শিশুর ভোকাব্যুলারি বৃদ্ধির উপায়

ভোকাব্যুলারি বৃদ্ধির উপায় – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বুদ্ধির পরিমাপ ” বিভাগের একটি পাঠ।

 

শিশুর ভোকাব্যুলারি বৃদ্ধির উপায় | বুদ্ধির পরিমাপ | শিশুর মন ও শিক্ষা

নানাবিধ টেস্ট বিবরণ :

মানসিক ক্ষমতা বা যোগ্যতা একটি বহু-উপাদান জটিল বিষয়। এই ক্ষমতা বা যোগ্যতা নিরূপণে একাধিক বিষয়ের পারিমাপ করা হয় : তথ্যগত সংগ্রহ, বাস্তব জ্ঞান, অবধারণ ক্ষমতা, অর্জিত জ্ঞানের প্রাসঙ্গিক ব্যবহার, তথ্যের মূল্যায়ন ও পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ইত্যাদি। এই কারণে যে সব টেস্ট করা হয় তাকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয় : বুদ্ধির পরিমাপ, যুক্তিপ্রয়োগ ক্ষমতার নির্ণয়, সংখ্যাবিষয়ক অবধারণ বিশ্লেষণ যোগ্যতা, পরিসংখ্যান মানসিকতা, তুল্যমূল্য করার ক্ষমতা, প্রদত্ত থেকে অপ্ৰদত্তে অনুমান করার ক্ষমতা ইত্যাদি।

আমরা পর পর কিছু নমুনা উদাহরণ তুলে দিচ্ছি। মানসিক বয়স নির্ধারণের নিরিখটি থাকছে না। মা-বাবারা বয়ঃসন্ধি-উত্তর সন্তানদের, বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরের, মেরিট বুঝে নিতে পারবেন :

Test শিশুর ভোকাব্যুলারি বৃদ্ধির উপায়Test 1 শিশুর ভোকাব্যুলারি বৃদ্ধির উপায়

বুদ্ধাংক বিষয়ে ইতস্তত কিছু কথা :

১. ৩০-৪০ পয়েন্ট বুদ্ধাংক পরিবর্তন প্রায়ই দেখা যায় ;

. নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বেলায় হ্রাস-বৃদ্ধি প্রায় ঘটে না; ছেলেদের বেলায় বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি;

৩.পুরুষালি প্রকৃতি মেয়েদের বেলায় মেয়েলি মেয়েদের তুলনায়ও বেশি;

৪. শৈশবের পরীক্ষা প্রাপ্ত বুদ্ধাংকের সঙ্গে পরের, বাল্য-কৈশোরে প্রাপ্ত বুদ্ধাংকের সঙ্গে উচ্চতর কো-রিলেশন পাওয়া গেছে; তার পরে এই বৃদ্ধি তেমন আর ঘটে না। (৫-৭ বছরের সন্তানকে দেখে নিরাশ হবার কারণ নেই); অপেক্ষা ও চর্চা করা-করানোর হেতু আছে।)

৫. গিফটেড্ বা বরপ্রাপ্ত সন্তানদের জন্যে গৃহে স্কুলে-পরিবেশে বিশেষ যত্ন নেবার দরকার আছে। ওদের মধ্যে একটা গতি, সমৃদ্ধি, ব্যাপ্তি ও ধার আছে যার প্রকাশের যথাযথ
পথ ও ব্যবস্থা থাকা চাই।

৬. বুদ্ধাংকের প্রাথমিক প্রাপ্তি (মূলধন) বংশগতি দ্বারা প্রধানত নির্ধারিত হলেও পরিবেশের— মা-বাবা, ভাই-বোন, অন্যজন-পরজন এবং যাবতীয় সামাজিক-ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাবে পরিশীলিত-পরিবর্তিত হয়ে থাকে। আনুপাতিক উন্নতি সম্ভব। ভারে যাই বাড়ুক, ধারে অনেকখানি বাড়ানো যায়।

৭. বিশেষ ক্ষমতাধর (একসেপশনাল) সন্তানদের বেলায় বুদ্ধির উচ্চস্তরের সঙ্গে সঙ্গে অন্য গুণও থাকে যাকে সৃষ্টিশীলতা বলা যায়। এদের কাজেকর্মে, কথায়-বার্তায়, ধারণা কল্পনায়—

