সন্তান জন্ম একটি স্বাভাবিক, কিন্তু গভীর শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির প্রক্রিয়া। অনেকেই মনে করেন, শিশুর যত্ন শুরু হয় তার জন্মের পর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সুস্থ ও সবল সন্তানের জন্য গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। মায়ের সঠিক পুষ্টি, মানসিক প্রশান্তি এবং চিকিৎসা নির্দেশনা মেনে চলাই শিশুর সুস্থ ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দেয়।

Table of Contents
গর্ভাবস্থা থেকে মা ও শিশুর যত্ন
১. গর্ভাবস্থায় মায়ের যত্ন
✅ পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস:
- গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ সুস্থ শিশুর জন্ম নির্ভর করে মায়ের শরীরের সঠিক পুষ্টির উপর।
- শুধুমাত্র “বেশি খেলে বাচ্চা বড় হবে”—এই ধারণা সঠিক নয়। বরং মা যেন পর্যাপ্ত প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, মিনারেল, ফ্যাট, ভিটামিন ও পানি গ্রহণ করেন, সেটাই জরুরি।
✅ দৈনন্দিন যত্ন:
- ভারী কাজ বা ভারী জিনিস তোলা একেবারেই এড়িয়ে চলতে হবে।
- পরিবার ও স্বামীর সহানুভূতি ও সহযোগিতা মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
✅ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক:
- গর্ভাবস্থার তৃতীয় ত্রৈমাসিকে (Third Trimester) স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্ক পরিহার করা উচিত, কারণ এতে পানি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
✅ স্তনের যত্ন:
- স্তনের বোঁটা যদি সমতল বা ভোতা হয়, তবে শিশুর দুধ খেতে সমস্যা হয়। তাই গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ম্যাসাজ করে বোঁটাকে চোখা রাখতে হবে।
- বোঁটা ফেটে গেলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
✅ চিকিৎসা ও চেকআপ:
- ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সময়মতো অ্যান্টি-নাটাল চেকআপ (Anti-natal Checkup) করাতে হবে।
- টিকা গ্রহণ ও অন্যান্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষাগুলো অবহেলা করা যাবে না।
- নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রসব বেদনা (Labour Pain) না এলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

২. শিশুর যত্ন (জন্মের পরপর)
✅ জন্মের সময় ও পরের যত্ন:
- নবজাতকের গায়ের সাদা চর্বিযুক্ত স্তরটি পরিষ্কার করে দিতে হবে।
- প্রস্রাব, পায়খানা, চোখ, মুখ ইত্যাদি অঙ্গ স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে কি না খেয়াল রাখতে হবে।
✅ খাদ্য গ্রহণ:
- জন্মের পর শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। প্রথম দিকে দুধ না এলেও ৩ দিন পর্যন্ত ধৈর্য ধরে বারবার চুষতে দিতে হবে।
- দুই পাশের স্তন থেকে পালাক্রমে দুধ খাওয়াতে হবে।
- একপাশের দুধ জমে গেলে ম্যাসাজ করে বের করে সংরক্ষণ করে ছোট চামচে করে খাওয়াতে হবে।
- ফিডার বা বোতলে দুধ খাওয়ানো যাবে না—এই অভ্যাস হলে শিশুরা আর বুকের দুধ খেতে চায় না।
✅ ৬ মাসের যত্ন:
- টানা প্রথম ৬ মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। পানি বা অন্য কোনো খাবার দেওয়া উচিত নয়।
- ৬ মাস পর থেকে ধীরে ধীরে সজীব খাবার যেমন ভাত, ডাল, শাক-সবজি, ডিম, মাছ, মাংস ইত্যাদি দিতে শুরু করতে হবে।
৩. শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ
✅ শারীরিক বিকাশ:
- জন্মের সময় শিশুর ওজন যত ছিল, ৬ মাসে তা দ্বিগুণ এবং ১.৫ বছর বয়সে তিনগুণ হওয়া উচিত।
✅ মানসিক বিকাশ:
- ৫-৬ মাস বয়সে শিশুর বসে থাকা, হামাগুড়ি দেওয়া, হাঁটার চেষ্টা শুরু হয়।
- দেড়-দুই বছরে কথা বলার চেষ্টা করে। এসব সময়মতো না হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
✅ টিকা:
- ইমিউনাইজেশন প্রোগ্রামের আওতায় সব টিকা সময়মতো দিতে হবে।
✅ অসুস্থতা:
- জ্বর, বমি, পাতলা পায়খানা হলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিতে হবে এবং তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালাতে হবে।
গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে শিশুর জন্ম এবং ছয় মাস পর্যন্ত সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সময় সঠিক যত্ন ও সচেতনতার মাধ্যমে শিশু ও মা—দুজনেই সুস্থ, সবল ও সুন্দর ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হতে পারে। প্রতিটি পরিবারেই এই জ্ঞান ছড়িয়ে পড়া প্রয়োজন যাতে সুস্থ প্রজন্ম গড়ে ওঠে।
