মেনে নেওয়া প্রবণ মা-বাবা (অ্যাকসেপ্টিং পেরেন্টস) | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

মেনে নেওয়া প্রবণ মা-বাবা (অ্যাকসেপ্টিং পেরেন্টস) : এঁরা বিচার বিবেচনার মাধ্যমে, চিন্তা ভাবনার প্রভাবে স্নেহ-প্রীতি-ভালবাসাকে সঞ্জীবিত রাখেন। এঁরা আবেগীয় প্রকৃতিতে নয় বৌদ্ধিক স্বভাবে সন্তানের যাবতীয় ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, দৌরাত্ম্য-দুষ্টুমি, দাবি- আবদার মেনে নেন। তবে সহজ এবং ‘পুশ-ওভার পেরেন্টস্’ নন। একটা অলিখিত সীমার বাঁধনে নিজেদের এবং সন্তানদের বেঁধে রাখেন।

মেনে নেওয়া প্রবণ মা-বাবা (অ্যাকসেপ্টিং পেরেন্টস) | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

এঁদের নীতি ‘অনেকটাই, কিন্তু সবটা নয়’। হ্যাঁ এবং না – দাস ফার এ্যান্ড নো ফারদার-গোছের একটা মানসিক রেখা এঁরা সচেতন ভাবেই ধরে রাখেন। এই ব্যালেন্সটি, এই সন্তান-পেরেন্টস সত্তোলনটি ধরে রাখা বেশই কষ্টসাধ্য। যে কোনো ঔচিত্যানৌচিত্যের নিরিখ বৌদ্ধিক হলে তা আয়াসসাধ্য এবং অনুশীলন সাপেক্ষ হতে বাধ্য । ১. এঁরা বাস্তবতাবোধের দ্বারা এবং বৌদ্ধিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অ্যাকসেপ্টিং; ২. এঁরা ভালবাসা, মায়া-মমতা এবং স্নেহ-প্রীতিকে ধৈর্য-চিত্তা-প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতার দ্বারা পরিশোধন করে নিতে চান। এটা একটা আদর্শাবস্থা; তাই চেষ্টাটাই প্রধান, প্রাপ্যটা নয় । ৩. এঁরা সন্তানদের বিষয়ে উজ্জ্বল ধারণা এবং প্রদীপ্ত ভবিষ্যতের ভাবনা পোষণ করেন।

মেনে নেওয়া প্রবণ মা-বাবা (অ্যাকসেপ্টিং পেরেন্টস) | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

কিন্তু বাস্তব অবস্থা এবং প্রতিনিয়তের অভিজ্ঞতা এঁদের মনে, দেহে এবং জীবনে প্রতিকূল প্রভাব টেনে আনে— কষ্টদায়ক প্রতিযোজনা (এ্যাডজাস্টমেন্ট), ঘুমের ঘাটতি, কর্মক্লান্ত দিনাত্ত, গৃহের চারদেয়ালে আবদ্ধতা, সামাজিক যোগাযোগের ঘাটতি, নিঃসঙ্গতা, সব করেও যেন সব করা হলো না মতো একটা আত্মপীড়নের জ্বালা, অসম্পূর্ণতা বোধ থাকে।

৪. এঁরা মনে করেন— (ক) সন্তানের ছোটবড়ো অনুভব আছে, অভাব-অভিযোগ আছে এবং ওদের সে সব প্রকাশের অধিকার আছে, (খ) সন্তানদের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য আছে যা পরিবারের প্রেক্ষিতে এবং মা-বাবার কাছে মূল্যবান, অভিযোজনযোগ্য, (গ) সন্তানদের একক ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যে বেড়ে ওঠার প্রয়োজন ও অধিকার আছে, এবং (ঘ) সন্তানদের শর্তহীন স্নেহ ভালবাসায় অধিকার আছে। মনোবিজ্ঞানের অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে সন্তান ও মা-বাবার মধ্যেকার উষ্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক মান্যতার বাতাবরণই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান গৃহ অবদান যা সন্তানের ভবিষ্যতের পথটি চিহ্নিত করে দেয়।