(i) নতুনত্ব প্রকাশ পায়। প্রত্যাশিতের বাইরেও এরা নতুন কিছু করে— বলে— বোঝায়,

(ii) যথাযথতা-যোগ্যতা থাকে। অলীক কল্পনা, স্ববিরুদ্ধ ধারণা বা অ্যাবরাকাড্যাবরা কাজ করে না; যুক্তি-বাস্তবতা দ্বারা সমর্থন করে,

(iii) উপাদান সমূহকে (দ্রব্যের, শব্দের, ধারণার) নবতর বিন্যাসে সাজিয়ে তোলে, অ-ভূত-পূর্ব বিন্যাসে এবং

(iv) অধরাকে ক্রমশ পরিস্ফুট করে তোলে— প্রথমে অর্থহীন-তাৎপর্যহীন মনে হলেও অন্তর্নিহিত অর্থ-তাৎপর্য ক্রমশ প্রকাশ হয়ে পড়ে— অস্পষ্ট থেকে স্পষ্টে উন্নীত হয়। বিজ্ঞানীরা কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন : (ধারণাগত সৃষ্টিশীলতা নির্ণয়ে)

ক) বিকল্প ধারণা গঠন-প্রকাশ : সাধারণ জিনিসের নাম বলে তাদের কী কী ব্যবহার করা যায় তা জানতে চাওয়া, যেমন— জুতো এবং ছিপি, বই এবং পেন;

খ) সাদৃশ্য নির্ধারণ বর্ণনা : কী কী বিষয়ে এরা এক— ট্রেন ও ট্রাকটর, বাড়ি ও গাড়ি;

গ) বিমূর্ত ধারণার মূর্ত বস্তু নির্দেশ : বৃত্তের বাস্তব উদাহরণ। শব্দের উৎস; এবং

ঘ) চিহ্ন-প্রতীক দেখে ধারণা-কল্পনা গঠন : বিমূর্ত ছবি, লাইন বা প্যাটার্ন দেখে কতো রকমের গল্প-ধারণা-কল্পনা তৈরি করতে পারে।

সন্তানের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা আছে কিনা তা জানতে বুঝতে হলে মা-বাবার তরফে অনেক ধৈর্য, মনোনিবেশ এবং ইনট্যুইশন চাই। উপরের বলা (i)— (iv) বিষয় উপস্থিত আছে কিনা তা বুঝতে হলে সন্তানের কাজ-কথা-ধারণার শৃঙ্খলাকে সঠিক অনুসরণ করতে হবে, ধরে নিয়ে এগুতে হবে যে সে ছন্নছাড়া কথা বলছে না, কিছু নতুন কথা বলছে। ‘বক্-বক্ করে মাথা খাস্ না!’ না বলে শোনাই যাক্ না কী বলছে বলে মন দিতে হবে। কড়াইতে মাছ জ্বলে গেলে বা অফিসের রক্তচক্ষু তাড়া করলে সন্তানের মনে নবাঙ্কুর সৃষ্টির ঝলকটুকু দেখার সময় কোথায়? অনেকের তো মনটাই থাকে না! মনটাকে রাখা চাই; সময়টাকে ধরা চাই ।

বিশেষ ক্ষমতা বিশেষ ধরণের প্রকাশের মাধ্যম নেবেই। তাই সন্তানের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা, কোনো বিশেষ বিষয়ে বিশিষ্টতা আছে কিনা তা টের পেতে হলে মা-বাবা অভিভাবকদের সেই সেই মন-তরঙ্গে পৌঁছেই টের পাওয়া সম্ভব। সন্তানের মধ্যে অনেক বিশিষ্ট গুণাবলি শুধুমাত্র মা-বাবার অনবধানে অথবা নেতিবাচক মনোভাবের কারণে, অথবা অন্য অনেক কারণে হারিয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়; অংকুরিত হয়েই এবং হতে-না-হতেই সংবেদনহীন-সহানুভূতিহীন-সেচনহীন শুষ্কতায় দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। মানব সম্পদের অপচয়; সন্তান সম্ভাবনার সখেদ অবলোপ। অনুশোচনার কারণ ।

ধারণার প্রসার ও অবহিতির পরিধি :

প্রভূত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন— বয়স, সময় বা যথাযথ স্তর না এলে ছোটরা বস্তুগত নাড়াচাড়ায়, প্রচেষ্টা ও ভ্রান্তি ১.

