নবজাতকের প্রস্রাব-পায়খানা

নবজাতকের প্রস্রাব-পায়খানা – নিয়ে আজকের আলোচনা। নবজাতকের প্রস্রাব-পায়খানা বিষয়টি “শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা” বিষয়ক একটি গুরুত্বপুর্ন পাঠ। প্রায়ই দেখা যায় নিউবর্ন বা নবজাতক শিশু স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলেও তার মা-বাবা তাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত থাকে। তারা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। করোনাকালে তারা হয়তোা সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন। করোনা মহামারীতে নবজাতকের স্বাভাবিক বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে যাতে অভিভাবকের ঘর থেকে বের হতে না হয়, সে বিষয়ে আজকের আলোচনা।

নবজাতকের প্রস্রাব-পায়খানা

নবজাতকের প্রস্রাব-পায়খানা | শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা

সাধারণত একটা শিশু জন্মের দিন থেকে ২৮তম দিন পর্যন্ত, তাকে নবজাতক বলা হয়। জন্মের পর নবজাতকের স্বাভাবিক ওজন হচ্ছে আড়াই থেকে ৪ কেজি। যদি কোন নবজাতকের ওজন এর থেকে কম বা বেশি হয় তাহলে সেক্ষেত্রে আমরা এটাকে স্বাভাবিক ওজন বলবো না।

এখন প্রশ্ন আসে- জন্ম ওজন স্বাভাবিক না হলে শিশু কি সারভাইভ করতে পারবে?

হ্যাঁ পারবে। তৃতীয় বিশ্বে আমরা যে সমস্যায় বেশি সম্মুখীন হয়, সেটা হচ্ছে লো বার্থ ওয়েট বা কম ওজন। আমাদের দেশে বর্তমানে ১৭০০/১৮০০ গ্রাম এর শিশুরা বেঁচে যাচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যে সকল বাচ্চার ওজন এক কেজির কম। ১৫০০ থেকে ১৮০০ গ্রামের শিশুকে আমরা বাসায় রেখেই চিকিৎসা দিয়ে থাকি। যদি তার অন্য কোন সমস্যা না থাকে। এক্ষেত্রে আমরা নরমাল কেয়ারের পাশাপাশি এক্সট্রা কিছু কেয়ার দিয়ে থাকি।

যদি জন্ম ওজন বেশি হয় সে ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে শিশুর কিছু যত্ন নিতে হয় সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

মাঝে মাঝে নবজাতকের অভিভাবকরা আমাদের কাছে এসে বলেন শিশু অনেক ঘুমায়। এখন এক্ষেত্রে বলছি, একজন নবজাতকের প্রতিদিন ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমানো স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু নবজাতক যদি অতিরিক্ত ঘুমায় সেটা আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করতে হবে।

নবজাতকের অনেক বিষয় আমরা সহজে বুঝতে পারি না। আমাদের কাছে অনেক সময় অভিভাবকরা এসে বলেন বাচ্চা প্রস্রাব কম করছে। এখন প্রথমদিন বাচ্চার দিনে একবার প্রস্রাব করাই যথেষ্ট। দ্বিতীয় দিন এক থেকে তিনবার প্রস্রাব করাই যথেষ্ট। কারণ এই সময়ে মায়ের দুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে আসে না। তৃতীয় দিনের ক্ষেত্রেও এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু বাচ্চা যদি একেবারেই প্রস্রাব না করে সেটা চিন্তার বিষয়। এখন বাচ্চাটা পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার পাচ্ছে কিনা সেটা আমাদের বুঝতে হবে। এটা আমরা বুঝতে পারব বাচ্চা যদি দিনে ছয় থেকে আটবার প্রস্রাব করে।

অনেক সময় অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন থাকে যে বাচ্চা প্রস্রাব করছে, কিন্তু কাঁদছে। এক্ষেত্রে তারা মনে করেন বাচ্চা হয়তো পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ পাচ্ছে না। কিন্তু বাচ্চা আসলে অনেক কারণে কাঁদতে পারে। এক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য আপনারা বাচ্চার ওজন মনিটরিং করতে পারেন।

একটা বাচ্চার জন্মের পর পর তার কিছু ওজন লস করবে। বাচ্চার জন্মের ১০ থেকে ১৪তম দিনে সে তার জন্ম ওজনে ফিরে আসবে। মানে হচ্ছে প্রথম দশ দিনে তার ওজন কিছুটা কমে গিয়ে আবার তার জন্ম ওজনে ফিরে আসবে। অর্থাৎ তার ওজন যদি ২৭০০ গ্রাম থাকে তাহলে ওজনটা কিছুটা কমে গিয়ে দেখা গেলো সপ্তম দিনে তার ওজন ২৫০০ গ্রাম হয়েছে। সেই ওজনটা দেখা গেল ১০ থেকে ১৪তম দিনে তার বার্থ ওয়েট রিগেইন করেছে। তাহলে সে পর্যাপ্ত মায়ের দুধ পাচ্ছে।

অনেক সময়ে অভিভাবকরা দুশ্চিন্তার কারণে ৫ম দিনে এসে আমাদের কাছে বলেন বাচ্চা শুকিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চা হয়তো পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের দুধ পাচ্ছে না। তখন তাকে ইনফেন্ট ফর্মুলা দিয়ে দিচ্ছে।