মেনে নেওয়া প্রবণ মা-বাবা (অ্যাকসেপ্টিং পেরেন্টস) | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

এই সম্পর্ক, এই মান্যতা (অ্যাকসেপটেন্স) সন্তানকে কাঙ্ক্ষিত-স্বভাব, বিবেচনাক্ষম, আনন্দময়, সহযোগী এবং আবেগীয় উপকরণে স্থিতিশীল করে তোলে। বিচ্যুতি ঘটে এবং সস্তানরা অন্যরকম হয় যেখানে

(১) মা-বাবার একজন অথবা উভয়ই সন্তানকে মান্যতা দেয় না অথবা অ্যাকসেপ্ট করে না,

(২) সন্তানের সঙ্গে মায়ের সামরিক ছাড়াছাড়ি ঘটে যায়— হাসপাতাল, নার্সিং হোম বা অন্যকোনো কারণে,

(৩) মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে যেখানে অন্যকোনো নারী প্রধানা,

(৪) যেখানে মা-বাবার মধ্যে ছাড়াছাড়ি থাকে বা বিচ্ছেদ ঘটে যায়,

(৫) যেখানে বাবা মৃত্যুজনিত কারণে বা অন্যকোনো কারণে দীর্ঘদিন দূরে থাকেন,

(৬) যেখানে মা অনেকক্ষণ বা অনেকদিন অনুপস্থিত থাকেন,

(৭) যেখানে অনেক ‘মা’ থাকেন এবং

(৮) যেখানে গৃহে নয়, সন্তান থাকে দূরে কোনো প্রতিষ্ঠানে। এদের এক বা একাধিক ঘটলে সন্তানের ক্ষতির কারণ হয়।

“ছোটদের বড় দোষ— বড়দের কথা শোনে না যে! বড়দের বড় দোষ— ছোটদের কথা শোনে না সে! ছোটবড়র এই দ্বন্দ্ব চলছে চিরদিন, রাগে গরগর কথা, ফরফর রাতদিন।” — দোষের খতিয়ান। ‘একের মধ্যে তিন’। (১ম খণ্ড), ‘অর্ধেন্দুশেখর ভট্টাচার্য। ছেলে মেয়েদের ‘মানুষ’ করে তুলতে মা-বাবাদের ভাবনার শেষ নেই, চিন্তার অবধি নেই, দুশ্চিন্তার লেখাজোখা নেই।

মেনে নেওয়া প্রবণ মা-বাবা (অ্যাকসেপ্টিং পেরেন্টস) | বয়ঃসন্ধির সমস্যা | শিশুর মন ও শিক্ষা

এঁরা জানেন বোঝেন অনেক, নির্দেশ উপদেশ তথ্য সত্যাদি সংগ্রহ করেন প্রভূত। সন্তানের ভাল কে না চান? এই ভাল চাইতে, সন্তানের ভাল করতে এঁরা উর মাটি চুর করতেও পিছপা হন না। কষ্ট স্বীকার? ত্যাগ?— যা বলবেন তাই এঁরা করতে উন্মুখ। কিন্তু সব নদীর গতি যেমন সমুদ্রে বা হ্রদে তেমনি সকল মা-বাবার সব অভিযোগ-অনুযোগ- ফরিয়াদ গিয়ে ঠেকে সেই— ‘কথা শোনে না’-তে !

আবার শিশু-কিশোর-তরুণদের বলতে দিন দেখবেন ওদেরও সব কথার শেষ কথা সেই— বড়োরা ছোটদের কথা শোনেনা যে! মুশকিল এই যে ওদের আমরা বলতে দিই না, ওদের না-বলা কথায় কানও দিই না, ওদের অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুচ্চার অভিমানে আমরা মনও দিই না। সময় নেই বলেই নয়; মনটিই আসলে নেই বলে। বড়োর চশমাখানা আমরা এমন শক্তপোক্ত করে নাকে লাগিয়ে রাখি, প্রায় সর্বক্ষণই, যে ওদের চশমায় ওদের মন মানসিকতাকে দেখার দৃষ্টিটাই আর খুঁজে পাই না।

আরও দেখুন:

মন্তব্য করুন