১. অপনোদনের (ট্রায়াল অ্যান্ড এরর -এর) পথে সমস্যার সমাধান খোঁজে; বড়রা মনের মধ্যে ধারণা-নীতির বৌদ্ধিক প্রয়োগে সেই একই সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে নেয়। সুতরাং যথাযথ স্তরে পৌঁছোনোর জন্যে অপেক্ষা করা সঠিক। এই ব্যাপারটা ব্যক্তিগততার প্রভাবে প্রভাবিত ।

২. জগৎ ও জীবন সম্পর্কে ধারণা এবং অবহিতি অত্যন্ত নিকট জন-বিষয়-এলাকা থেকে ক্রমশই দূরবর্তী হতে থাকে; বলয়ের প্রসার হতে থাকে। মনের মননে, চিন্তনে, ধারণার উৎসে বইপত্র, রেডিও, টিভি, আলোচনার উৎসে

৩. বালক-বালিকাদের মনের মধ্যে কী ধরনের খবর, তথ্যাদি, ধারণা সংগৃহীত আছে এবং ওদের ধ্যানধারণা-মনোভাব কোন পথে ও মাত্রায় গতি পাচ্ছে তা জানার চেষ্টা করা হয়েছে। দেখা গেছে যে—

(ক) ওরা যা সব জানে বলে আমরা ধরে নেই তার অনেক কিছুই ওরা সঠিক জানে না,

(খ) অনেক কিছু জানে যা আমরা মনে করি ওর জানেই না,

(গ) রেডিও, এবং বিশেষ করে দূরদর্শনের প্রভাবে ওদের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি, ধারণা ও অবহিতি এবং এ-সবের গুণ-পরিমাণ ভীষণ ভাবে প্রভাবিত, (ঘ) নিম্নবিত্ত পরিবেশের ও উচ্চবিত্ত পরিবেশের প্রভাব যথেষ্ট গভীর।

৪. কী করে সঠিক চিন্তা করা যায় তা না শিখিয়ে আমরা সন্তানদের শেখাই কি করে বেশি বেশি তথ্য-খবর সংগ্রহ করা যায়। ‘চিন্তা কর, পড় আর ভাব’ না বলে আমরা বলি ‘পড়, মুখস্থ কর, মনে করে রাখ’। প্রথম প্রক্রিয়ায় সন্তানের ধারণা ক্ষমতা ও অবহিতিরপরিধি ব্যক্তিগত স্তর-যোগ্যতা অনুযায়ী শীলিত হয়, তৈরি হয়ে ওঠে এবং প্রসার পায়, দ্বিতীয় প্রথায় মনের মধ্যে বোঝা বাড়ে, ইট-বালি-সিমেন্ট জড়ো হয়— গৃহ তৈরি হয় না। ধারণা ও অবহিতির উন্নতি সাধনের জন্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ অনেক ফলপ্রদ।

চিন্তাক্ষমতা বাড়াতে চারটি উপাদান সাহায্য করে :

(ক) ম্যাচ্যুরেশন যা স্তরগতযোগ্যতা। স্নায়ুতন্ত্রের বৃদ্ধির স্তর অনুযায়ী প্রাপ্ত-সংগৃহীত তথ্যের বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা তৈরি হয়। তাই স্নায়ুতন্ত্রের পরিশীলন চাই।

(খ) অভিজ্ঞতা-প্রত্যক্ষ-যোগাযোগ। ইন্দ্রিয়ের যথাযথ ব্যবহারে-প্রয়োগে তথ্যাদির সংগ্রহ হলে, স্পষ্টতা স্বাভাবিক হবে। কাল্পনিক বস্তু-বিষয়-তথ্য সন্তানদের মনে তেমন বাস্তবতার’ বোধ সঞ্চার করতে পারে না।

(গ) সামাজিক মান্যতা-স্বীকৃতি। মনে মনে সংগঠিত ধারণাদিকে প্রকাশ করে অপরের কাছে বলতে পারার সুযোগ এবং যথাযথতার স্বীকৃতি পাওয়া।

