ভয় ও উৎকণ্ঠা – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের অংশ। কোনো বর্তমান ব্যক্তি বস্তু বা ঘটনার সামনে পড়ে অথবা অনুরূপ কোনো ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা ভেবে মনে-অনুভবে তীব্র-গভীর অস্বস্তির তাড়না আসে। এটা উৎকণ্ঠা, anxiety. আবার ভয়ও প্রায় তাই—অবাস্তব ব্যক্তি বস্তু বিষয় বা অবস্থানকে কেন্দ্র করেই ভয় হয়। উভয় ক্ষেত্রেই উৎস থাকে কোনো বিশেষ অবস্থার জঠরে অথবা ছোটোবেলার লালন-পালনের প্রক্রিয়া পদ্ধতির মধ্যে।
Table of Contents
শিশুর ভয় ও উৎকণ্ঠা
২০ জনের মধ্যে ১৬ জনের বেলায় দেখা গেছে কোনো অতীত traumatic experience থেকেই nuerotic reaction দানা বেঁধেছে। ইথার দিয়ে অজ্ঞান করে টনসিল কাটা, মৃত্যু দৃশ্য বা বীভৎস হত্যা দেখে মনে ত্রাস বা আতঙ্ক ঘটে। সেখানেই কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। আবার Freudian মতে মনের conflict, মানসিক দ্বন্দ্ব, প্রায়ই অজানা-অচেনা দ্বন্দ্ব এই ধরনের ভয় বা উৎকণ্ঠা তৈরি করে দেয়।
ভয়ের ধরণ:
১. কিছু কিছু সাধারণ ভয় আছে যা ধীরে ধীরে বছর ছয়েকের মধ্যেই কমে যায়— যেমন, শব্দ-গণ্ডগোলের ভয়, অপরিচিত লোকের ভয়, হঠাৎ নড়াচড়ার দৃশ্য বা শব্দের ভয়।
২. অনেক ভয় আছে যেগুলো এই সময়ে ধীরে ধীরে বাড়ে—যেমন স্বপ্ন ভয়, জন্তু জানোয়ারের ভয়, বিপদ-আপদের ভয় ।
৩. দেখা যায় যে এই সব ভয় দ্বিতীয় বাল্যে কমে যায়, অনেকগুলো থাকে না ।
৪. স্কুলের ভয়—স্কুলে যেতে অনিচ্ছা বা অস্বীকার করা, স্কুলে গিয়ে আড়ষ্ট থাকা। মা বাবার দৃষ্টিতে বড় রকমের সমস্যা কারণ স্কুলে না গেলে, স্কুলভীতি থাকলে, কি করে চলবে। সামাজিকীকরণ মার খাবে, লেখাপড়া শিখবে কি করে? এটা কোনো ত্রাসের বা trauma-র কারণে ঘটে না। (একেবারেই না তা বলা যায় না ) ঠেঙিয়ে সিধে করা মা-বাবারা অকারণেই সন্তানের মনে ত্রাস তৈরি করে নিতে পারেন। অকারণেই!)