অনেক সময় নবজাতক বাচ্চার মায়েরা আমাদের কাছে এসে বলেন বাচ্চা অতিরিক্ত কাঁদছে। এক্ষেত্রে যে কাজটা করতে হবে বাচ্চাকে খাওয়ানোর পর ঢেকুর তুলে দিতে হবে। কারণ বাচ্চারা যখন মায়ের দুধ খায়, তখন সে পরিবেশ থেকে কিছু বাতাস গিলে ফেলে। এটা এমন না যে মায়ের দুধের কারণে তার এসিডিটি হচ্ছে। এক্ষেত্রে তাকে কোনো প্রকার ওষুধ দেওয়ার দরকার নেই। বারপিং বা ঢেকুর তুলানোর মানে হল বাচ্চা পরিবেশ থেকে যে বাতাসটা গিলে ফেলছে, সেটা বের করে দেওয়া।

 

জন্মের পর নবজাতকের প্রস্রাবের বিষয়ে যা মাথায় রাখবেন:

১। জন্মের পর নবজাতক সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম প্রস্রাব করে । তবে অনেক সময় ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সে প্রস্রাব করতে পারে, যা হয়তো কারো চোখেই পড়ে না। সেক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার ভেতর সে আর প্রস্রাব নাও করতে পারে ।

২। শিশু যদি ঠিকভাবে খায়, বিশেষ করে মায়ের দুধ, তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রস্রাব না করলেও, উদবিগ্ন না হয়ে আরও কয়েক ঘণ্টা (৪/৫ ঘণ্টা) অপেক্ষা করা যেতে পারে। এ সময়ের মধ্যে প্রস্রাব না হলে, অবশ্যই শিশুকে হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অথবা কোনো চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে ।

৩। জন্মের পর কয়েকবার (২/৩ বার) নবজাতক লালচে রঙের প্রস্রাব করতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই। তবে দুই তিনবারের বেশি লালচে প্রস্রাব হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে ।

 

নবজাতকের প্রস্রাব-পায়খানা | শিশুর প্রতিদিনের পরিচর্যা

 

 

৪। নবজাতকের প্রথম পায়খানা কালচে ও সবুজ হতে পারে। কালো পায়খানার কারণ হচ্ছে মিকোনিয়াম। জন্মের প্রথম তিন-চার দিনের মধ্যে সাধারণত পায়খানা এভাবে চলে যায়। শিশু শুধু মায়ের দুধ খেলে দৈনিক ৫/৬ বার পায়খানা করতে পারে । কিন্তু টিনের গুঁড়ো দুধ খেলে সাধারণত ৩/৪ বারের বেশি পায়খানা করে না ।

 

নবজাতকের প্রস্রাব-পায়খানা

 

একজন নবজাতক জন্মের পর থেকে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম পায়খানা করার পর মাতৃগর্ভে যে কালো মিকোডিয়াম থাকে, সেটা ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যদি একবারও অতিক্রম করে, এরপর যদি ৫ থেকে ৭ দিনে পায়খানা একবার করে, এটা যেমন নরমাল, আবার যদি দিনে ২০বার করে সেটাও নরমাল ব্যাপার।

 

নবজাতকের প্রস্রাব ঠিকমতো হচ্ছে কি না, কীভাবে বুঝবেন?

শিশু জন্মের পর অনেক সময় ১০ থেকে ১২ বারও প্রস্রাব- পায়খানা করে। আবার অনেক শিশু তেমন বেশি করে না। কোনটি নবজাতকের জন্য ভালো? বা নবজাতকের প্রস্রাব- পায়খানা ঠিকমতো হচ্ছে কি না, বোঝায় উপায় কী?

এ বিষয়ে এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ৩৫৫০তম পর্বে কথা বলেছেন ডা. আবু তালহা। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হসপিটালে শিশু বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।

প্রশ্ন : নবজাতকে প্রস্রাব ঠিকমতো হচ্ছে কি না, বোঝার উপায় কী?

উত্তর : শিশু জন্মের এক থেকে দুই সপ্তাহ পর থেকে একটা বাচ্চা যদি, দিন ও রাতে ছয় অথবা তার বেশি বার প্রস্রাব করে, তাহলে আমরা বলি এ বাচ্চার প্রস্রাব ভালো রয়েছে। এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় সম্পর্কিত রয়েছে

অনেক সময় দেখবেন, বাচ্চার বৃদ্ধি ঠিক রয়েছে। তবে মা-বাবা দুশ্চিন্তা করে, আমার বাচ্চা ওইভাবে খাচ্ছে না বা আমার বাচ্চা কাঁদছে- সে ক্ষেত্রে একটি বাচ্চা যদি দিনে অথবা রাতে ছয় বা তার বেশি প্রস্রাব করে, তাহলে বুঝতে হবে, বাচ্চাটির আসলে খাওয়া-দাওয়া ঠিক হচ্ছে। শুধু একটি নবজাতক যদি স্তন পান করে, অন্য কিছু যদি তাকে না দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে একটি বাচ্চা দেখা যায়, দুই থেকে তিন দিন পর পায়খানা করলে কোনো সমস্যা নেই। আবার দিনে সে যদি ১৩ থেকে ১৪ বারও পায়খানা করে সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। পায়খানা- প্রস্রাব ঠিকমতো হচ্ছে, এটিই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়।

Leave a Comment