(ঘ) স্ব-নির্দেশিত সামঞ্জস্যবিধান ক্ষমতা। নতুন নতুন তথ্য-ঘটনাকে নিজের চেষ্টাতেই আপন মনের ধারণা-অবহিতির জগতে স্থান করে দেওয়া; সামিল করে নেওয়া। এটি দুটি পথে ঘটে : অভিযোজনা ও সংযোজনা (অ্যাডাপটেশন ও অ্যাসিমিলেশন)। বিরোধ-বৈপরীত্য থাকলে চাঞ্চল্য থাকবে মনে, তাই সক্রিয়-ভাবেই সন্তানের মন চিন্তাভাবনার পথে সংস্থিতি সাধনে তৎপর হবে— অ্যাকোমোডেট করে ইকুইলিব্রিয়াম সম্ভব করে তুলবে। ভাবনাচিন্তা উদ্বৃক্ত হবে, কর্ষিত হবে এবং নতুন স্তরে উন্নীত হবে।  ফলে, একটি ‘কগনিটিভ স্টাইল’ বা বৌদ্ধিক-বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। প্রত্যক্ষ, কল্পনা এবং চিন্তা ক্ষমতা শুধুমাত্র বুদ্ধির ক্রিয়াকলাপের উপরই নির্ভর করে না, এরা আরও গভীরে প্রোথিত-উৎসারিত; এদের ভিত এবং উৎসে আছে মূল স্নায়ুতন্ত্র এবং ব্যক্তির আবেগীয়-সামাজিক অস্তিত্ব। কিছু কিছু প্রত্যক্ষ ও চিন্তন প্রক্রিয়া আছে যা শুধু বুদ্ধির মাত্রাদ্বারা নির্ধারিত-পরিচালিত নয় এবং সমগ্র ব্যক্তিত্বের প্রভাবে প্রভাবিত। তাই—

(ক) যে সকল সন্তান মা-বাবার পরিবারের স্নেহসিক্ত সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে, দূরে কোথায়ও বড় হয়ে উঠেছে তাদের মধ্যে সেই বঞ্চনার, অভাবের প্রতিফলনে ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত হয়ে আবেগপ্রবণতা, অধৈর্য, এবং চঞ্চলমতিত্ব দানা বেঁধে উঠেছে। যাবতীয় বৌদ্ধিক প্রক্রিয়াগুলিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।

(খ) সন্তানের মেজাজ-মর্জি (মুড-টেম্পারামেন্ট) প্রকাশ পায় তার আচরণে, তার মন মানসিকতায়। আগ্রহে-দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাই সন্তান বুদ্ধির বিশেষ অর্জনে অথবা জ্ঞানান্বেষণের সাধারণ প্রচেষ্টায় লাভ করবে কি লোকসানে পড়বে, সম্পন্ন হবে কি বিপন্ন হবে তা অনেকটাই নির্ভর করে তার এই মেজাজ-মর্জির উপর, তার স্ব-নির্ভরপর-নির্ভর মনোভাবের উপর, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর। (গ) সন্তানদের মধ্যে বিশ্লেষণী-ধীর মনোভাব যেমন তৈরি হয় তেমনি ঝট্পট্-অবিশ্লেষণী প্রতিক্রিয়ার ঝোঁকও দেখা যায়। প্রথম দল সব জায়গাতেই— স্কুলের ক্লাসরুমে, লেবরেটরিতে, খেলার মাঠে ধীর স্থির বিশ্লেষণী; দ্বিতীয়দল সর্বত্রই আবেগপ্রবণ, ছটফটে। অভিনিবেশ-অধ্যবসায় প্রথম দলের চালক নীতি, দ্বিতীয় দলের নয়। জীবনের ক্ষেত্র-কর্ম বিধির অর্জনে- প্রাপ্তিতে এই মন-মানসিকতার প্রভাব অনিবার্য।

 

বিবেক ও নীতিবোধ :