কেন এমন হয়
(ক) বিদ্যালয় পরিবেশ এবং অবস্থান ভয় বা উৎকণ্ঠার জনক হতে পারে।
(খ) মা-বাবাকে ছেড়ে থাকার অনিচ্ছায় হতে পারে।
(গ) মা-বাবার অভি-সুরক্ষা, অত্যধিক আড়াল-মানসিকতা, অতি-আদর প্রবণতা মা ও সন্তানের মধ্যে অতি-নির্ভরশীলতা তৈরি করে দিয়ে থাকতে পারে। ছাড়াছাড়ি হওয়া সন্ত্রাসের কারণ হয়ে শিশুকে মা-ন্যাওটা করে তুলতে পারে। মা হন শিশু ন্যাওটা। এমন ক্ষেত্রে সন্তানের হাঁপানি রোগ ধরে নিতে পারে। Psychosomatic রোগ ভোগ দেখুন ।
Psychosomatic Disorder:
রোগভোগের অসুস্থতার মতো ব্যবহারিক অস্বাভাবিকতাকেই তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়—করণের দিক থেকে : শারীরিক, মানসিক এবং মানসিক-দৈহিক (Psycho somatic) অর্থাৎ (ক) রোগের কারণ দেহজ, ভোগও তাই, (খ) রোগের কারণ মানসিক, ভোগও তাই এবং (গ) রোগের কারণ মানসিক কিন্তু ভোগটা শরীরের। তাই Psycho somatic রোগভোগের বেলায় বা অস্বাভাবিক আচরণের ক্ষেত্রে কারণকে তাড়াতে গেলে মানসিক আবেগীয় উৎসেই তাকে তাড়াতে হবে। তখন কারণ ‘নেই’ হয়ে গেলে কার্যও নেই হয়ে যাবে— ভোগ-দুর্ভোগ থাকবে না।
ছোটবেলায় এমন অনেক Psychosomatic জটিলতা তৈরি হয়। যেমন, হাঁপানি (asthma), rheumatoid artheritis, ulcerative colities, peptic ulcers। যে সকল শিশু এই ধরনের রোগে ভোগে তাদের ক্ষেত্রে সন্তান-মাতা সম্পর্ক অস্বাভাবিক —হার্দ্য নয়, উষ্ণ নয়, নৈকট্যহীন, সাদামাটা। (২) মা দোর্দণ্ড, (domineering), উৎকেন্দ্রিক (cccentric) বিরক্তি প্রবণ (irritating) সহাশক্তিহীন (intolerant ), ক্রোধান্ধ (angry) এবং (৩) মা ও সন্তানের মধ্যে একটা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার, প্রতিযোগিতার সম্পর্ক আছে।
ভয় ও উৎকণ্ঠা
অনেক ভয় আছে যেগুলো এই সময়ে ধীরে ধীরে বাড়ে—যেমন স্বপ্ন ভয়, জন্তু জানোয়ারের ভয়, বিপদ-আপদের ভয় । দেখা যায় যে এই সব ভয় দ্বিতীয় বাল্যে কমে যায়, অনেকগুলো থাকে না । স্কুলের ভয়—স্কুলে যেতে অনিচ্ছা বা অস্বীকার করা, স্কুলে গিয়ে আড়ষ্ট থাকা। মা বাবার দৃষ্টিতে বড় রকমের সমস্যা কারণ স্কুলে না গেলে, স্কুলভীতি থাকলে, কি করে চলবে। সামাজিকীকরণ মার খাবে, লেখাপড়া শিখবে কি করে? এটা কোনো ত্রাসের বা trauma-র কারণে ঘটে না। (একেবারেই না তা বলা যায় না ) ঠেঙিয়ে সিধে করা মা-বাবারা অকারণেই সন্তানের মনে ত্রাস তৈরি করে নিতে পারেন। অকারণেই!)
কেন এমন হয়
(ক) বিদ্যালয় পরিবেশ এবং অবস্থান ভয় বা উৎকণ্ঠার জনক হতে পারে।
(খ) মা-বাবাকে ছেড়ে থাকার অনিচ্ছায় হতে পারে।
(গ) মা-বাবার অভি-সুরক্ষা, অত্যধিক আড়াল-মানসিকতা, অতি-আদর প্রবণতা মা ও সন্তানের মধ্যে অতি-নির্ভরশীলতা তৈরি করে দিয়ে থাকতে পারে। ছাড়াছাড়ি হওয়া সন্ত্রাসের কারণ হয়ে শিশুকে মা-ন্যাওটা করে তুলতে পারে। মা হন শিশু ন্যাওটা। এমন ক্ষেত্রে সন্তানের হাঁপানি রোগ ধরে নিতে পারে। Psychosomatic রোগ ভোগ দেখুন ।
Psychotic শিশু এবং Psychosomatic শিশুর বেলায় এখানেই একটা প্রভেদ থাকে :
সাইকোটিক শিশুর বেলায় মা দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখান না, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। বরং কেমন যেন যত্নহীন, সন্তানের প্রতি নজরহীন, অসংবেদনশীল। এমন কি সন্তানের অব ব্যবহারের জন্যেও তেমন দুর্ভাবনাহীন হয়ে থাকেন। একজন বিজ্ঞানীর অনুসন্ধানে পরিবারের সাধারণভাবে এবং মায়ের বিশেষ করে অতি-সুরক্ষার মনোভাব, over pro tectiveness, সন্তানের হাঁপানির একটা কারণ বলে ধরা পড়েছে।
