষয়টি “শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা” বিষয়ক একটি গুরুত্বপুর্ন পাঠ।

শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর নিয়ম

 

শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর নিয়ম | শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা

শিশুকে ট্যাবলেট খাওয়ানো :

একটি ট্যাবলেটকে চার ভাগের এক ভাগ করে দিনে ২ বার দিতে হলে প্রথমে ট্যাবলেটকে একটি পরিষ্কার কাগজে নিয়ে গুঁড়ো করতে হবে। এরপর তা সমান ৪ ভাগ করে ১ ভাগ এক চামচ পানিতে গুলিয়ে তাতে চিনি বা মধু অথবা এ জাতীয় সুইটেক্স/গ্রিন সুইট মিশিয়ে শিশুকে সকাল-বিকাল দিতে হবে ।

 

শিশুকে সিরাপ বা সাসপেনশন খাওয়ানো :

সাসপেনশন জাতীয় ওষুধে পানি মিশাতে হয় না । তবে ব্যবহারের পূর্বে বোতল ভালো করে ঝাঁকিয়ে নিতে হবে । বোতলে যদি পাউডার দানা থাকে তাহলে বোতলের গায়ে লেখা নির্দেশমতো পানি মিশিয়ে সিরাপ বানাতে হয় ।

 

এলিক্সার :

এতে যদি অ্যালকোহল থাকে, তাহলে ব্যবহারের পূর্বে সমপরিমাণ পানি মিশিয়ে শিশুকে দিতে হবে ।

প্রয়োগ :

শিশুর মাথা উঁচু করে ধরুন । এবারে ওষুধ ড্রপার বা চামচ দিয়ে অল্প অল্প করে শিশুর মুখে দেন । অথবা ছোট্ট পরিষ্কার ফিডারে নিয়েও তা দেওয়া যেতে পারে । সবটুকু ওষুধ একসঙ্গে নয়, অল্প দিয়ে শিশুকে তা গিলবার সময় দিতে হবে। গিলে খাবার পর আরেকটু দিতে হবে। খুব সতর্কতার সঙ্গে ওষুধ খাওয়াতে হবে। অবশ্য বড়ো শিশুরা চামচ কিংবা পেয়ালা থেকেও টেনে খেতে পারবে ।

 

শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর নিয়ম | শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা

 

“শিশু সবটুকু ওষুধ গিলে খেয়েছে, মুখে আর অবশিষ্ট নেই’— অন্য কাজে চলে যাওয়ার আগে তা নিশ্চিত হতে হবে । মুখের ভেতরে ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে । ওষুধ খাওয়ানোর পর শিশুকে কিছুক্ষণ এক কাতে শুইয়ে রাখতে হবে। এ সময় তাকে বেশি নাড়াচাড়া করা ঠিক নয় । শিশুর প্রয়োজনীয় ওষুধ অথবা বাসার জন্য অন্য কারো ওষুধ শিশুর হাতের নাগালের বাইরে তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখবেন । তা না হলে এসব ওষুধ নিয়ে শিশু খেয়ে ফেলতে পারে । কোনো কোনো ওষুধে শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয় ।

 

শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর যেসব নিয়মাবলীগুলো অবশ্যই মেনে চলবেন:

১. বয়স মেনে ওষুধ প্রদান:

শিশুর বয়স অনুযায়ী তার ওষুধ নির্ভর করে। তার আপনার শিশুর বয়স কত সেটার উপর ভিত্তি করে তাকে ওষুধ দিন। আর শিশুর বয়স যদি ২ মাসের কম হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে তাকে কোন প্রকার ওষুধ প্রদান করা থেকে বিরত থাকুন। এক্ষেত্রে প্রথমেই চিকিৎসকের সাথে কথা বলে নিন।

২. জোর করে ওষুধ খাওয়াবেন না :

আপনার ছোট্ট শিশুটি ওষুধ খেতে চাচ্ছে না? ওকে জোর করবেন না। অনেকসময় মা-বাবা শিশুর মাথা ধরে জোর করে ওষুধ গেলাতে বা মুখে পুরে দিতে চান। এক্ষেত্রে ওষুধ শিশুর গলায় আটকে যেতে পারে বা আরো বাজে সমস্যার জন্ম দিতে পারে। তাই চেষ্টা করুন শিশুকে বুঝিয়ে, শান্ত করে ওষুধ খাওয়াতে।

৩. সঠিক ওষুধ প্রদান করুন:

অনেকসময় শিশুদেরকে ঘরে থাকা ওষুধ খাইয়ে দেন বাবা-মা। এমন একটি কাজ খুব সহজেই মারাত্মক কোন ফলাফল ডেকে নিয়ে আসতে পারে আপনার শিশুর জন্য। ঘরে থাকা বড়দের ওষুধ তাই ভুলেও আপনার শিশুকে প্রদান করবেন না। শিশুকে যেকোন ওষুধ খাওয়ানোর পূর্বে চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন ও তার পরামর্শ নিন। ওষুধ ঠিকঠাক হলেও এর পরিমাণ না জানলেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তারপরেই শিশুকে কী ওষুধ খাওয়াবেন সে সিদ্ধান্ত নিন।

৪. ওষুধের মেয়াদ দেখে কিনুন:

ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার সময় ওষুধের মেতাদ ঠিকঠাক আছে কিনা তা ভালোভাবে যাচাই করে তারপর কিনুন। ওষুধ সবার জন্যই অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জিনিস। বিশেষ করে শিশুদের জন্য তো বটেই। তাই ওষুধের প্যাকেট ঠিক আছে কিনা, সেটার মেয়াদ ঠিকঠাক আছে কিনা এই সবকিছু দেখে ওষুধ কিনুন। ঘরে থাকা অনেক আগের কিছু ওষুধ এখনো রয়ে গেছে দেখে সেগুলো শিশুকে খাইয়ে দিবেন না। বরং প্রথমে ওই ওষুধের মেয়াদ আছে কিনা সেটা নিশ্চিত হোন এবং তারপর শিশুকে সেই ওষুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিন।

৫. ওষুধ খাওয়ানোর সময় মেনে চলুন:

প্রত্যেকটি ওষুধ সেবনের নির্দিষ্ট সময় থাকে। তাই পরিমাণের সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে শিশুকে তার ওষুধ প্রদান করুন। খাবারের আগে বা পরে, খালি পেটে ইত্যাদি যে নির্দেশনাটিই প্রদান করা হোক না কেন তা মেনে চলুন। এতে করে আপনার শিশু ওষুধের সম্পূর্ণ উপকারিতা উপভোগ করতে পারবে।

৬. ওষুধ সম্পর্কে জেনে নিন:

চিকিৎসক অবশ্যই সবচেয়ে ভালো জানেন। তবুও শিশুকে ওষুধ প্রদান করার আগে ওষুধের উপাদান, সেটার ব্যবহার ইত্যাদি জেনে নিন। এছাড়া ওষুধটি কীভাবে, কোথায় ভালোভাবে সংরক্ষণ করা যাবে যেটাও জানুন। আপনার শিশুকে আপনার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তার অ্যালার্জি বা অন্য কোন সমস্যাকে বাড়িয়ে দেওয়ার মতো উপাদান ওষুধে থাকলে সেটা এক্ষেত্রে খুব সহজেই এড়িয়ে চলতে পারবেন আপনি।

৭. খেলার ছলে শিশুকে ওষুধ খাওয়াবেন না:

অনেকেই শিশুকে ওষুধ চকোলেট বা মজার কিছু বলে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে শিশু আপনি না থাকয়াবস্থায় মজা করেই আবার ওষুধ খেয়ে ফেলতে পারে। তাই ওষুধ অবশ্যই শিশুর নাগালে রাখবেন না এবং একই সাথে তাকে মজার ছলে খাওয়াবেন না। এমনকি চিকিৎসক কোন খাবারের সাথে মিশিয়ে ওষুধ খেতে বললে তাহলেই শিশুকে খাবারে মিশিয়ে ওষুধ প্রদান করুন, অন্যথায় না।

৮. আলোর সামনে ওষুধ খাওয়ান

খেয়াল রাখুন ওষুধ খাওয়ানোর সময় ঘর যেন অন্ধকার না থাকে। অন্যথায় শিশুকে ভুলভাল ওষুধ প্রদানের সম্ভাবনা থেকে যাবে। উজ্জ্বল আলোতে শিশুকে সঠিক পরিমাণে ওষুধ প্রদান করুন।

৯. দুই ডোজ ওষুধ খাওয়াবেন না

আপনার শিশু ওষুধ খাওয়ার পর বমি করে ফেললে তাকে আবার ওষুধ না দিয়ে আগে চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন। অন্যথায় সেটি আপনার শিশুর শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

ওষুধ শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নয়, শিশুদের জন্যও অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান যেটির ভুলভাল প্রয়োগ খুব বাজে প্রভাব রাখতে পারে শিশুর শরীরে। তাই শিশুর অসুস্থতায় তাকে ওষুধ প্রয়োগের সময় যত্নের সাথে সাথে সতর্কতাও অবলম্বন করুন।

Leave a Comment