বুদ্ধির পরিমাপ বিষয়ে প্রথা প্রকরণ উল্লেখ করতে এই আপাত-অপ্রাসঙ্গিক বিষয়টি কেন এলো? বুদ্ধি একটা অস্ত্র, কৌশল, হাতিয়ার; সন্তান একে ব্যবহার করবে; সেই ব্যবহারের রকম, এলাকা, প্রকৃতি সেই সন্তানের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব গড়ে দেবে। সন্তান বুদ্ধিমান হোক যেমন চাই তেমনি চাই যে সে একজন বিবেকবান, নীতিঋদ্ধ, ব্যক্তি হয়ে উঠুক। এবং ঘটনা এই যে যখন থেকে সন্তানের বুদ্ধি বিষয়ে আমরা ভাবিত তখন থেকেই তার বিবেক এবং নীতিবোধগুলোও পাশাপাশি, সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে চলেছে। অস্ত্র ব্যবহারের নৈপুণ্য কতটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সেই অস্ত্রটি যে ব্যবহার করবে তার বিবেক ও নীতিবোধ গঠনে সমান দৃষ্টি অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত।

নীতিবোধ গঠনের বিষয়ে দুটি মতবাদ আছে : এক, সামাজিক প্রশিক্ষণ-প্ৰলক্ষণ মতবাদ এবং দুই, ফ্রয়েডীয় স্যুপারইগো মতবাদ। (এই লেখকের ‘শিশুর মন ও শিক্ষা’ বইটিতে প্রাসঙ্গিক এবং ‘দর্শন ধর্ম বিজ্ঞান ও আমরা’ গ্রন্থে বিশেষ আলোচনা করা আছে।) অভিভাবকরা অবহিত হবেন এবং নিজ নিজ মতে ও পথে যথাকর্তব্য নিশ্চয় করবেন যাতে সন্তান বুদ্ধিমান এবং নীতিনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

দুটি মতবাদেই বলা হয় যে আচরণের গতি-প্রকৃতি, নৈতিক মান, নৈতিক মূল্য ও নৈতিক বোধ প্রধানতই বাইরে থেকে আরোপিত হয়ে সন্তানের নিজের মূল্যবোধে পরিণত হয়। এরা দ্বিমত এইখানে যে সামাজিক প্রশিক্ষণ-প্রলক্ষণ মতবাদে (i) বিবেক এবং অপরাধবোধকে সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফসল বলে এবং (ii) উভয়কেই সুতরাং প্রকাশিত আরোপিত আচরণ বলে মনে করে। অপরদিকে ফ্রয়েডীয় স্যুপারইগো বা মনঃসমীক্ষণ মতবাদে (i) মা-বাবা-সমাজের নির্দেশ অমান্য জনিত মনোভাবের কারণে ও উৎসে জাত অবদমিত অপরাধ বোধের গর্ভে বিবেকের জন্ম এবং (ii) স্যুপারইগোর শক্তি যত বেশি বিবেকের চাপ বা শক্তিও তত বেশি হয়।

প্রথম মতবাদে মা-বাবার নীতিবোধ অনুসরণ অনুকরণ করে সন্তানরা বিবেকবান হয়; স্নেহ-ভালবাসা, যুক্তি-ব্যাখ্যার সমর্থন এবং মানসিক নৈকট্যই প্রধান— শাস্তি-পুরস্কার গৌণ। মা-বাবার সঙ্গে একাত্মবোধ সন্তানের নীতিবোধকে মনের গভীরে স্থান ও স্থিতি দেয়।

দ্বিতীয় মতে স্যুপারইগোর চাপে, অপরাধবোধের কারণে, অবদমনের প্রক্রিয়ায় নৈতিকতা দানা বাঁধে এবং মা-বাবার স্নেহভালবাসার সম্ভাব্য বঞ্চনার তাড়নায় ক্রিয়াশীল বিবেক তৈরি হয়। সম্ভানের বুদ্ধির পরিমাপ করা এবং অনুশীলনের সাহায্যে সর্বোত্তম প্রাপ্তিতে পৌঁছে দেওয়াটা বর্তমানের ভোগবাদী সমাজের প্রয়োজনেই জরুরি; সন্তানের ধারণার প্রসার ও অবহিতির পরিধি বৃদ্ধি তার ব্যক্তিত্বের উন্নতির জন্যে জরুরি। আর তার মূল্যবোধ নীতিবোধ-আদর্শবোধকে ধীরস্থির যত্নে গঠন করে দেওয়াটা জীবনের জন্যেই জরুরি— তার নিজের জীবন, মা-বাবার জীবন এবং সমাজের সার্বিক জীবনের জন্যে অত্যন্ত জরুরি।

Leave a Comment