Excessive aggressive behavior আক্রমণাত্মক ব্যাপারটা সহজে বোঝা গেলেও তা অত্যধিক কিনা তা বোঝা বেশ শক্ত। এ ব্যাপারটা আপেক্ষিক, তুলনামূলক। কিন্তু এই ধরনের ব্যবহারের কারণ বের করা যায়। মা-বাবার প্রশ্রয়, শাবাশি দেওয়া, পুরস্কৃত করা বাহবা দেওয়া ইত্যাদি এর মূলে। তাছাড়া জীবন্ত ও প্রতিকী দৃশ্য ঘটনা প্রত্যক্ষ এবং তার অনুকরণ, অনুগ বাতাবরণ, সদর্থক বা ইতিবাচক ফলাফল এই রকমের ব্যবহারকে বাড়িয়ে তোলে। বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় কাটছাঁট হয়ে কমে যায়।
৩৬ টি নার্সারি শিশুকে নিয়ে ৯ মাস ধরে ২৫০০ আক্রমণাত্মক ব্যবহারের খতিয়ান তৈরি করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন :
(১) বাধা পেলে বা বিপরীত প্রতিক্রিয়া ঘটলে আগ্রাসী শিশু পথ পাল্টায়, অন্য উপায় ও লক্ষ্য ঠিক করে নেয়।
(২) অন্যথা বেড়েই যায়, লক্ষ্য পাল্টায় না।
আগ্রাসী, আক্রমক, লড়াকু, রণং দেহি ব্যবহার বা আচরণ। দুরকমের অবস্থায় ঘটতে পারে : এক, উদৃক্ত হয়ে provoked —শিশু এমন অবস্থায় পড়তে পারে যে আগ্রাসী ভূমিকা নিতে বাধ্য। একে বলা হয়েছে elicitors of aggressiveness. দুই এমন অবস্থা যা শিশুকে আগ্রাসী হতে উদ্বুদ্ধ করে, শেখায়, উৎসাহিত করে। আমরা দ্বিতীয়টি নিয়েই আলোচনা করেছি – Cultivators of aggressive behavior.
উক্তকারী অবস্থার মধ্যে frustration aggressive response পড়ে। শিশুদের বেলায় উদ্দেশ্যমুখী কোনো কাজে যখন বাধা আসে, লক্ষ্য যখন সহজভাবে পূরণ হতে পারে না তখনই সে লড়াকু হয়। আবেগীয়ভাবে শিশু ক্ষুব্ধ হলে, উত্তেজিত হলে বা প্রতিহত হলে সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে, আগ্রাসী হতে পারে। ছেলেরা বেশি, মেয়েরা কম। সামাজিক প্রথা এবং শিক্ষা ইত্যাদি এই পার্থক্যের মূলে।
অনেকে মনে করেন এমন অবস্থায় ঝগড়া করা বা বাক্যযুদ্ধের বন্যা ছুটিয়ে দেওয়া মনের গরুলকে, উত্তেজনাকে প্রশমিত করার পথ, আসলে তা নয়। এতে করে আঘাত দেবার ইচ্ছেটা কমে তো নয়ই বরং বেড়ে যায়। মনের আগুনে বাকবিতণ্ডার ঘি দেওয়া।
Social learning of aggressive behavior:
উদ্বোধিত করা, শেখানো চর্চা করার মাধ্যমে আগ্রাসন বা লড়াকু ব্যবহার।
১. আগ্রাসী কাজের জন্যে প্রশংসা বা শাবাশি পাওয়া।
২. রণং দেহি মডেল, খেলা এবং সরঞ্জাম নিয়ে যারা খেলতে অভ্যস্ত।
৩. বাবার সঙ্গে ধস্তাধক্তি খেলা, হুড়োযুদ্ধি করা, ঘুষোঘুষি খেলা, Punching bag বা Bobo doll-এ ঘুষি মারা, আক্রমণ করা
8. ছেলেকে ‘পুরুষ’ বানানোর চেষ্টা, a ‘real boy’ তৈরি করা। ৫. TV-তে আক্ৰমণ-প্রতিআক্রমণের উপাখ্যান, গল্প। যুদ্ধ, সংঘর্ষ, উৎপীড়ন ইত্যাদি ৷ (এই প্রসঙ্গে আমার ‘শিশুর তত্ত্বাবধান’ বইতে বিস্তারিত বলা আছে)
মা বাবার কাছে প্রশ্নটা সোজা : কি করা যায়, কি ভাবে এই ধরনের অব ব্যবহারের হাত থেকে শিশুদের বাঁচানা যায়। প্রশ্নটা চিকিৎসার, শিক্ষার, লালন পালনের । চার প্রকারের পদ্ধতি এখানে আলোচিত হবে। দেখে শুনে ব্যক্তিগত সমস্যার নিরিখে প্রক্রিয়া পদ্ধতি অনুসরণ করাই বিধেয়।
১. মনোবিশ্লেষণ পদ্ধতি- Psychoanalytic method of Freud :
(ক) ব্যবহারের বা আচরণের সমস্যার উৎস হলো প্রাথমিক জৈব বাসনা কামনার সংঘাত। মনের গভীরতম অংশে। Id আছে, Libidinous urges আছে। এই বাসনা পূরণের পথে সংঘাত ঘটে। বিকৃত ব্যবহার বা আচরণের সমস্যা এই গভীর সংঘাতের বহিপ্রকাশ, symptoms.
(খ) Id স্তর বা অবচেতন স্তর ছাড়া আছে মনের সজ্ঞান বা সচেতন স্তর। এখানেই আছে ব্যক্তির Ego যিনি সচেতন বাসনাকামনার জগতকে পরিচালিত করতে চান। (গ) আছে প্রাক-চেতন স্তর যেখানে আছেন superego মহাশয়।
এই superego ব্যক্তির বিবেকের কাজ করে, মূল্যায়নের হাকিম। অথচ জন্মে এবং কর্মে ইনি বালসুলভ যুক্তিহীন, গোঁড়া, একগুঁয়ে, পরমতঅসহিষ্ণু ইত্যাদি। (গ) চিকিৎসা বা ব্যবহার শুধরানোর প্রক্রিয়া সুতরাং এই রকম : অবচেতনের কামনা বাসনার সংঘাতকে সচেতন স্তরে তুলে এনে সংঘাতের উৎসটিকে উৎপাটিত করা, নির্মূল করা, মিটিয়ে ফেলা বা resolve করা।
তাহলেই প্রলক্ষণ সমূহও symp toms গুলোও অপনিত, অপসারিত হয়ে যাবে। যে পদ্ধতিতে এই কাজটি করা হয়, করা সম্ভব তাকেই বলে মনঃ সমীক্ষণ, psychoanalysis. প্রক্রিয়াটি এই রকম : খোলামেলা আলোচনায় সংঘাতের মূল খুঁজে পাওয়া (by free verbal association) স্বপ্ন বিশ্লেষণ (dream interpretation) এবং ব্যাখ্যায় সংঘাতের মূলে পৌঁছানো, রুগী-ডাক্তার নিকট সম্পর্ক গড়ে তুলে উৎস আবিষ্কার (Patients therapist relationship and thus ‘working through’ the conflict) একটা উদাহরণ : হানস, ৫ বছর।
ঘোড়ার ভয়। অদ্ভুত এবং অস্বাভাবিক সেই ভয়। ঘরের বাইরে যেতে চায় না। ভয় পায়। এমন অবস্থা। Freud প্রকল্প তৈরি
করলেন—Hans oedipus complex এ জড়িয়েছে, ভুগছে। অর্থাৎ Hans অবচেতনে মাকে চাইছে, বাবাকে ঘৃণা করছে; এবং একই সঙ্গে বাবার প্রতি ভালবাসা আছে, ভয় আছে। এই ভয়টাই ঘোড়ার প্রতীকে বদলি হয়ে গেছে— ক্ষেত্র-পাত্র-চ্যুত হয়েছে। ঘোড়ার মুখের বল্গা, চোখের ঠুলি আসলে ওর বাবার গোঁফজোড়া এবং চশমাজোড়ার প্রতিরূপ হয়েছে। চিকিৎসা কি হল ? Hans-এর বাবা ছেলের যাবতীয় বলা কথা, এবং তথ্যকে ধীরে ধীরে একে একে Hans এর সচেতন মনে তুলে দিলেন, বলে বলে পরিষ্কার করে দিলেন।
স্নেহের বাতাবরণে এবং ঐকাস্তিকতার পরিবেশে বাবার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে Hans বললো—সে চায় তার বাবা মারা যাক, মাকে সে বিয়ে করতে চায়। মূল সংঘাত সামনে চলে এলো। (Apirl 25, 1908) ধীরে ধীরে Hans স্বাভাবিক হয়ে গেল। ঘোড়ার ভয় আর রইলো না। (আমার ‘দর্শন ধর্ম বিজ্ঞান ও আমরা’ বইটিতে স্বপ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা আছে— দেখতে পারেন) শিশুর মনে আবেগের জট পাকায়। ব্যক্তি ঘটনা-বিষয়-ব্যবহার জট পাকাতে পারে। সংঘাত, দ্বন্দ্ব।
Emotional fixation:
মনোবিশ্লেষণ পদ্ধতিতে বড়দের বেলায় অনেক সাহায্য পাওয়া যায়, নিজেরাই সমস্যা নিয়ে আসে। কিন্তু ছোটনের বেলায় ব্যাপারটা অন্যরকম বলে একটু কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত শিশুরা বড়দের মতো free associa tion-এ, খোলামেলা কথাবার্তায় নিজ নিজ মনের গভীরে বা অতীত যোগাযোগে ততটা সহজে যেতে পারে না।
তাই শিশুদের বেলায় –
১. খেলাধুলো করার সময় ওদের পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
২. মা-বাবার সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক বিচার বিশ্লেষণ করতে হয়।
৩. বুঝতে এবং বোঝাতে হয় শৈশব যৌন প্রেষণা—বাসনার কোন কোন অংশ সামাজিক ও কৃষ্টিয় কারণে অপূরণ যোগ্য।
৪. শিশুর যাবতীয় ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার পর্যালোচনা করে গুপ্তসুপ্ত বাসনার উৎস, সমস্যার কেন্দ্রে, দ্বন্দ্বের মূলে যেতে হয় । প্রকৃত কারণ শিশুর সচেতন মনে তুলে দিলেই, মেলে ধরলেই শিশুর অবচেতনের সংঘাত আর সংঘাত থাকবে না। তখন আচরণের বিকৃতি অব-ব্যবহার অপনিত হয়ে যাবে, নির্মূল হবে।
মা-বাবার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধীর স্থির বিচার বিশ্লেষণ, আবেগহীন তথ্যান্বেষণ এবং প্রত্যয়বান প্রচেষ্টা শিশুকে স্বাভাবিক আচরণে ফিরিয়ে আনতে পারে। অন্যথা মনোচিকিৎসকরা আছেন। Non Directive Play Therapy: Virginia Axline প্রধান প্রবক্তা। বলছেন –
১. প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে নিজেকে গড়ে তোলার, আত্ম উপলব্ধির একটা গভীর শক্তি আছে।
২. নিজের মধ্যেই সেই উৎসমুখটি আছে যা প্রত্যেককে পূর্ণতার দিকে, স্ব-অধীন প্রাপ্তির দিকে, স্ব-চেষ্ট দিক-নিদেশটি দিয়ে থাকে।
৩. একটি চারা গাছ যেমন পুষ্ট জমি, কাঙিক্ষত সেচন এবং প্রয়োজনীয় বাতাস চায়—বৃদ্ধির জন্যে, তেমনি প্রত্যেক শিশু চায় সুযোগ্য বাতাবরণ (Permissive ness to be himself) নিজের তুষ্টি এবং অপরের স্বীকৃতি (Complete accep tance of himself—by himself and by others) এবং ব্যক্তি হয়ে বেড়ে ওঠার অধিকার (rights to be an individual).
৪. যে কোনো রকমের বাধা পড়লেই, প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলেই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, বিরক্তি এবং প্রতিরোধ দেখা দেয়। আত্ম-উপলব্ধির শক্তিটি সতেজ থাকে বলে হয় (ক) সংঘাত, প্রকাশিত যুদ্ধঘোষণা অথবা অব-ব্যবহার ঘটে যায়, নয়তো (খ) সেই শক্তি মনের গভীরে থেমে গিয়ে এক রণংদেহি শক্তিকুণ্ড তৈরি করে, অবদমন ঘটায়, অগ্নুৎগারী সম্ভাবনা তৈরি করে। Inner conflict. ফলে—
৫. একা একা হয়ে যায়, দিবাস্বপ্নে ঝুঁকে পড়ে, চাপে ও তাপে পশ্চাদমুখি হয়ে যায় এবং অব-ব্যবহারে mal-adjusted behavior-এ প্রবণ হয়ে ওঠে। এই Non directive play therapy-র মতে শিশুকে চিন্তা করার, সিদ্ধান্ত নেবার এবং আত্ম-উপলব্ধির সুযোগ দেবার কথা বলা হয়েছে।
এই পদ্ধতিতে Anna Freud ( Freud কন্যা)-র মতো খেলাকে মনোবিশ্লেষণের জন্যে মাধ্যম বলা হয়নি। বরং সোজাসুজি জেনে নেবার কথা বলা হয়েছে—শিশুর অরক্ষিতবোধ, ভয়, বিভ্রান্তি, আগ্রাসন এবং উৎকণ্ঠা—তিনি (Axline) আট রকমের পথ নির্দেশ রেখেছেন :
১. চিকিৎসক (অথবা মা-বাবা, আপনজন কেউ) শিশুর সঙ্গে উষ্ণ, হার্দ্য, সম্পর্ক গড়ে তুলবেন।
২. শিশুর তৎকাল অবস্থাকে ঠিক যেমন আছে তেমন করেই স্বীকার করে নেবেন। মেনে নেবেন।
৩. খোলামেলা বাতাবরণ তৈরি করবেন যেন শিশু খোলামনে নিজের সব কথা বলতে পারে।
৪. শিশুর অনুভবকে মূল্য দেবেন, নিজের অভিভাবনাকে তুলে ধরবেন যাতে করে শিশুর মনে নিজেকে নিয়ে ভাবনাটা বীক্ষণে পৌঁছোয় এবং নিজের আচরণকে আবার ভেবে দেখার সুযোগ পায়।
৫. শিশু যে নিজেই নিজের সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম সেই বিশ্বাসটি শিশুর মনে সঞ্চারিত করে দিতে হবে।
৬. শিশু নিজে নিজেই পথ খুঁজে নেবে, এগোবে। চিকিৎসক সঙ্গে সঙ্গে অনুসরণ করবেন।
৭. চিকিৎসক কখনই তাড়াহুড়ো করবেন না—পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া ব্যবহারে ।
৮. বাধা বিপত্তি এবং যতোরকমের প্রতিবন্ধকতা আছে বলে শিশু মনে করছে সে সব বিষয়ে সহানুভূতিশীল হয়ে পথ দেখাবেন। বাস্তবতা বোধে শিশুকে উদ্বোধিত করবেন। সম্পর্ক গঠনে এবং আচরণে শিশুকে প্রবণ করে তুলবেন ।
Psychoeducational approach : Re-Ed APPROACH :
মারাত্মক ভাবে অব-ব্যবহার পীড়িত, আত্যন্তিক পর্যুদস্ত শিশুদের বেলায়—বিশেষ করে স্কুলের মধ্যে, যেখানে এই শিশুরা একেবারেই মানিয়ে চলতে পারে না— Re-Ed (পুনঃ শিক্ষণ) ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষক উপদেষ্টা (বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত)-দের আওতায় চব্বিশ ঘণ্টা স্বতন্ত্র স্থানে ও বাতাবরণে এদের শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এই শিক্ষক উপদেষ্টারা (Teacher-counselors) সর্বক্ষণের সঙ্গী হবেন—খাওয়া, খেলা, ঘুমানো, পড়াশুনো বেড়ানো সবই। আবার এঁরাই শিক্ষক, মানসিক শারীরিক স্বাস্থ্যোদ্ধারকারী, নেতা, পেশাগত উপদেষ্টা এবং মাতাপিতার পরিবর্ত প্রতিনিধি। অনেক আরও কথা।
Behavior Modification :
(অথবা Behavior Therapy ব্যবস্থা আছে) : ব্যবহারের যাবতীয় সমস্যাকে ব্যবহারেরই সমস্যা বলে ধরে নিয়ে ব্যবস্থার কথা আছে এই পদ্ধতিতে। মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সংঘাতের অপনয়নের কথা নেই। বলা হয়েছে, প্রায়োগিক দিক থেকে, ব্যবহারের বিকৃতিকে সোজাসুজি manipulate করে স্বাভাবিক করে দেওয়া যায়। এই প্রচেষ্ঠার ধাপগুলি (১) সোজাসুজি পর্যবেক্ষণ (direct observation) (২) প্রথাসিদ্ধ manipulation এবং (৩) বার বার মূল্যায়ন (Repeated assessment).
১. Direct observation : যে কোনো ব্যবহারের অ-স্বাভাবিকতা বা বিকৃতিকে সোজাসুজি দেখে তার উপাদান বা অংশগুলিকে নোট করে নিতে হবে। বিশেষ বিশেষ দিকগুলোকে স্বতন্ত্র করে বুঝে নিতে হবে। আচরণের প্রকাশিত দিক বা দিকগুলিই সংশোধনের বিষয়। সামান্য সার্বিক ধারণা—যেমন ব্যক্তিত্ব, আন্তর সংঘাত ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক নয়। যার পরিবর্তন বা সংশোধন চাই, তাই দেখা দরকার।
২. Systematic manipulation : বিস্তারিত এবং বিশেষ পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে ব্যবহারের এক একটা দিককে নিয়ে পরিবর্তন সাধন করতে হবে modify করতে হবে, manipulate করতে হবে যাতে আচরণ পাল্টায়, ফলাফল ধরা পড়ে, কাজ সহজে এবং প্রথাগতভাবে ঘটে যাবে।
৩. Repeated assessment : পদ্ধতিটি প্রায়োগিক। ‘যা ফলদায়ক তাই ঠিক’ (that which works is true) আচরণে হস্তক্ষেপ করে দেখতে হবে কাঙ্ক্ষিত ফল প্রসব করলো কিনা। যদি না ফলে থাকে তাহলে পথ পাল্টাতে হবে manipu late অন্যভাবে করতে হবে। এবং আবার ফলাফল দেখতে হবে।
নাবালক শৈশবের অব-ব্যবহার, বিকৃতি, অস্বাভাবিকতা এবং সাবালক জীবনে প্রভাব ঃ
প্রশ্নটি বাস্তব। সমস্যাটিও বাস্তব।
অনেকেই এই না-বালক অবব্যবহারকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আসলে অব-ব্যবহার বা abnormal ধারণাটিই তেমন স্পষ্ট নয়। উদাহরণ হিসেবে নখ খাওয়া ব্যাপারটাই নেওয়া হয়েছে, nail-biting. Kanner এই সমস্যাটি নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন।
বলছেন নখ-কাটা কে ১৯০৮ এ মনে করা হচ্ছে যাচ্ছেতাই অভ্যেস — Stigma of digeneration. ১৯১২ এ মনোবিকলনের নিদর্শন – Psychopathic symptom. ১৯৩১ এ ইদিপাস কমপ্লেক্স- unresolved Oedipus Complex. দেখেশুনে স্কুলে স্কুলে পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা গেল শতকরা ৬৬ ভাগ শিশুরাই নখ কাটে বা কোনো না কোনো সময়ে নখ কেটেছে। Kanner বললেন—এটা কি বাস্তব এবং ভাবা যায় যে আমাদের সন্তানদের দুই তৃতীয়াংশই degenerate….?
”
Robins বললেন যে-সব সন্তানরা ছোটবেলায় নখ কাটা, নাক খোঁটা, ভীতুর ডিম এবং হস্তমৈথুনে অভ্যস্ত ছিল তাদের অধিকাংশই বড় হয়ে সুস্থ স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠিত জীবন যাপন করছে। শৈশবের ভয়, চিরবিরে স্বভাব (irritability) এবং স্নায়বিক দুর্বলতা (nervousness) সাবালক জীবনে বিশেষ কোনো অব-ব্যবহারের কারণ হয়নি।
এমন কি ছোটমোট যৌন পতনগুলোও বড়ো বেলায় যৌন ব্যবহারের পতন সূচিত করেনি। তাছাড়া দেখা যাচ্ছে যে লাজুক, একাচোরা, চুপচাপ থাকা বাচ্চা মাত্ৰেই বড় হয়ে নিউরটিক হয় না ।
তাহলে? অসামাজিক ব্যবহার এবং আক্রমণাত্মক ব্যবহারের বেলায় কি হবে? Robins (1966) দীর্ঘ মেয়াদি পর্যবেক্ষণ করেন। ৫০০ শিশুকে অনুসরণ পর্যবেক্ষণ করেন সাবালক কাল পর্যন্ত। ফলাফল খুবই পরিষ্কার :
১. অসামাজিক বাল্য ব্যবহার (ধৃষ্ট সামাজিক আচরণ) সাবালক অবস্থায় তেমনি ব্যবহারের নির্দেশক—আগ্রাসী, ভাঙ্গচুরকারী, ত্রাসসৃষ্টিকারী আচরণ, চুরি, অনৈতিক যৌন আচরণ ইত্যাদি ব্যবহার।
২. ছোটবেলায় ইতিহাস আছে এমন শিশুদের শতকরা ৩৭ ভাগ বড় হয়ে অবমানস সাবালক হয়েছে, psychopath adults হয়েছে। আবার এমন পূর্ব ইতিহাস নেই। তেমন কাউকেই অনুরূপ-দের মধ্যে দেখা যায়নি।
৩. Controls দের তুলনায় ‘ইতিহাসবান’ history-sheetersদের সমাজ দ্রোহী বা ধৃষ্ট আচরণের পরিমাণ ২.৫ গুণ বেশি।
৪. শুধু ধৃষ্ট সামাজিক বা অসামাজিক আচরণের ক্ষেত্রেই নয় controls দের তুলনায় এরা শতকরা ৫০ ভাগ বেশি মানসিক বিকারগ্রস্ততায় ভোগে—এবং অনেক বেশি psychotic, alcoholics হয়।
৫. যে শিশুর ৬ দফা অসামাজিক আচরণের প্রলক্ষণ বা দাগ আছে বড় হয়ে তার পক্ষে স্বাভাবিক সাবালক হবার পরিমাণ শতকরা ১৫ ভাগ। আর যার ১০ বা তার বেশি দফার অসামাজিক আচরণের প্রলক্ষণ আছে তার বেলায় সেই সম্ভাবনা মাত্র শতকরা ৫ ভাগ।
Field (1969) এর পর্যবেক্ষণ এই ভবিষ্যদ্বাণী করার সম্ভাবনাকে সমর্থন করেছে—ছোটবেলার ধৃষ্ট সামাজিক আচরণ দেখে সাবালক কালের আচরণের বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার সম্ভাবনাকে ।
৬. দেখা গেছে যে যে সব শিশুরা সমশ্রেণীর peergroup প্রতি বিরক্তিদায়ক ব্যবহারে অভ্যস্ত, নানারকমের বাধা বন্ধকতা তৈরি করেছে, তারা সাবালক কালে ‘ভেঙ্গে পড়া’ গোছের ব্যক্তিত্ব পেয়েছে।
আসলে ব্যাপারটা বিপরীত দিক থেকে দেখা হয়েছে। Kohlberg, 1972 : যারা বয়সকালে ‘ভেঙ্গে পড়া হতাশায়’ পীড়িত তাদের ছোটবেলাটা ঐ রকম বিরক্তিকর ‘ব্যবহারাদিতে প্রণোদিত ছিল। এই follow-back পদ্ধতির বা পিছনে অনুসন্ধান পদ্ধতির সমালোচনা হয়ে থাকে। তাই সম্মুখ-দৃষ্টি অনুসন্ধানের ব্যবস্থা হয়েছে। Prospective বা follow up অনুসন্ধান। দেখা গেছে তারাই ভেঙ্গে পরে, অস্বাভাবিক ব্যবহারে প্রবণ হয় যারা
১. অশান্ত এবং অসুখী পরিবারের সন্তান।
২. ছোটবেলায় মাঝে মাঝেই অপ্রকৃতিস্থতার শিকার, অস্বাভাবিক বাধো বাধো ব্যবহারে অভ্যস্ত।
৩. মা-বাবার মধ্যে একজন যেখানে সিজোফ্রেনিক।
৪. বহুবিধ পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে—
(ক) কষ্টকর জন্ম প্রক্রিয়া
(খ) গৃহে পরিবারে সংঘর্ষ সংঘাত
(গ) কম IQ
(ঘ) স্কুলে বেশি বেশি বেনিয়ম ব্যবহার।
(ঙ) বেশি আত্মকেন্দ্রিক
(চ) শব্দ-সংযোগ পরীক্ষায়, word association test-এ ছাড়া ছাড়া উত্তর এবং
(ছ) শ্রুতিকটু ধ্বনির প্রতি বেশি বেশি প্রতিবর্ত প্রতিক্রিয়া—এই সবই শিশুর অস্বাভাবিক সাবালক জীবনকে প্রভাবিত করে।
